বিদায়ী ম্যাচে ৯১ টাচের গল্প

সংগৃহীত ছবি
চিলির রেফারি ফার্নান্দো ভেজার দিয়াস যেন সেই আবেগঘন রাতের পরিবেশ পুরোপুরি বুঝতে পেরেছিলেন। পেনাল্টি বক্সে অগাস্টিন গিয়াই ফাউলের শিকার হওয়া মাত্রই তিনি পেনাল্টির বাঁশি বাজাতে এক সেকেন্ডও দেরি করেননি। ভিএআর রিপ্লেতেও আফ্রিকান খেলোয়াড়ের ফাউলের বিষয়টি স্পষ্ট ছিল।
এরপর তৈরি হয় এক নিখুঁত দৃশ্যপট। লিওনেল মেসি বল হাতে নিয়ে পেনাল্টি স্পটে দাঁড়ান; যেন সেই অধরা গোলের দেখা পেতে তিনি মুখিয়ে ছিলেন। আর্জেন্টিনা ও ইন্টার মায়ামির হয়ে নিজের শেষ তিনটি পেনাল্টি মিস করলেও এবার আর ভুল করেননি ‘এল পুলগা’।
মার্সেল দানজিনুর পোস্টের বাঁ-পাশের ওপরের কোণ দিয়ে এক শক্তিশালী শটে বল জালে জড়িয়ে দেন। সতীর্থদের সঙ্গে উদযাপনের পাশাপাশি পুরো মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামকে তিনি উল্লাসে ভাসিয়ে দেন, যা জাতীয় দলের হয়ে তার বর্ণাঢ্য ও স্বপ্নের মতো ক্যারিয়ারে এক নিখুঁত সমাপ্তি। বেনিনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার এই ৩-০ ব্যবধানের জয়টি মেসির বিদায়ী পারফরম্যান্সের এক ক্ষুদ্র অংশ মাত্র।
ম্যাচ জুড়ে মেসি বল স্পর্শ করেছেন ৯১ বার। ১টি গোলের পাশাপাশি দুটি অ্যাসিস্ট। এর চেয়ে ভালো চিত্রনাট্য আর কি হতে পারে।
মেসির এই শেষ ম্যাচটি বিশ্লেষণ করা বেশ জটিল। যেমনটা ধারণা করা হয়েছিল, ম্যাচটি কেবল একটি প্রীতি ম্যাচের চেয়ে বেশি কিছু ছিল—এটি ছিল মূলত একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। আর সে কারণেই কোচ লিওনেল স্কালোনি বিদায় নিতে যাওয়া নিকোলাস ওতামেন্দি এবং রদ্রিগো দে পলকে মূল একাদশে রাখেন।
মেসির সতীর্থরা বারবার তার পায়েই বল তুলে দিতে চাইছিলেন। হয়তো তাদের প্রত্যেকের মনেই একটিই আশা ছিল—মেসির শেষ গোলটির অ্যাসিস্ট করা। সে কারণেই মাঠে বারবার পাস দেওয়ার তাড়াহুড়ো ও ভুল দেখা যাচ্ছিল। অতীতে জাতীয় দলকে ঘিরে সমালোচনা বা কোনো খেলোয়াড়কে অতিরিক্ত উচ্চতায় বসানোর যে প্রবণতা এই দলটি দূর করেছিল, শেষ দিনে অধিনায়কের পা থেকে একটি গোল পাওয়ার তাড়নায় সেই দৃশ্য আবারও মনুমেন্তালের মাঠে ফিরে আসে। তবে এমন এক আবেগপূর্ণ দিনে এই স্বাধীনতাটুকু দেওয়া স্বাভাবিকই ছিল।
পুরো ম্যাচজুড়ে মেসি ছিলেন দারুণ আবেগপ্রবণ। জাতীয় সংগীতের সময় এবং ম্যাচের ১০ মিনিটের মাথায় যখন তার প্রতি সম্মানে খেলা থামিয়ে পুরো স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে করতালি দিতে শুরু করে, তখন নিজের চোখের পানি ধরে রাখতে তাকে বেশ কষ্ট করতে হয়। এমনকি বেনিনের প্রত্যেক খেলোয়াড় মাঠে এসে এই তারকাকে অভিবাদন জানান।
মাঠের সব আবেগ জমা হয়েছিল মেসিকে ঘিরে, আর গ্যালারিতে থাকা ৮৫,০০০-এর বেশি ভক্ত কেবল প্রিয় তারকাকে শেষবারের মতো অভিবাদন জানাতে এবং আকাশি-সাদা পোশাকে তার অবিশ্বাস্য কীর্তিগুলোর জন্য ধন্যবাদ জানাতে রিভার প্লেটের মাঠে হাজির হয়েছিলেন। তিনি তো আর কেউ নন, ফুটবলের এক জীবন্ত ঈশ্বর—ফুটবল ঈশ্বরের সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর অবতার। ফুটবল জাদুকর হওয়াই ছিল মেসির নিয়তি।



