সোনালি প্রজন্মের বিদায়

চোখের জলে শেষ পর্যন্ত খালি হাতেই বিদায় নিল বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্ম।
তারা একসঙ্গে এলেন, পায়ের জাদুতে ফুটবল বিশ্বকে মন্ত্রমুগ্ধ করলেন, র্যাংকিংয়ের চূড়ায়ও বসলেন। কিন্তু জিততে পারলেন না কোনো ট্রফি। চোখের জলে শেষ পর্যন্ত খালি হাতেই বিদায় নিল বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্ম। এই বিদায় কোনো সাধারণ বিদায় নয়। এ যেন ফুটবলের ইতিহাসের অন্যতম বড় এক আক্ষেপের উপাখ্যান।
বেলজিয়াম ফুটবলে একঝাঁক তরুণ ফুটবলার এসেছিলেন বিপ্লব ঘটাতে। এডেন হ্যাজার্ডের জাদুকরী ড্রিবলিং, কেভিন ডি ব্রুইনার নিখুঁত বুদ্ধিদীপ্ত পাসিং আর রোমেলু লুকাকুর অবিশ্বাস্য ফিনিশিং— সব মিলিয়ে এই দলটিকেই বলা হচ্ছিল সোনালি ট্রফি জেতার সবচেয়ে যোগ্য দাবিদার। এই ত্রয়ীর সঙ্গে ছিলেন থিবো কোর্তোয়া, অ্যাক্সেল উইটসেল, মুসা দেম্বেলে, ভিনসেন্ট কোম্পানি, মারুয়ান ফেলাইনিরাও।
২০১৪ বিশ্বকাপ দিয়ে যাত্রা শুরু বেলজিয়ামের এই সোনালি প্রজন্মের। সেবার অবশ্য বিদায় কোয়ার্টার ফাইনালে। ২০১৮-তে ফাইনালের খুব কাছে গিয়েও হয় স্বপ্নভঙ্গ, ইতিহাসের সেরা পারফরম্যান্সে বেলজিয়াম হয় তৃতীয়। ইউরোতেও বেলজিয়াম আশা জাগিয়ে বেশিদূর যেতে পারেনি। ২০১৬ ও ২০২০ ইউরোতে টানা দুবার কোয়ার্টারে থেমেছে হ্যাজার্ডদের যাত্রা।
২০১৮ থেকে ২০২২, ইতিহাস গড়ে টানা ১৪৪২ দিন র্যাংকিংয়ের শীর্ষে ছিল বেলজিয়াম। অনেকেই তাই স্বপ্ন দেখছিলেন, ২০২২ বিশ্বকাপে অবিশ্বাস্য কিছু করে দেখাবে দলটি। হলো ঠিক উল্টোটা। কাতার বিশ্বকাপ দেখল বেলজিয়ামের হতশ্রী রূপ। না ছিল ফর্ম, না ছিল একতা, ছন্নছাড়া বেলজিয়াম এবার তাই বিদায় গ্রুপ পর্বেই।
বেশিরভাগ তারকা বিদায় নিয়েছেন আগেই। এ আসরে টিকে ছিলেন ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে থাকা ডি ব্রুইনা, লুকাকু ও কোর্তোয়া। স্বপ্নটা ছিল শেষটা রাঙিয়ে বিদায় নেওয়ার।
সেটিও হলো না। আশা জাগিয়েও বেলজিয়াম বিদায় নিল কোয়ার্টার ফাইনালেই। বেলজিয়াম ও কোর্তোয়া দুষতে পারেন দুর্ভাগ্যকেও। স্পেনের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে বাঁ ঊরুর চোটের কারণে ৭১ মিনিটে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন এ রিয়াল মাদ্রিদ কিপার। বদলি হিসেবে নামেন সেনে ল্যামেন্স।
ল্যামেন্সকে নামানোই যেন কাল হলো বেলজিয়ামের। ৮৮ মিনিটে এই কিপারের ভুলেই গোল পান মিকেল মেরিনো, বিদায়ঘণ্টা বাজে বেলজিয়ামের।
ডাগআউটে বসে দলের বিদায় দেখেছেন, দেখেছেন বিশ্বকাপ স্বপ্ন ধূলিসাৎ হতে। এমন শেষের পর নিজের আক্ষেপটা কোর্তোয়া ঝেড়েছেন গণমাধ্যমে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেছেন, ‘আমি তো খেলা চালিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। আমাকে তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্তটি ছিল কোচের। ভবিষ্যতের কথা ভেবেই তিনি এমনটা করেছেন।’
অনেকেই বলছেন, কোর্তোয়া থাকলে এমন ভুল হতো না, বদলে যেতে পারত ম্যাচের ফলও।
যদি, কিন্তুর সময়টা অবশ্য শেষ। সোনালি প্রজন্মের যে তিনজন বাকি ছিলেন, তাদের হয়তো বিশ্বমঞ্চে আর দেখা যাবে না। ৩৫ বছরের ডি ব্রুইনা, ৩৩ বছরের লুকাকু, ৩৪ বছরের কোর্তোয়া; ২০৩০ বিশ্বকাপের আগেই হয়তো বিদায় বলবেন বেলজিয়ামকে।
ইতিহাস শুধু বিজয়ীদের মনে রাখে, ফুটবলের এই নির্মম সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বেলজিয়াম।
একঝাঁক তারকা একটি ট্রফি ছুঁয়ে দেখতে পারলেন না, এর চেয়ে বড় ফুটবলীয় ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে! বেলজিয়াম কি আর কখনো এমন সোনালি প্রজন্ম পাবে?




