সোনালি সময় শেষে সোনার দেখা

দেশের ফুটবলে সোনালি সময়ের গল্পে শিরোপার মুকুট নেই। যখন দক্ষিণ এশীয় ফুটবলে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট পরেছে, তখন আবার রঙ হারাতে থাকে ফুটবল। বাংলাদেশ ফুটবলের উত্থান-পতনকে সাফের আয়নায় দেখার চেষ্টা করেছেন সুদীপ্ত আনন্দ। তারই প্রথম পর্ব আজ
সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদার টুর্নামেন্ট। এই অঞ্চলের মানুষের কাছে যার আবেদন বেড়েছে অনেক পরে। তার আগে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে লড়াইয়ের বড় মঞ্চ ছিল সাফ গেমস ফুটবল। ১৯৯৩ সালে সাউথ এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশন প্রথম টুর্নামেন্ট আয়োজন করে সার্ক গোল্ড কাপ নামে। সাফে বাংলাদেশের পথচলা শুরু ১৯৯৫ সালে।
ততদিনে শেখ মোহাম্মদ আসলাম, রুম্মন বিন ওয়ালি সাব্বির, মোনেম মুন্নাদের স্বর্ণযুগের অবসানের পর নতুন এক প্রজন্ম লাল-সবুজের প্রতিনিধিত্ব শুরু করে। ১৯৯৫ কলম্বো, ১৯৯৭ কাঠমান্ডু ও ১৯৯৯ মারগাঁওয়ে আশা জাগিয়েও পারেনি বাংলাদেশ। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের গল্পে ঢোকার আগে চোখ রাখতে হবে সাফ গেমস ফুটবলে।
কাঠমান্ডুতে ১৯৮৪ সালে বসেছিল প্রথম সাফ গেমস। ফাইনালে পৌঁছেও অপেক্ষাকৃত দুর্বল নেপালের কাছে ৪-২ গোলে হেরে যায় বাংলাদেশ। এক বছর পর আঙিনায় সাফ গেমসেও সঙ্গী হয় ফাইনালে ভারতের কাছে টাইব্রেকারে হারের হতাশা। কলকাতায় ১৯৮৭ সাফ গেমসে বাংলাদেশ পৌঁছাতে পারেনি ফাইনালে। তবে ১৯৮৯ সালেও পারেনি, ফাইনালে ১-০ গোলে হারে পাকিস্তানের কাছে। ১৯৯৩ সালে ঢাকা গেমসে স্বাগতিক হয়েও সেমিফাইনালে পৌঁছাতে পারেনি তারকায় ঠাসা বাংলাদেশ।
রমরমা সময়ে আঞ্চলিক ফুটবলে সোনা জিততে না পারার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে দেশের অন্যতম সেরা প্লে-মেকার রুম্মন বিন ওয়ালি সাব্বির বলেছেন, ‘একটি সাফ গেমসের পদক দিয়ে আমাদের অবদান বিচার করা ঠিক নয়। আমরা সে সময় দেশের র্যাংকিং ১০৫-এ নিয়ে গিয়েছিলাম। ভারত ১০ ধাপ পিছিয়ে ছিল। আমরা তখন বিশ্বকাপ, এশিয়ান কাপ বাছাইয়ে ভালো ফুটবল খেলেছি।’
১৯৯৯ সাফ গেমস জয়ী দলের অধিনায়ক জুয়েল রানা অবশ্য রমরমা সময়ে সাফল্য না পাওয়ায় ফুটবলারদের দায় দেখছেন, ‘আমি প্রথম সাফ গেমস খেলি ১৯৮৯ সালে। সেবার ফাইনালে পাকিস্তান ছিল আমাদের প্রতিপক্ষ। আমরা ধরেই নিয়েছিলাম শিরোপা জিতব সহজেই। তাই সবার মাঝেই একটা গা ছাড়া ভাব ছিল। সেটাই কাল হয়েছে। তা ছাড়া সে সময় দলের মধ্যে আমি সমন্বয়ের অভাব দেখেছি। ঘরোয়া লিগ ছিল জমজমাট। জাতীয় দলে সবাই খুব গুরুত্ব নিয়ে খেলতেন না। পা বাঁচিয়ে খেলা যাকে বলে।’
১৯৯৩ সালে সেই ব্যর্থতায় দেশের ফুটবলে ঘটে এক বড়সড় বাঁকবদল। একটা স্বর্ণযুগের অবসান ঘটে। পুরনোদের জায়গা নেয় একঝাঁক নতুন ফুটবলার। তখন সাফ গেমস ফুটবলের পাশাপাশি গুরুত্ব পেতে শুরু করে সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ। বাংলাদেশ ১৯৯৫ সালে কলম্বো সাফে এ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হয়ে সেমিফাইনালে গিয়েছিল। তবে টাইব্রেকারে ভারতের কাছে ৪-২ গোলে হেরে বিদায় নিতে হয়। সে বছর মাদ্রাজ সাফ গেমসের ফুটবলে বাংলাদেশ আরেকবার হতাশ হয় ফাইনালে ওই ভারতের কাছে ১-০ গোলে হেরে। বাংলাদেশের ফুটবলে সুদিনের দেখা মেলে ১৯৯৯ সালে। ভারতের গোয়ায় অনবদ্য ফুটবল খেলে সাফ শিরোপার খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছিল বাংলাদেশ। গ্রুপ পর্বে তারা প্রথম ম্যাচে স্বাগতিক ভারতের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে। এরপর পাকিস্তানকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে গ্রুপসেরা হয়। তবে ফাইনালে ভারতের সঙ্গে পারেনি তারা। ২-০ গোলে হেরে আরেকবার আশাভঙ্গ হয়।
এপ্রিলের সেই হতাশা কেটে যায় অক্টোবরে। সাতবারের বিফল চেষ্টার পর কাঠমান্ডুতে সাফ গেমস ফুটবলের কাঙ্ক্ষিত সোনার দেখা মেলে সামির সাকিরের বাংলাদেশের। সেমিফাইনাল সুপার সাব সাহাজউদ্দিন টুপির গোলে ভারতকে হারানোর পর ফাইনালে নেপালের বিপক্ষে আলফাজের একমাত্র গোলে সোনার হাসি হাসে বাংলাদেশ।
একক নৈপুণ্যে সাব্বির, ওয়াসিম, আসলাম ও মুন্নাদের সঙ্গে তুলনা চলে না। তবে দল হিসেবে এবং সাফল্যের বিচারে এগিয়ে থাকবে তাদের পরের প্রজন্ম। যাদের প্রতিনিধিত্ব করেছেন আলফাজ, মতিউর মুুন্না, মিজানুর রহমান ডনরা। আলফাজ সাব্বিরদের সোনালি প্রজন্মের প্রতিনিধি মেনেই নিজেদের সেরা দাবি করলেন, ‘সাব্বির-মুন্না ভাইরা আমাদের সোনালি সময়ের প্রতিনিধি। তাদের খেলা দেখতে গ্যালারিতে থাকত উপচে পড়া ভিড়। তবে সাফল্যের বিচারে তাদেরও ছাড়িয়ে গেছি আমরা। ১৯৯৯ সাফ গেমস স্বর্ণপদক জিতেছি আমরা। তার আগে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালও খেলেছি। আমরা সেটা পেরেছিলাম সামির সাকিরের মতো একটা দুর্দান্ত কোচ পেয়েছিলাম বলে। তিনি প্রায় দুই বছর সময় নিয়ে একটা চ্যাম্পিয়ন দল গড়ে তুলেছিলেন।’
১৯৯৯ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে ৩ গোল করে ভারত তারকা বাইচুং ভুটিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা মিজানুর রহমান ডন যোগ করেন, ‘৯৯-এর সাফল্যের পেছনে অধিনায়ক জুয়েল রানা ভাইয়ের অবদান অনেক। তিনি আমাদের দারুণভাবে আগলে রেখেছেন, অনুপ্রাণিত করেছেন। আমাদের অবশ্য আরও অনেক সাফল্যই পাওয়া উচিত ছিল। সেটা হয়নি ভারতের বাইচুং ভুটিয়ার কারণে। গোল করে সে অনেক ম্যাচে ব্যবধান গড়ে দিত।’



