সাক্ষাৎকার
স্ট্রাইকার হতে লাগে বাড়তি অনুশীলন
- ব্রাজিলিয়ান স্ট্রাইকার দোরিয়েলতন গোমেজ। বসুন্ধরা কিংসের হয়ে পুরো মৌসুম ছিলেন অনবদ্য। বয়সকে হার মানিয়ে ২৫ ম্যাচে করেছেন ৩৩ গোল। কিংসকে জিতিয়েছেন ট্রেবল। অসাধারণ মৌসুম শেষে আগামীর সময়ের সুদীপ্ত আনন্দর কাছে তিনি খুলে বসেছিলেন গল্পের ঝাঁপি...

প্রশ্ন: মৌসুম শেষ করলেন জোড়া গোল দিয়ে। সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন লিগসহ সব আসরে। আপনার অনুভূতি কেমন?
দোরিয়েলতন: আমি ভীষণ খুশি। আমি প্রতি ম্যাচেই গোল করতে চাই। তবে প্রথম লক্ষ্য থাকে দলের শিরোপা। দলের সবাইকে অভিনন্দন জানাই, তারা কঠোর পরিশ্রম করেছে এবং আমাকে অনেক গোল করিয়েছে। বলব না এটিই সেরা মৌসুম, তবে এটি একটি বিশেষ মৌসুম।
প্রশ্ন: বিশেষ তো বটেই। লিগের শেষ আট ম্যাচ একমাত্র বিদেশি হিসেবে খেলতে হয়েছে। নিশ্চয়ই খুব চ্যালেঞ্জিং ছিল?
এখানে অনেক কিছু পরিবর্তন করতে হবে, বিশেষ করে মাঠ। এটি (বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনা) ঠিক আছে, ফুটবল খেলার জন্য একদম ঠিক। তবে যখন কুমিল্লা বা অন্য কোথাও যাবেন, সেখানে ভালো ফুটবল খেলা সম্ভব নয়। ফেডারেশনকে অনুরোধ করব আপনারা মাঠের দিকে দৃষ্টি দিন
দোরিয়েলতন: হ্যাঁ, খুবই কঠিন। আগে খেলা ভালো ছিল, যখন মিগুয়েল (ফিগেইরা) ও রবিনহো (রবসন) ছিল। তখন কিংসের খেলা সুন্দর ছিল, খেলায় দাপটও ছিল। তবে এখন দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা সুন্দর ফুটবল খেলছি না। তবে এই মৌসুমে খুব পরিশ্রম করে খেলতে হয়েছে এবং সাফল্যও পেয়েছি।
প্রশ্ন: সব মিলিয়ে বাংলাদেশে ৪টি মৌসুম খেলেছেন। অভিজ্ঞতা কেমন?
দোরিয়েলতন: এখানে আমার ভালো সময় কেটেছে। স্থানীয়দের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করেছি। বাংলাদেশ দলে কিংসের ফুটবলারই বেশি। কয়েকটি ম্যাচ দেখার পর তাদের সঙ্গে কিছু বিষয় নিয়ে আলাপ করেছি। তারা যেন আরও ভালো খেলতে পারে।
প্রশ্ন: চাইলে নাগরিকত্ব বদলে এশিয়ার যেকোনো জাতীয় দলে খেলার সামর্থ্য আপনার ছিল। খেলতে না পারার কোনো কষ্ট কি আছে?
দোরিয়েলতন: (একটু হেসে) আমি মনে করি, আমার জন্য এখন জাতীয় দলে খেলাটা কঠিন। এখন আমি বুড়ো হওয়ার পথে। তবে আগে যখন চীনে খেলতাম... ১০ বছর! তখন ডাক পেলে হয়তো খেলতাম। এখন আর আমার কোনো সুযোগ নেই।
প্রশ্ন: আপনি ৩৬ বছর বয়সেও দারুণ খেলছেন। এই মৌসুমে ২৫ ম্যাচে ৩৩ গোল করেছেন...
দোরিয়েলতন: উফ্, অনেক গোল। এটা ভালো (হাসি)।
প্রশ্ন: তার মানে বয়সকে হার মানিয়েছেন?
দোরিয়েলতন: না, না সত্যিই আমি বুড়ো হচ্ছি। আগে শারীরিকভাবে যা করতাম, তা এখন পারি না। তবে এখন মাথা খাটিয়ে খেলি। পাগলের মতো দৌড়ানোর শক্তি নেই। এখন অভিজ্ঞতার সেরাটা দিতে পারি। কোনো কোচ যদি বুদ্ধিমান স্ট্রাইকার চান, তিনি আমাকে পছন্দ করতে পারেন।
স্থানীয়দের আরও বেশি কিছু করতে হবে। এটি বলতে চাই না যে তাদের যোগ্যতা নেই, তারা দৌড়ায় না। বলেছি, নিজেকে মেরে ফেলার দরকার নেই, কিছু সময় বাড়তি অনুশীলন করো, তাহলেই ভালো স্ট্রাইকার হওয়া যাবে
প্রশ্ন: যখন দেখলেন বকেয়া না পেয়ে কয়েকজন সহ-খেলোয়াড় (বিদেশি) বাকি ম্যাচগুলো খেলতে চাইল না, তখন ভাবনায় কী এসেছিল?
দোরিয়েলতন: সত্যি বলতে, এই মৌসুমে সানডে ও টনি আমাদের অনেক সাহায্য করেছে। তারা যখন খেলতে চাইল না, এটি মেনে নেওয়া সবার জন্য কঠিন ছিল। বিশেষ করে আমার জন্য। প্রতিপক্ষ মাঠের ভেতরে যখন বেশি বিদেশি খেলোয়াড় দেখে, তখন চাপ বেশি থাকে। যখন ওরা খেলল না, তখনই ভাবতে শুরু করলাম কীভাবে অন্যদের সাহস দেব, যাতে হতাশ না হয়। এর পর থেকেই স্থানীয়দের মানসিকতা শক্ত করতে বলি। সবসময় ওদের বলেছি, তোমরা যদি গোল হজম না করো, আমি গোল করতে পারব। আমাকে শুধু বলের জোগান দিও। তারা কথা শুনেছে; সে কারণেই এত গোল করতে পেরেছি।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের লিগ নিয়ে কী বলবেন, সন্তুষ্ট?
দোরিয়েলতন: সত্যি বললে মোটেই সন্তুষ্ট না। এখানে অনেক কিছু পরিবর্তন করতে হবে, বিশেষ করে মাঠ। এটি (বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনা) ঠিক আছে, ফুটবল খেলার জন্য একদম ঠিক। তবে যখন কুমিল্লা বা অন্য কোথাও যাবেন, সেখানে ভালো ফুটবল খেলা সম্ভব নয়। ফেডারেশনকে অনুরোধ করব আপনারা মাঠের দিকে দৃষ্টি দিন। এটি আমার বা অন্য কোনো বিদেশির জন্য নয়। এটি স্থানীয়দের জন্য। কারণ, যদি ভালো মাঠে খেলা হয়, খেলার মান ভালো হবে। যখন মান ভালো হবে, তখন জাতীয় দলও শক্তিশালী হবে। জাতীয় দলের চিন্তা করেই এটি বলা।
প্রশ্ন: মৌসুম তো শেষ। আগামী মৌসুমে বাংলাদেশে দেখা যাবে তো?
দোরিয়েলতন: এ মুহূর্ত থেকে অন্তত এক সপ্তাহ আমি ফুটবল নিয়ে ভাবতেই চাই না। আমি শুধু বিশ্রাম নিতে চাই। বাড়ি ফিরতে চাই, স্ত্রী, মা এবং শিশুদের দেখতে চাই। এক সপ্তাহ পর হয়তো ভাবতে শুরু করব আগামী মৌসুমে কী করব।
প্রশ্ন: এই ক্লাবের (বসুন্ধরা কিংস) সঙ্গে কোনো কথাবার্তা হয়েছে?
দোরিয়েলতন: না। আমি শুধু বসুন্ধরা কিংসকে সব রকমের সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানাতে চাই। এখানে তিনটি মৌসুম খেলেছি। তারা আমাকে সবকিছু দিয়েছে, আমিও তাদের সবকিছু ফিরিয়ে দিয়েছি।
প্রশ্ন: যদি কোনো পর্যায় থেকে প্রস্তাব আসে বাংলাদেশ জাতীয় দলে খেলার, কী করবেন?
দোরিয়েলতন: এ প্রশ্নটা আমাকে অনেকেই করেন। কারণ, সবাই জানে এখানে ভালো ফিনিশারের প্রচণ্ড অভাব। সত্যি বললে, বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা যেভাবে খেলে, তা আমার খুব পছন্দ। কারণ, তারা খুব কঠোর পরিশ্রম করে খেলে। তবে এটা ঠিক, দলে একজন সত্যিকারের নাম্বার নাইন নেই। (জাতীয় দলে খেলা) আমি কখনো এ নিয়ে ভাবিনি। তবে কেউ প্রস্তাব দিলে আমি ভাবব। আমাকে অবশ্যই অনেক ভাবতে হবে। হুট করে ‘হ্যাঁ’ বলা আবার ‘না’ বলার সুযোগ নেই।
প্রশ্ন: বাংলাদেশ দলে নাম্বার নাইন না থাকার কারণ কী?
দোরিয়েলতন: আমি বসুন্ধরার ফরোয়ার্ড লাইনের বেশ কয়েকজনকে বলেছি তোমরা কেন নাম্বার নাইনে চেষ্টা করো না? আমি (শাহরিয়ার) ইমনকে বলেছি, তোমাদের প্রচুর উইঙ্গার আছে। তুমি কেন নাম্বার নাইনে খেলার চেষ্টা করছ না? আমি তোমাদের সাহায্য করতে পারি।
প্রশ্ন: সমস্যাটা কি মানসিকতার?
দোরিয়েলতন: একদমই তাই। আমি বলেছি, আমার অভিজ্ঞতা ওদের কাজে লাগবে। প্রয়োজনে সাহায্য করব। স্থানীয়দের আরও বেশি কিছু করতে হবে। এটি বলতে চাই না যে তাদের যোগ্যতা নেই, তারা দৌড়ায় না। বলেছি, নিজেকে মেরে ফেলার দরকার নেই, কিছু সময় বাড়তি অনুশীলন করো, তাহলেই ভালো স্ট্রাইকার হওয়া যাবে।






