মেসির আর কত জাদুকরী!

ফাইল ছবি
২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালের রাতটির কথা খুব মনে পড়ছে। ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে নিঃশব্দ কান্নাগুলোর একটি যেন নিজের চোখে দেখেছিলাম। আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে জার্মানির বিশ্বকাপ জয়ে চারদিকে আলোর রোশনাই। ঘোষণা হয়েছে, টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় লিওনেল মেসিকে মঞ্চে উঠে ‘গোল্ডেন বল’ পুরস্কার নেওয়ার। কিন্তু তার দুই পা যেন সামনে এগোতে চাইছে না। যে মানুষটি এসেছিলেন সোনালি ট্রফি ছুঁতে, তার কাছে সেরা খেলোয়াড়ের এই পুরস্কার তুচ্ছ! অনিচ্ছা সত্ত্বেও এগিয়ে গেলেন তিনি। মুখে হাসি ছিল না, উচ্ছ্বাস ছিল না। ছিল শুধু অপূর্ণতার দীর্ঘ ছায়া। অনেকের মনও বিষাদে ভরে গিয়েছিল ফুটবল বিধাতার এমন নিষ্ঠুরতা দেখে। সেরা ফুটবল জাদুকরের হাতে কাঙ্ক্ষিত ট্রফিটা দিলেন না তিনি! এত কাছে গিয়েও তার শূন্য হাতে ফেরা দেখে ভেবেছিলাম, হয়তো বিশ্বকাপের অপূর্ণতা নিয়েই শেষ হবে লিওনেল মেসির ইতিহাস।
আজ ফিরে তাকালে মনে হয়, মারাকানার সেই রাতটা গল্পের শেষ অধ্যায় ছিল না। ছিল বিরতির পাতা। সেই অসমাপ্ত বাক্যটা সম্পূর্ণ হয়েছে লুসাইলের মরুভূমিতে— সোনালি ট্রফিতে চুমু খেয়ে যখন আকাশের দিকে তুলে ধরেছিলেন মেসি।
সোনালি ট্রফি জেতার গল্প এখন যুক্তরাষ্ট্রে মহাকাব্যের সরণিতে। স্বাভাবিকভাবে এখানেও মুখ্য চরিত্র লিওনেল মেসি, আছে অনেক পার্শ্বচরিত্র। লুসাইলে জয়ের ১৭ জনই আছেন এই দলে। সুতরাং অভিজ্ঞতা আছে, তারুণ্য আছে, আছে শিরোপা জয়ের স্মৃতিও। তবে সবুজ ক্যানভাসে অমর কোনো ছবি আঁকতে হলে চোখ খোঁজে সেই পুরনো শিল্পীকে। রঙ অনেকের হাতেই থাকে, তবে শেষ তুলির আঁচড়টা যে সবাই দিতে পারে না।
সমস্যা হলো মেসির সময়। বয়স তার কাঁধে হাত রেখেছে। যদিও শিল্পী এখনো ইন্টার মায়ামির হয়ে প্রতি সপ্তাহে আঁকেন ফুটবলের নতুন জলরঙ। এরপরও বিশ্বকাপ তো কঠিন জায়গা, প্রায় ৩৯ ছোঁয়া এই শিল্পীর জন্য শিরোপা রক্ষার চ্যালেঞ্জটা কঠিন হতে পারে। এ নিয়ে অনেকের মনে খুঁতখুঁত থাকলেও স্কালোনির নেই। আর্জেন্টাইন কোচের বিশ্লেষণে বয়স বাড়লেও এখনো শিল্পীর হাতে তুলি কাপে না, ‘আমি ম্যাচ নিয়ে যতই ভাবি বা কৌশল করি, মেসি উড়তে শুরু করলে সব প্ল্যানই ডাস্টবিনে চলে যাবে।’
শুরুতে মেসির ইনজুরি নিয়ে চিন্তিত ছিলেন কোচ। প্রথম প্রস্তুতি ম্যাচে মাঠের বাইরে কাটিয়ে শেষ প্রস্তুতি ম্যাচে আইসল্যান্ডের বিপক্ষে জাদুকর নেমেছিলেন মাত্র ২০ মিনিটের জন্য। একটি গোল করলেন, আক্রমণের সূচনা করে অন্যের পায়ে গোলে পূর্ণতা দিলেন, বলের প্রতিটি স্পর্শে ছড়িয়ে দিলেন পরিচিত সেই মুগ্ধতা। সংশয়ের সব মেঘ উড়িয়ে যেন ঘোষণা দিলেন, নতুন স্বপ্নের পানে ছুটতে শিল্পী প্রস্তুত।
বুধবার আলজেরিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসি খেলতে নামবেন ২০০তম ম্যাচ। ২০০৫ সালে হাঙ্গেরির বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে নেমে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছেড়েছিলেন। যাত্রাপথের ১৯৯টি ম্যাচে আছে আরও অনেক বেদনার গল্প। দু-দুবার টাইব্রেকারে কোপা আমেরিকা ফাইনালের বিষাদ, বিশ্বকাপ ফাইনালে হৃদয়ভাঙার গল্প। পাশাপাশি গৌরবও বিস্তর। ১১৭ গোলের সঙ্গে ৬৪টি অ্যাসিস্ট, কোপা জয়ের কীর্তি, দুই বিশ্বকাপে গোল্ডেন বল জয় এবং সবশেষে ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন আর্জেন্টাইন ফুটবলে দেবতার আসনে।
তাকে ঘিরেই আবার আর্জেন্টিনা চতুর্থ শিরোপার স্বপ্ন দেখছে। আর্জেন্টাইনরাও বুঝে গেছেন স্বপ্নের দুয়ার খুলে দেওয়ার চাবিটা এখনো জাদুকরের হাতে। যদি সপ্তাহান্তে দেখা মায়ামির রাতগুলোর সেই ফুটবল-শিল্পের রিমেক বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখা যায়, যদি বাঁ পায়ের ম্যাজিকে আবার অসম্ভবকে সহজ করে তোলেন, তবে আর্জেন্টিনার গায়ে লাগতে পারে আবার শিরোপার রঙ। বিশ্ব ফুটবল সাক্ষী হবে নতুন ফুটবল মহাকাব্যের, যার শেষ লাইনটা লিখবেন সেই পুরনো জাদুকর।




