বিশ্বকাপও তাদের স্বপ্ন দেখায় না!

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিশ্বকাপ ও ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের উন্মাদনা বিস্ময়কর। এমনভাবে তারা বিশ্বকাপে মাতে, মনে হবে ফুটবল তাদের হৃদয়ে এবং বিশ্বকাপ থেকে খানিক দূরে বাংলাদেশের ফুটবল। কিন্তু সত্যটা হলো দূর কল্পনায়। আর এই সত্যিটা জানলে বিশ্ব ফুটবল তারকাদের বিস্ময়ও বেড়ে যায় বহুগুণ।
যে দেশটি দক্ষিণ এশিয়ার ছোট্ট পুকুরেই হাবুডুবু খায়, তাদের কি বিশ্বকাপের মহাসাগরে তরী ভাসানো স্বপ্ন দেখা সাজে? ২০১২ সালে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের তৎকালীন সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনের একটা ঘোষণার কথা মনে পড়ে যায়। তিনি কাতার বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং পরে হাসির পাত্র হয়েছিলেন ২০২৪ সাল পর্যন্ত সাফ জয়ের পথ খুঁজে বের করতে না পেরে।
সালাউদ্দিনের বিদায়ের পর প্রেক্ষাপট খুব যে বদলেছে, তা নয়। তাবিথ আউয়াল এসে হামজা চৌধুরী, শমিত সোমের মতো বংশোদ্ভূত ফুটবলারকে উড়িয়ে এনে ভাগ্যবদলের চেষ্টা করছেন। হামজা আসায় জাতীয় দলের শক্তি বাড়িয়েছেন ঠিক, তবে সামগ্রিক অর্থে ভাগ্যবদল হয়নি। ভারতকে হারালেও এশিয়ান কাপের টিকিটও কাটতে পারেনি বাংলাদেশ।
বাছাইয়ের গণ্ডি পেরিয়ে কুরাসাও, কেপ ভার্দে, উজবেকিস্তান, জর্ডানের মতো ফুটবলে অনগ্রসর দেশগুলো বিশ্বমঞ্চ মাতিয়েছে। অথচ বাংলাদেশ বিশ্বকাপ বাছাই পর্বেই খাবি খেয়েছে। গ্রুপের ছয় ম্যাচে পাঁচ হার এবং লেবাননের সঙ্গে ঘরের মাঠে ১-১ ড্রয়ে বাছাই শেষ করেছে তলানিতে থেকে। এরপর এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের ছয় ম্যাচে এক জয়, দুই ড্র ও তিন হারে ৫ পয়েন্ট নিয়ে চার দলের গ্রুপে তৃতীয় হয় বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ দলে অন্যতম সেন্টারব্যাক তপু বর্মণ বাস্তবতাকেই সামনে টেনে এনেছেন, ‘কুরাসাও, কেপ ভার্দে, জর্ডান বা উজবেকিস্তানের মতো দলগুলো একটা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েই পৌঁছেছে বিশ্বকাপের মঞ্চে। হুট করেই কিন্তু তাদের স্বপ্নপূরণ হয়নি। হয়তো ১০-১২ বছরের একটা পরিকল্পনা তাদের ছিল। সত্যি বললে ফুটবলে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে।’
মাত্রই বাংলাদেশের কোচের দায়িত্ব নেওয়া মার্কিন কোচ থমাস ডুলি বাংলাদেশের বিশ্বকাপ স্বপ্ন আর বাস্তবতার ফারাকের প্রশ্নে ভীষণ ইতিবাচক, ‘এই মুহূর্তে আমাদের চলার পথে অনেক বাধা রয়েছে। তবে এই বাধাগুলো আমি সমুদ্রসৈকতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নুড়ি-পাথরের মতো ভাবতে পছন্দ করি। আমরা যদি পাথরগুলো না সরাই, সেগুলো বাধা হয়ে থেকে যাবে। আর যদি একটি একটি করে পাথর তুলে নিয়ে সঠিক জায়গায় বসাই, তবে সেই পাথরগুলোই পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার সিঁড়িতে রূপ নেবে। খেলোয়াড়দের মান, মানসিকতা, পরিচালনা ব্যবস্থা, পেশাদারিত্ব এবং ফুটবল সংস্কৃতির উন্নয়ন ঘটাতে হবে। সঠিক উপায়ে খেলোয়াড় তৈরির জন্য একাডেমি গড়ে তোলা এবং আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড়দের খুঁজে বের করা। প্রতিটি ছোট ছোট উন্নয়নই ওপরের দিকের এক একটি নতুন ধাপ।’
এবার ৪৮ দল নিয়ে হয়েছে বিশ্বকাপ। ফিফা দল বাড়িয়ে ৬৪ করার পরিকল্পনা করছে। এরপরও বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সিনিয়র সহসভাপতি ও বসুন্ধরা কিংসের সভাপতি ইমরুল হাসান সুযোগ দেখেন না, ‘যদি দল বাড়েও, আমি মনে করি না এখন যেভাবে বাছাই প্রক্রিয়া হয় তাতে বাংলাদেশের সুযোগ তৈরি হবে। তবে ফুটবল ভক্তদের এক-চতুর্থাংশ যেহেতু এই দক্ষিণ এশিয়ার, ফিফা বাণিজ্যিক দিক চিন্তা করে যদি অঞ্চলভিত্তিক দল নেওয়ার কথা ভাবে, যেমন দক্ষিণ এশিয়া থেকে যদি দুটি দলের কোটা করে দেয়, তবে হয়তো বাংলাদেশের একটা সুযোগ তৈরি হবে।’
যে দেশের ঘরোয়া ফুটবলের অবকাঠামো যত মজবুত, জাতীয় দলও ততটাই শক্তিশালী। বাংলাদেশে ঘরোয়া ফুটবল বড় এক দীর্ঘশ্বাসের প্রতিশব্দ। দুই দশকেও পেশাদার লিগ সত্যিকারের পেশাদার রূপ পায়নি। বাফুফে ক্লাবগুলোকে পারেনি পেশাদার পথটা চেনাতে। যুব ফুটবল বাফুফের কিছু কর্তা ঝাঁকে ঝাঁকে ভিনদেশি আমদানি করে সস্তা সাফল্যের পিছু ছুটছেন। অথচ তৃণমূলের ফুটবল পড়ে আছে অবহেলায়। তাই, বিশ্বকাপে খেলা নয়, বরং বাঙালির কাছে শুধুই এটি কয়েক মাসের আবেগ আর উন্মাদনা। ফুটবল কর্তাদের মধ্যেও কোনো তাড়া নেই। তাদের কাছে বিষয়টি এই গানের লাইনের মতোই—
‘এমনি করে যায় যদি দিন যাক না...।’




