তাদের লড়াই বদলে দিয়েছিল ফুটবল

২০০৭ সালের ফিফা বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতেছিলেন ব্রাজিলের কাকা। পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে ঘটে যাওয়া এক অপ্রস্তুত মুহূর্ত ভাইরাল হয়েছিল সেবার। তখন দ্বিতীয় হয়েছিলেন তরুণ লিওনেল মেসি আর তৃতীয় ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো। কিন্তু ব্রাজিলের কিংবদন্তি পেলে ভুল করে দ্বিতীয় হওয়ার ট্রফিটি তুলে দেন রোনালদোর হাতে। ফিফা সভাপতি সেপ ব্লাটার হেসে দুজনকে ট্রফিগুলো বদল করার অনুরোধ জানান। দুজনের মুখেই তখন বেশ বিরক্তির ছাপ।
পরের ১০ বছর ব্যালন ডি’অর কিংবা ফিফার যত পুরস্কার, তার প্রতিটিই জিতেছেন হয় মেসি নয়তো রোনালদো। ২০০৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত ইউরোপের বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের জন্য দেওয়া ২৯টি খেতাবের ২০টিই গেছে এই দুজনের ঝুলিতে। দুজন মিলে করেছেন প্রায় ২ হাজার ক্যারিয়ার গোল। ক্লাব ও দেশের হয়ে জিতেছেন ৮০টির বেশি ট্রফি। অসংখ্য ব্যক্তিগত পুরস্কার ও রেকর্ডে মেসি ও রোনালদো এখন ফুটবল ইতিহাসেরই সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার। দুজনের একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার যে লড়াই, সেটা বদলে দিয়েছে ফুটবলই।
দুজনের সঙ্গে খেলা আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী তারকা আনহেল দি মারিয়া বিবিসি স্পোর্টের ডকুমেন্টারিতে বলেছেন, ‘তাদের মতো দুজন খেলোয়াড় এত বছর ধরে এই উচ্চতায় লড়াই করে গেছে, ব্যালন ডি’অরের জন্য লড়েছে আর এতগুলো গোল করেছে... আমার মনে হয় না আর কখনো এমন কিছু দেখতে পাব। তারা দুজনই ফুটবলকে বদলে দিয়েছে।’
মেসির সঙ্গে তুলনায় রোনালদো ২০১২ সালে বলেছিলেন, ‘আপনি একটা ফেরারির সঙ্গে পোরশের তুলনা করতে পারবেন না। দুটির ইঞ্জিন আলাদা। কিছু লোক বলে আমি সেরা, কিছু লোক বলে সে সেরা। তারাই সিদ্ধান্ত নেবে এই মুহূর্তে কে সেরা এবং আমার মনে হয় সেটা আমিই।’ দুজনেরই জীবনীকার ও স্প্যানিশ ফুটবল বিশেষজ্ঞ গুইলেম বালাগ তাদের তুলনায় বলেছেন, ‘আমার কাছে মেসি ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড় এবং ক্রিস্তিয়ানো ইতিহাসের সেরা গোলদাতা।’
রোনালদো-মেসিকে একে অন্যের বিপরীত মেরুর বলে মনে করেন অনেকে। কেননা, একজন ড্রিবলার, অন্যজন শারীরিক শক্তির প্রতীক। একজন লাজুক জাদুকর, অন্যজন অহংকারী। পেপ গার্দিওলার বার্সেলোনা বনাম জোসে মরিনহোর রিয়াল মাদ্রিদ। অ্যাডিডাস বনাম নাইকি। রিয়াল মাদ্রিদে রোনালদোর যোগ দেওয়ায় দুজনের প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঝাঁজ বাড়ে আরও। স্পেনে তারা একসঙ্গে যে ৯টি মৌসুম কাটিয়েছিলেন, তাতে রোনালদো রিয়ালের হয়ে ৪৩৮ ম্যাচে ৪৫০ গোল করেছিলেন। আর মেসি বার্সেলোনার হয়ে ৪৭৬ ম্যাচে করেছিলেন ৪৭১ গোল। স্প্যানিশ ফুটবল লেখক সিড লভ বলেছেন, ‘মেসি-রোনালদো প্রতিদ্বন্দ্বিতার বৈশ্বিক প্রচার ছিল একেবারে অবিশ্বাস্য। তবে তারা একে অন্যকে তেমন একটা পাত্তা দিত না, তুলনা করাটা তারা ঘৃণা করত।’
২০১৭ সালে রিয়াল মাদ্রিদের মাঠে মেসি ৯২তম মিনিটে গোলটি করে নিজের জার্সি খুলে উঁচিয়ে ধরেন। এর ঠিক কয়েক মাস পর বার্সেলোনায় স্প্যানিশ সুপার কাপে গোল করার পর রোনালদো একই রকম উদযাপন নকল করেন। একে অন্যকে হারানোর অর্থ কতটা গভীর, তার প্রমাণ প্রয়োজন হলে এই ছবিগুলোই তার সাক্ষী। রোনালদো টানা চতুর্থবার বিশ্বের সবচেয়ে বেশি আয় করা অ্যাথলেট হিসেবে ফোর্বস মানি লিস্টের শীর্ষে , যার মোট আয় ৩০ কোটি ডলার (২২৩ মিলিয়ন পাউন্ড)। আর ১৪ কোটি ডলার (১০৪ মিলিয়ন পাউন্ড) আয় নিয়ে এ তালিকায় তৃতীয় স্থানে মেসি।
সেই দুজন এখন অবসরে। তুেল রেখেছেন জাতীয় দলের জার্সি। বিদায়টা অবশ্য হয়েছে অন্য আবহে। মেসি পেয়েছে বিদায়ী সংবর্ধনা। সিক্ত হয়েছেন আর্জেন্টাইনদের ভালোবাসায়। সেখানে কোচ জর্জ জেসুসের সঙ্গে দ্বন্দ্বে ক্যাম্প ছেড়ে এসে অবসর নিয়েছেন রোনালদো। জোড় গুঞ্জন, বিদায়ী ম্যাচটাও খেলতে চান না তিনি।
দুজন কাছাকাছি সময়ে অবসর নিলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতাটি তুলে রাখতে পারলেন কি? অনলাইনে চলছে দুজনের বিদায়ী বার্তার ভিউয়ের প্রতিযোগিতা। এ বছরই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায়ের ঘোষণা দিয়ে ইনস্টাগ্রামে পোস্ট দিয়েছিলেন মেসি। সেই পোস্টটি দেখা হয়েছে ৪৬ কোটি বারের বেশি। এতে লাইক পড়েছে ২ কোটি, মন্তব্য ৮ লাখ ৯২ হাজার এবং শেয়ার হয়েছে ২৬ লাখ বার। রোনালদোর অবসর ঘোষণার ভিডিওটি ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ে দেখা হয়েছে ৪৫ কোটি ৫০ লাখের বেশি বার। এতে লাইক পড়েছে ৩ কোটি ২০ লাখ, মন্তব্য ৩২ লাখ এবং শেয়ার হয়েছে ৬২ লাখ বার।
সামনে আছে আরও এক লড়াই। কেননা, দুজনের সামনেই ১ হাজার গোলের মাইলফলকে পা রাখার হাতছানি!



