বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্মের শেষের মুখোমুখি স্পেনের জেন-জি

সংগৃহীত ছবি
বেলজিয়াম দলটাকে দেখে মনে হতে পারে, ক্ষয়িষ্ণু কোন জমিদার বাড়ি। পলেস্তারা খসে পড়েছে, ঝাড় লন্ঠন নেই, সেই বাবুগিরির সময়ও অস্ত গেছে। অথচ এককালে তাদের নামে বাঘে মহিষে একঘাটে জল খেত। আর স্পেনের ফুটবল দলটাকে দেখে মনে হতে পারে সফল স্টার্ট-আপ উদ্যোক্তা। অর্থ আছে, তবে সেটা দিয়ে বাবুয়ানির বদলে চোখে পৃথিবী বদলে দেবার স্বপ্ন।
কেন এই তুলনা? কারণ রোমেলু লুকাকু, কেভিন ডি ব্রুইনা, থিবো কোর্তোয়াদের হয়তো বড় আসরে বেলজিয়ামের হয়ে এবারই শেষ উপস্থিতি। এডেন হ্যাজার্ড, ভিনসেন্ট কম্পানি, টোবি অল্ডারউইল্ডরা তো খেলা ছেড়েছেন আরো আগেই। ২০০০ সালের ইউরোতে ভরাডুবির পর বেলজিয়ামের ফুটবল ফেডারেশন গোটা দেশের ফুটবল একাডেমি গুলোতে একই রকম কৌশলে খেলা শেখানোর নিয়ম চালু করে। ৪-৩-৩, এই ছকে খেলানো হয় সব জায়গায়। জোর দেয়া হয় টেকনিক্যাল দক্ষতা, জায়গা ব্যবহারের দক্ষতা আর সাবলীল পাসিংয়ের উপর। টেকনিক্যাল ডিরেক্টর মিশেল সাবলঁ'র পরিকল্পনায় সাফল্য পায় বেলজিয়াম, ২০১০ সালের দিকে তারা একের পর এক দারুণ সব ফুটবলার খুঁজে পায়। সেপ্টেম্বর ২০১৮ থেকে মার্চ ২০২২ পর্যন্ত বেলজিয়াম ছিল ফিফা র্যাংকিংয়ের শীর্ষ দল। কিন্তু এই সোনালী প্রজন্ম নিয়েও বেলজিয়াম বড় আসরের শিরোপা জিততে ব্যর্থ হয়। ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে তৃতীয় হওয়াটাই তাদের বড় কৃতিত্ব, ইউরোতেও খেলা হয়নি সেমিফাইনালে।
বড় আসরে নকআউট রাউন্ডে বারবার বাদ পড়ার পেছনে একটা বড় কারণ হচ্ছে দলের ভেতর অস্বস্তি। দলের মূল প্লে-মেকার কেভিন দে ব্রুইনা ও গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়ার ভেতর সম্পর্কের শীতলতা বেলজিয়ামের ড্রেসিংরুমে বিভক্তি সৃষ্টি করেছিল, যার কেন্দ্রবিন্দুতে ক্যারোলাইন লিজনেন নামের এক সাবেক টেনিস খেলোয়াড়।
২০১২-১৩ মৌসুমে দি ব্রুইনা ও কোর্তোয়া, দুজনকেই সই করায় চেলসি তবে ধারে ব্রুইনাকে পাঠিয়ে দেয় ওয়ের্ডার ব্রেমেনে আর কোর্তোয়াকে অ্যাতলেতিকো মাদ্রিদে। সেসময় ক্যারোলাইন এর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে আছেন দি ব্রুইনা। সেসময় মাদ্রিদে বেড়াতে গিয়ে কোর্তোয়ার সঙ্গে পরিচয় ক্যারোলাইন এর, সেখান থেকে গোপন প্রেম। সম্পর্কে প্রতারণা। সেসব যখন জানাজানি হয়ে যায় তখন প্রেমিকার চেয়ে দীর্ঘদিনের সতীর্থের এই বিশ্বাসভংগ অনেক বেশি কষ্ট দিয়েছিল দি ব্রুইনাকে। নিজের আত্মজীবনী 'কিপ ইট সিম্পল' বইতে সেটা লিখেছিলেন দি ব্রুইনা, এরপর ক্যারোলাইন মুখ খোলেন। তিনি জানান প্রতিশোধ নিতেই ইচ্ছা করে কোর্তোয়ার সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন কারণ তিনি জানতে পেরেছেন তারই ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর সঙ্গে দি ব্রুইনা গোপনে জড়িয়েছিলেন সম্পর্কে। এই নিয়ে তিক্ততা ছড়িয়ে পড়ে বেলজিয়ামের ড্রেসিংরুমেও। কোচ মার্ক উইলমটস দে ব্রুইনাকে ডেকে বলেন যে তিনি কি কোর্তোয়াকে দল থেকে বের করে দেবেন? দি ব্রুইনার জবাব ছিল সে জাতীয় দল থেকে বাদ পড়ার মত কিছু করেনি, যতক্ষণ সে ভাল খেলছে সে কেন বাদ পড়বে।
সেই যে দেয়াল উঠল ড্রেসিংরুমে, চিড় ধরল সম্পর্কে সেই ফাটল আর জোড়া লাগেনি। তাই তো বড় আসরগুলোতে নকআউটে বারবার হোঁচট খেয়েছে বেলজিয়াম। সোনালি প্রজন্মের হাতে এখনো ওঠেনি কোন রূপালি স্মারক। এই বিশ্বকাপে তারা এখনো টিকে আছে, তবে শিরোপার জোরাল দাবীদার হিসেবে কেউই তাদের সেভাবে দেখছে না। বরং আজ রাতে স্পেনের জেন-জি'দের পায়েই বিদায় হয়ে যেতে পারে বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্মের শেষ স্মৃতিস্মারক। যেভাবে পুরোনো জমিদার বাড়ি ভেঙ্গে গড়ে তোলা হচ্ছে আধুনিক সব অ্যাপার্টমেন্ট আর শপিং মল।
'পেরেনিয়াল আন্ডারঅ্যাচিভার' অর্থাৎ 'সবসময়ই সামর্থ্যের চেয়ে কম পাওয়া' শব্দটা জুড়ে গিয়েছিল স্পেনের সঙ্গে। একবার চতুর্থ হওয়া আর বারতিনেক কোয়ার্টার ফাইনালে খেলা স্পেন দলটাই ইকের ক্যাসিয়াসের নেতৃত্বে জাবি, ইনিয়েস্তা, দাভিদ ভিয়া, জাবি আলোনসোদের নিয়ে ২০১০ সালে জিতে বিশ্বকাপ। তার ২ বছর আগে ও পরে অর্থাৎ ২০০৮ ও ২০১২ সালেও স্পেন হয় ইউরোপ সেরা। তিকিতাকা শব্দটাকে বিশ্বের কোণায় কোণায় ছড়িয়ে দেয়া এই দলটাই স্প্যানিশ ফুটবলের সফলতম প্রজন্ম।
এরপর তিনটি বিশ্বকাপ গেছে। ব্রাজিলে শিরোপার মুকুট মাথায় এসে প্রথম রাউন্ডেই বিদায়। রাশিয়া ও কাতারে শেষ ১৬ থেকে। ২০১৬ ইউরোতেও গ্রুপ পর্বে বিদায়, পরের আসরে সেমিফাইনালে। তবে লামিনে ইয়ামাল, নিকো উইলিয়ামস, গাভি, পেদ্রিদের নিয়ে গড়া দলটা ২০২৪ সালে জিতেছে ইউরোপ সেরার শিরোপা। তাই তাদের ঘিরে ২০১০ এর পুনরাবৃত্তির স্বপ্ন ২০২৬ সালে।
এই দলটার বেশিরভাগ খেলোয়াড়ই জেনারেশন-জেড ( মার্কিনিরা জেড অক্ষরকে বলে জি), অর্থাৎ ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের ভেতর তাদের জন্ম। লামিনে ইয়ামালের জন্ম ২০০৭ সালে, তার বয়স মাত্র ১৮। গাভি জন্মেছেন ২০০৪ সালে,পেদ্রি ২০০২ সালে,ফেরান তোরেস ২০০০ সালে আর দানি ওলমো ১৯৯৮ সালে। একই বছর জন্ম মার্ক কুকুরেয়ার, নিকো উইলিয়ামসের জন্ম আরো পরে ২০০২ সালে। স্পেন দলের এই জেন-জিরাই বছর দুই আগে হ্যারি কেইন, জর্ডান পিকফোর্ড, ডেক্লান রাইসদের নিয়ে গড়া ইংল্যান্ডকে হারিয়ে দিয়েছে ইউরোর ফাইনালে।
তারা পুরো আসরে হারিয়েছে ক্রোয়েশিয়া, জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড অর্থাৎ সাবেক ৪ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ও এক রানার্সআপকে। সেমিফাইনালে কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে, ব্র্যাডলি বারকোলাদের নিয়ে গড়া দিদিয়ের দেশমের এই 'সুপার ফ্রান্স'কেও হারিয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলে জেন-জিরা যেভাবে প্রভাবক হয়ে উঠেছে, সেই পথ ধরে বিশ্বকাপেও যে তারা হিসেব ওলটপালট করে দেবে না এই কথাই বা বলা যায় কি করে!




