সেরা ফুটবল খেলেই সেরা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জেনারেশন জেড বা জেন-জি, অনেকের কাছেই মাথাব্যথার কারণ। তারা অবাধ্য, কথা শোনে না। এদের কাজে-কর্মে মন নেই। নিয়মনিষ্ঠ নয়, অফিসে বাড়তি সময় কাজ করতে অনীহা। তাদের মনের ভেতর সবসময় অস্থিরতা আর প্রচলিত নিয়মকানুনের প্রতি অশ্রদ্ধা। তাইতো ২০২০-এর দশকে বাংলাদেশ থেকে শুরু করে নেপাল, ইন্দোনেশিয়া, মরক্কো, পেরুসহ বিশ্বের নানান জায়গায় আন্দোলনে মাঠে নেমেছিল ১৯৯৭-২০১২-এর ভেতর জন্ম নেওয়া কুড়ি-পঁচিশ বছর বয়সীরা। কোথাও তাদের আন্দোলনে সরকারের পতন হয়েছে, কোথাও বিতর্কিত আইন পাস করা থামানো গেছে, কোথাও আবার আন্দোলন ব্যর্থও হয়েছে। আর স্পেনের জেন-জি তাদের ফুটবল বিশ্বকাপ জিতিয়েছে, ১৬ বছর পর আবারও বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেন এবং সেটা জেন-জিদের পায়েই।
২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ৪৮ দলের ভেতর অষ্টম তরুণতম দল ছিল স্পেন, দলের খেলোয়াড়দের গড় বয়স ২৬.১২ বছর। বয়সের অঙ্কে স্পেনের চেয়ে ওপরে থাকা দলগুলো ফুটবলের প্রথাগত শক্তি নয়, শুধু মরক্কোকেই একটু গুনতিতে ধরা যায়। বিশ্বকাপ জেতার পথে স্পেন অন্য যে বড় দলগুলোর বিপক্ষে খেলেছে, সেই পর্তুগাল, বেলজিয়াম, আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্সের খেলোয়াড়দের গড় বয়স স্পেনের খেলোয়াড়দের চেয়ে বেশি। তার মানে অভিজ্ঞতাতেও প্রতিপক্ষ ছিল এগিয়ে। স্পেনের তরুণ ফুটবলাররা কৌশল এবং অভিজ্ঞতা দুই জায়গায় তাদের হারিয়ে যেন জানান দিলেন, নতুন করে ইতিহাস লিখতেই তাদের মাঠে নামা।
স্পেনের এই সাফল্যের পেছনে আছে বয়সভিত্তিক ফুটবলে তাদের দীর্ঘ বিনিয়োগ এবং নিজস্ব পদ্ধতির ওপর আস্থা। বার্সেলোনার লা মাসিয়া, রিয়াল মাদ্রিদের লা ফ্যাব্রিকা থেকে শুরু করে ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা সেভাইলের স্পেন সকার একাডেমিগুলোয় শিশুদের স্রেফ বল নিয়ে খেলার আনন্দটা প্রথমে উপভোগ করতে দেয়। এরপর আসে কৌশল রপ্ত করা। বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতাগুলোয় জয়ের চেয়ে খেলা শেখার দিকেই জোর দেওয়া হয় বেশি। উয়েফার অনূর্ধ্ব-১৯ ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের সবশেষ ১১ আসরের, অর্থাৎ ২০১১ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত স্পেন ফাইনাল খেলেছে পাঁচবার আর চ্যাম্পিয়ন হয়েছে চারবার। সবশেষ তিন আসরেই স্পেন ফাইনালিস্ট, ২০২৪ ও ২০২৬-এ চ্যাম্পিয়ন ও ২০২৫ সালে রানার্সআপ। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল করা ফেরান তোরেস ছিলেন ২০১৯ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ ইউরো জয়ী দলের সদস্য, ফাইনালে পর্তুগালের বিপক্ষে করেছিলেন জোড়া গোল। অনূর্ধ্ব-১৯ ইউরোতে স্পেন শিরোপা জিতেছে ১৩ বার। পরের ধাপ উয়েফার অনূর্ধ্ব-২১ ইউরোতেও স্পেনের দাপট অক্ষুণ্ণ। এ আসরে স্পেনের শিরোপা পাঁচটি, এই শতকেই তিনটি। ২০১১, ২০১৩ ও ২০১৯ সালে। বিশ্বকাপজয়ী দলটার উনাই সিমন, ফাবিয়ান রুইস, মিকেল মেরিনো, দানি ওলমো, মাইকেল ওয়ারসাবাল; সবাই ছিলেন ২০১৯ সালে ইউরো জেতা সেই দলটায়। তাদের কোচও ছিলেন জাতীয় দলের বর্তমান কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। এই দলটাই সেমিফাইনালে ফ্রান্স ও ফাইনালে জার্মানিকে হারিয়ে জিতেছিল অনূর্ধ্ব-২১ ইউরোর শিরোপা।
অনেকের কাছেই জেন-জিদের ভাষা দুর্বোধ্য, তাদের সামলে রাখা মুশকিল। ফুয়েন্তে নিঃসন্দেহে কাজটা করেছেন ভালোভাবে। কারণ এই দলের অনেককেই যে তিনি দেখেছেন বালক কিংবা কিশোর বেলায়। আর বাড়তি আবেগের চাপ এই প্রজন্ম বহন করে না। ১৮ বছর বয়সে লামিন ইয়ামালকে পুরো স্পেনের প্রত্যাশার চাপের কথা জিজ্ঞাসা করেছিলেন এক সাংবাদিক। উত্তরে লামিন বলেছেন, ‘আমার মা ১৬ বছর বয়সে আমাকে জন্ম দিয়েছেন, এটাকে সত্যিকারের চাপ বলে। আমার বাবা রাস্তায় জিনিসপত্র কুড়াতেন, যাতে আমাদের মুখে খাবার তুলে দিতে পারেন, এটাকে সত্যিকারের চাপ বলে। আমাকে তো ফুটবল খেলা ছাড়া কিছুই করতে হয় না।’ নিকো উইলিয়ামসের বাবা-মা, খালি পায়ে সাহারা মরুভূমি পাড়ি দিয়ে স্পেনে এসেছিলেন উন্নত জীবনের আশায়, রোদ্রি ভিয়ারিয়ালের হয়ে খেলার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসা প্রশাসনে ডিগ্রি নিচ্ছিলেন। এই খেলোয়াড়দের বেশিরভাগের কাছেই খেলার মাঠে চাপ বলতে কিছু নেই।
খুব মারাত্মক কোনো চোটে না পড়লে কিংবা ফর্ম খুব খারাপ না হলে এই খেলোয়াড়রাই আগামী অন্তত বছর চারেক স্পেনের হয়ে খেলবেন। তাদের কড়া চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলার মতো একটাই দল, ফ্রান্স। তারুণ্যদীপ্ত এবং সাফল্যের জন্য ক্ষুধার্ত। সেই ফরাসিদেরও তারা বয়সভিত্তিক, মহাদেশীয় কিংবা বিশ্বকাপ; সম্ভাব্য সবরকম প্রতিযোগিতায় সেমিফাইনালে হারিয়েছে। ইকার ক্যাসিয়াসের নেতৃত্বে জাভি-ইনিয়েস্তাদের সময়ের স্পেন দল যেভাবে ২০০০ সালের প্রথম দশকটা দাপট দেখিয়ে টানা তিন শিরোপা জিতেছে (ইউরো, বিশ্বকাপ, ইউরো), এই দলটারও সামর্থ্য আছে সেই কৃতিত্বের পুনরাবৃত্তি করে দেখানোর, এমনকি ছাড়িয়ে যাওয়ারও।
জেন-জি শব্দটা এসেছে জেনারেশন জেড (মার্কিনিরা জেডকে বলে জি) থেকে, যার মাধ্যমে ১৯৯৭ থেকে ২০১২— এ সময়টায় জন্মানো প্রজন্মকে বোঝানো হয়। স্পেনের এই ফুটবলাররাও নিঃসন্দেহে জেন-জি, তবে এখানে ‘জি’ মানে ‘জি ফর গোল্ড’।




