ভক্তদের জন্যই ফুটবলারদের আকাশচুম্বী বেতন

ডাক্তাররা জীবন বাঁচান, শিক্ষকরা ভবিষ্যৎ গড়েন আর ফায়ারফাইটাররা নিজের জীবন বাজি রেখে মানুষকে রক্ষা করেন। অথচ মাঠের এক টুকরো ঘাসে শুধু একটা বল কিক করার জন্য একজন ফুটবলার সপ্তাহে তিন লাখ পাউন্ড বা তার চেয়েও বেশি বেতন পান। আপাতদৃষ্টিতে এই ব্যবধানকে চরম সামাজিক অবিচার বলে মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই ক্ষোভের পেছনে রয়েছে ফুটবলের বিশাল বাজার, যা কখনোই নৈতিকতা বা সাম্যের হিসাব কষে চলে না। আর এই বিশাল অঙ্কের বেতনের পেছনে আসল কারিগর সমর্থকেরাই।
আধুনিক ফুটবলের আর্থিক কাঠামোর মূলে রয়েছে অ্যাটেনশন ইকোনমি। ফুটবলাররা কোটি কোটি টাকা পান কারণ তারা বৈশ্বিক বিনোদন বাজারের অন্যতম প্রধান সম্পদ। দর্শকদের এই আগ্রহই পরবর্তীতে টেলিভিশন সম্প্রচার স্বত্ব, ক্লাব স্পন্সরশিপ বিক্রির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজার তৈরি করে। সমর্থকেরাই স্টেডিয়ামের টিকিট কেনেন, সাবস্ক্রিপশন নেন এবং অনলাইনে প্রিয় খেলোয়াড়কে অনুসরণ করে এমন এক বিশাল দর্শকশ্রেণি তৈরি করেন, যার পেছনে বড় বড় ব্র্যান্ডগুলো ছুটে চলে। ইউরোপের শীর্ষ ২০টি ক্লাব মাত্র এক মৌসুমেই সম্মিলিতভাবে ১২.৪ বিলিয়ন ইউরো আয় করে। এই আয়ের প্রধান উৎস তিনটি—বাণিজ্যিক চুক্তি, সম্প্রচার স্বত্ব এবং ম্যাচডে থেকে আসা আয়। এছাড়া বর্তমানে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো কিংবা লিওনেল মেসির মতো তারকারা শুধু মাঠের পারফরম্যান্স নয়, বরং তাদের বৈশ্বিক ডিজিটাল উপস্থিতির মাধ্যমে পুরো ক্লাব ও লিগের আর্থিক চিত্রই পাল্টে দিচ্ছেন। রোনালদোর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ১ বিলিয়ন অনুসারী বা মেসির ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেওয়ার পর আমেরিকার লিগে টিকিটের আকাশচুম্বী চাহিদা প্রমাণ করে যে, এই তারকারা তাদের উপস্থিতির মাধ্যমেই পুরো সিস্টেমের আয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেন।
এই আকাশচুম্বী অর্থের পালে সবচেয়ে বড় হাওয়া দিয়েছে ক্লাবগুলোর বিশাল অঙ্কের মালিকানা পরিবর্তন ও রেকর্ড ট্রান্সফার ফি। ২০১৭ সালে নেইমারকে বার্সেলোনা থেকে ২২২ মিলিয়ন ইউরো দিয়ে পিএসজির দলে ভেড়ানোর ঘটনা ফুটবলের গতানুগতিক আর্থিক নীতিকেই ওলটপালট করে দেয়। এর পেছনে ছিল তেলসমৃদ্ধ কাতার বা সৌদির মতো রাষ্ট্রের সার্বভৌম তহবিল, যাদের কাছে মুনাফার চেয়ে ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারই মূল লক্ষ্য। অন্যদিকে এই অতিরিক্ত খরচের চাপ সামলাতে গিয়ে ক্লাবগুলো অনেক সময়ই টিকিটের দাম বাড়িয়ে দেয়।
সমাজ সবসময় প্রত্যাশা করে যে মানুষের কাজের প্রকৃত মূল্য অনুযায়ীই তার পারিশ্রমিক নির্ধারিত হবে। কিন্তু সম্প্রচার ও প্রযুক্তির কল্যাণে ফুটবলাররা আজ সরাসরি বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি দর্শকের কাছে পৌঁছে যাচ্ছেন, যা সাধারণ পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে সম্ভব নয়। সমর্থকরা যখন দেখেন তাদের সুগভীর আবেগ ও ভালোবাসাকে পুঁজি করে গুটিকয়েদ মানুষ রাতারাতি অবিশ্বাস্য রকমের ধনী হয়ে উঠছেন, তখন ভেতরে এক ধরণের ক্ষোভ আর অসহায়ত্ব কাজ করে। কিন্তু দিনশেষে সমর্থকরাও ভালো করেই জানেন যে, ক্লাবগুলোর প্রতি তাদের এই অন্ধভক্তির কারণে তারা কখনোই স্টেডিয়াম বা স্ক্রিন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারবেন না। আর এই চরম সত্যটিই ফুটবল ব্যবসার মালিকদের আরও শক্তিশালী করে তোলে।
-ট্রিবিউনা অবলম্বনে




