এবারও ‘এলিয়েন’ এমবাপ্পে

মরক্কোকে সহজেই হারিয়ে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছে গেছে ফ্রান্স। গোল করে এবং করিয়ে সব আলো কেড়ে নিয়েছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। বিশ্বকাপ— তাই এমবাপ্পে আবারও ভিনগ্রহের এলিয়েনে রূপ নিয়েছেন। ২০ বিশ্বকাপ ম্যাচে ২০ গোল। চলতি বিশ্বকাপে আট গোল করে লিওনেল মেসির সঙ্গে জমিয়ে তুলেছেন গোল্ডেন বুটের লড়াই। মেসির বর্তমান বয়স পর্যন্ত নিজের ক্যারিয়ার যদি একই গতিতে টেনে নিতে পারেন, অনেক রেকর্ডই লুটিয়ে পড়বে তার জাদুকরী পায়ে।
তবে এ মানুষটার কাছে ব্যক্তিগত অর্জন একেবারেই গুরুত্বহীন। হ্যাটট্রিক করে এমবাপ্পে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ফাইনাল উপহার দিয়েছিলেন ২০২২ সালে।
যদিও টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার কাছে হার সব চেষ্টাই বৃথা যায়। গোল্ডেন বুট হাতে হাতছাড়া হওয়া সোনালি কাপের দিকে তার শূন্যদৃষ্টি
ভোলার কথা নয় ফুটবলপ্রেমীদের। মাত্র ১৯ বছর বয়সে রাশিয়ায় পাওয়া শিরোপার স্বাদ আরেকবার পেতে এবার সদলবলে যে অভিযান শুরু করেছিলেন, তা থেকে আর দুই জয় দূরে এমবাপ্পে।
অথচ বোস্টনে শুরুটা মনমতো হয়নি তাদের। এমবাপ্পে পেনাল্টিকে গোলে বদলাতে পারেননি। মরক্কো গোলকিপার ইয়াসিন বুনো সেই পেনাল্টিসহ রুখে দিয়েছেন একের পর এক রাফাল মিসাইল। তবে এমবাপ্পে ‘এলিয়েন’ রূপ নিতে একটু সময় নিলেন। ৬০ মিনিটে বক্সের বেশ বাইরে দেসিরে দুয়ের পাস পেয়ে দুই মার্কারকে কাটিয়ে ডান পায়ের মাপা শটে বুনোকে পরাস্ত করেন। পেনাল্টি থেকে গোলের সুযোগ নষ্টের কষ্ট তাতে পুরোপুরি মেটেনি। ছয় মিনিট পর দেম্বেলেকে দিয়ে গোল করিয়ে ক্ষান্ত হন ফরাসি অধিনায়ক। এ বিশ্বকাপে দেম্বেলের এটি পঞ্চম গোল।
মরক্কো নিজেদের ছায়া হয়ে ছিল পুরোটা সময়। দুই ফ্ল্যাংক দিয়ে গতির ঝড় তোলা, আক্রমণে বিধ্বংসী রূপ, ট্রানজিশনে বল জিতে গোলের সুযোগ তৈরির সহজাত ফুটবলটা ছিল অনুপস্থিত। বরং শেষ পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার মানসিকতা, ভয়ংকর আক্রমণভাগের সঙ্গে মাঝমাঠের মেলবন্ধন এবং দিদিয়ের দেশমের ট্যাকটিক্যাল মাস্টারক্লাস ফ্রান্সকে এ বিশ্বকাপে টানা ষষ্ঠ জয় পাইয়ে দেয়।
দলের দুই গোলে অবদান রাখা এমবাপ্পে ৭৭ মিনিটে মাঠে বসে পড়েছিলেন গোড়ালির চোটে। সে সময় তাকে তুলে নেন কোচ। মুহূর্তেই তাকে নিয়ে তৈরি হয়েছিল শঙ্কা। তবে ম্যাচ শেষে নিজেই সে শঙ্কা উড়িয়ে দিয়েছেন, ‘গোড়ালিতে সামান্য আঘাত পেয়েছিলাম, তবে আমি ঠিক আছি।’ শিরোপা তৃষ্ণাটা তার আছে আগের মতোই, ‘স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার একটাই উপায় হলো ম্যাচ জেতা। যতক্ষণ না আমরা সেটা করছি, আমরা হাল ছাড়ি না। সামনে এখনো দীর্ঘ পথ বাকি। আমরা যা পার করে এসেছি, তার চেয়েও অনেক কঠিন সামনের পথটা। তবে আমরা শিরোপা জিততে যেকোনো কিছুর মুখোমুখি হতে প্রস্তুত।’
মরক্কো কোচ মোহাম্মদ ওয়াহবি স্বীকার করলেন এক এমবাপ্পের কাছে হারতে হয়েছে তাদের, ‘শেষ পর্যন্ত এমবাপ্পের এক অবিশ্বাস্য ব্যক্তিগত নৈপুণ্যই আমাদের পিছিয়ে দিয়েছে।’ ফ্রান্সের হয়ে ২৫তম বিশ্বকাপ ম্যাচে ডাগআউটে দাঁড়িয়ে অনন্য নজির গড়া দেশমও প্রশংসা করেছেন এমবাপ্পের, ‘গোল করার আগে সে (এমবাপ্পে) একটি সুযোগ মিস করলেও কখনো নিজেকে নিয়ে সন্দেহে থাকে না। সে জানে সুযোগ কাজে লাগাতে। সে আমাদের সেখানেই রেখেছে, ঠিক যেখানে আমরা পৌঁছাতে চেয়েছিলাম।’
এক বিশ্বকাপে নির্দিষ্ট একটি দলের হয়ে দুই ফুটবলারের পাঁচবার তার বেশি গোলের রেকর্ড এতদিন ছিল ব্রাজিল কিংবদন্তি জুটি রোনালদো ও রিভালদোর। ২০০২ সালে গড়া সেই রেকর্ড এবার এমবাপ্পে ও দেম্বেলে জুটির। ভীষণ তৃপ্ত দেম্বেলেও এমবাপ্পের প্রসঙ্গ টানলেন ম্যাচ শেষে, ‘গোল করার ঠিক দুই বা তিন মিনিট আগে এমবাপ্পে আমাকে মাঠের মাঝ বরাবর থাকতে বলেছিল। সে দারুণ এক রান নিয়েছিল, যা আমার জন্য পথ তৈরি করে দেয়।’
২০১৮ বিশ্বকাপ জিতলেও সেবারের ফরাসি আক্রমণভাগ এবারের চেয়ে নির্মম ও ভয়ংকর ছিল না। তারপরও এমবাপ্পের কাছে বিশ্বকাপজয়ী দলটাই সেরা। এমবাপ্পে মানুন কিংবা না মানুন, অনেকেই সুসংগঠিত ও নির্মম ফরোয়ার্ড লাইন, বৈচিত্র্যে ঠাসা মাঝমাঠ, নিরেট রক্ষণ এবং এমবাপ্পে-দেশমের রসায়নে এই ফ্রান্সকে দেখছে ফাইনালের মঞ্চে।




