রোনালদোর শিরোপা জয়ে সৌদি প্রজেক্ট সফল না ব্যর্থ?

সৌদি প্রো লিগের শিরোপা হাতে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর উল্লাস।
অবশেষে দীর্ঘ সাড়ে তিন বছরের অপেক্ষার পালা শেষে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর হাতে প্রথমবারের মতো উঠল সৌদি প্রো লিগের শিরোপা। পর্তুগিজ মহাতারকার রিয়াদে আগমনের পর থেকে যে মহাযজ্ঞ শুরু হয়েছিল, এই ট্রফি জয় যেন তারই এক কাঙ্ক্ষিত সমাপ্তি। আল-নাসরের এটি ১১তম লিগ শিরোপা হলেও, রোনালদোর ক্যারিয়ারের এটি অষ্টম ঘরোয়া লিগ জয়। এর আগে তিনি ইংল্যান্ড (ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড), স্পেন (রিয়াল মাদ্রিদ) ও ইতালিতে (জুভেন্তাস) লিগ জয়ের স্বাদ পেয়েছিলেন।
সৌদি প্রো লিগে শিরোপার পথটা আল-নাসরের জন্য মোটেও মসৃণ ছিল না। গত ১২ মে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আল-হিলালের বিপক্ষে হাইভোল্টেজ ম্যাচটি রূপ নিয়েছিল মহানাটকীয়তায়। ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকা আল-নাসর যখন জয়ের প্রহর গুনছিল, ঠিক ৯৭ মিনিটে গোলরক্ষক বেন্তোর এক অবিশ্বাস্য ভুলে আত্মঘাতী গোল হজম করে বসে তারা। ম্যাচটি ১-১ সমতায় শেষ হওয়ায় লিগ নির্ধারণের অপেক্ষা বাড়ে। তবে গত বৃহস্পতিবার রাতে দাপুটে জয়ে শেষ পর্যন্ত ট্রফি নিশ্চিত করে মাঠ ছাড়ে আল-নাসর।
এমলিয়ন বিজনেস স্কুলের আফ্রো-ইউরেশিয়ান স্পোর্টের অধ্যাপক সাইমন চ্যাডউইক বিবিসিকে বলেন, 'রিয়াদের নীতিনির্ধারকদের কাছে আল-নাসরের এই জয় রোনালদোকে দলে ভেড়ানো এবং ক্লাবটিকে পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের (পিআইএফ) অধীনে রাখার সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা প্রমাণ করেছে। তবে আল-নাসরকে যদি তাদের এশীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের মতো আইকনিক মর্যাদায় পৌঁছাতে হয়, তবে ঘরোয়া সাফল্যের পাশাপাশি মহাদেশীয় ট্রফিও জিততে হবে।'
কয়েক দিন আগেই এএফসি চ্যাম্পিয়নস লিগ টুর ফাইনালে জাপানের গাম্বা ওসাকার কাছে হেরে বড় ধাক্কা খেয়েছিল আল-নাসর। সেই হতাশা কাটাতে এই লিগ জয় রোনালদোর জন্য এক বিরাট স্বস্তি হয়ে এসেছে।
সাফল্যের পাশাপাশি এবারের মৌসুম জুড়ে ছিল তুমুল বিতর্ক। আল-হিলালের তুলনায় পিআইএফ আল-নাসরকে কম সুবিধা দিচ্ছে— এমন অভিযোগে গত ফেব্রুয়ারিতে দুটি ম্যাচ খেলেননি রোনালদো। উল্টো দিকে, আল-আহলির ইভান টোনি ও ব্রাজিলিয়ান উইঙ্গার গ্যালেনোর মতো তারকারা অভিযোগ তুলেছেন, লিগ কর্তৃপক্ষ খোদ রোনালদো ও আল-নাসরকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে।
এসব সমালোচনার জবাবে রোনালদো বেশ ক্ষোভ প্রকাশ করেই বলেছিলেন, 'সবাই শুধু অভিযোগ করছে। এটা ফুটবল, কোনো যুদ্ধ নয়। আমি মৌসুমের শেষে মুখ খুলব, কারণ আমি এখানে অনেক খারাপ জিনিস দেখেছি।'
রোনালদোর এই বিজয়োৎসবের মধ্যে সৌদি আরবের বিশাল ক্রীড়া বিনিয়োগ নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন। সম্প্রতি পিআইএফ ঘোষণা করেছে, চলতি মৌসুম শেষে তারা গলফ খেলায় অর্থায়ন বন্ধ করে দেবে। আগামী ২০২৯ সালের উইন্টার এশিয়ান গেমসের আসরটি অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিন বছরের চুক্তি শেষে ডব্লিউটিএ টেনিস ফাইনালও সৌদি আরব ছেড়ে যাচ্ছে বলে খবর।
ফুটবলেও ২০২৩ সালের সেই অবিশ্বাস্য খরচের জোয়ার এখন আর নেই। ৭০০ মিলিয়ন পাউন্ডের সেই উন্মাদনা কাটিয়ে সৌদি ক্লাবগুলো এখন কম বয়সী ও ভবিষ্যতে ভালো দামে বিক্রি করা যাবে— এমন ফুটবলারদের দিকে ঝুঁকছে। যদিও মাতেও রেতেগুই বা ডারউইন নুনিয়েজের মতো বড় সাইনিং এখনো হচ্ছে এবং লিভারপুল ছেড়ে দেওয়া মোহামেদ সালাহকে পেতে আল-ইত্তিহাদ মুখিয়ে আছে, তবে সবকিছুর পেছনেই এখন থাকছে হিসেবি বাজেট।
রোনালদোর এই লিগ জয়কে অনেকেই দেখছেন সৌদি আরবের লাগামহীন ফুটবল খরচের 'শেষ সোনালি অধ্যায়' হিসেবে। তবে আপাতত মাঠের বাইরের এই হিসাব-নিকাশ দূরে সরিয়ে রিয়াদের আল-নাসর সমর্থক আর রোনালদোর কোটি কোটি ভক্ত মেতে আছেন চ্যাম্পিয়ন হওয়ার উচ্ছ্বাসে।




