স্যান্ডপেপারগেট
কাকতালীয়ভাবে ধরা পড়ে ক্রিকেট ইতিহাসের আলোচিত কেলেঙ্কারি

ক্রিকেট বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত ও কলঙ্কজনক ঘটনাগুলোর একটি ছিল ২০১৮ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বনাম অস্ট্রেলিয়া টেস্ট সিরিজে বল বিকৃতি বা ‘স্যান্ডপেপারগেট’ কেলেঙ্কারি। কেপ টাউন টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার সেই ন্যাক্কারজনক প্রতারণা কীভাবে ধরা পড়েছিল, সেটির পেছনের অজানা গল্প তুলে ধরেছেন ব্রডকাস্ট পরিচালক আলভিন নাইকার।
ঘটনার সূত্রপাত ২০১৮ সালের মার্চ মাসে নিউল্যান্ডস টেস্টের তৃতীয় দিনে। সে সময় ব্রডকাস্টের দায়িত্বে থাকা সুপারস্পোর্টের পরিচালক আলভিন নাইকার জানান, মাঠে তখন চরম উত্তেজনা বিরাজ করলেও তারা কোনো প্রতারণা ধরার উদ্দেশ্যে ক্যামেরা তাক করে রাখেননি। লঙ্কান বা অন্য কোনো সিরিজের মতো এটিও ছিল সাধারণ একটি লাইভ সম্প্রচার। বরং বেনক্রফটের ধরা পড়া ছিল একটি অবিশ্বাস্য কাকতালীয় ঘটনা। দক্ষিণ আফ্রিকার ইনিংসের ৩৫তম ওভারে রিভার্স সুইং নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ৪৩তম ওভারে বল উইকেটকিপারের হাত থেকে চলে যায় ফিল্ডার ক্যামেরন ব্যানক্রফটের কাছে। আলভিন নাইকার জানান, সাধারণত ক্যামেরা যখন ডেড বল বা সাধারণ মুহূর্ত দেখায়, তখন পরিচালকের নির্দেশেই ক্যামেরাম্যানরা বিভিন্ন দিকে ফোকাস করেন। সেই মুহূর্তে ক্যামেরাম্যান হঠাৎ করেই ব্যানক্রফটের ওপর ফোকাস ধরে রাখেন।
ভিডিওতে দেখা যায়, ব্যানক্রফট প্রথমে তার প্যান্টে বল ঘষছিলেন। পরে হঠাৎ বলটি হাতের তালুতে ঘষতে শুরু করেন। এরপর তিনি বলটি অন্য কারো কাছে ছুড়ে দিয়েই নিজের পকেটে হাত ঢোকান। ক্যামেরাম্যান সঙ্গে সঙ্গে তার পকেটের দিকে জুম করেন। স্লো-মোশন অপারেটর রিওয়াইন্ড করে স্পষ্ট দেখতে পান ব্যানক্রফটের হাতে আছে হলুদ রঙের স্যান্ডপেপার বা শিরিষ কাগজ। নিউল্যান্ডস মাঠের বিগ-স্ক্রিন বা বড় পর্দার কন্ট্রোলার ব্রডকাস্ট ফিডের পাশাপাশি স্টেডিয়ামের নিজস্ব কমার্শিয়াল ও গ্রাফিক্স দেখানোর জন্য স্বাধীনভাবে কাজ করেন। কাকতালীয়ভাবে ঠিক সেই মুহূর্তে বড় পর্দায় বেনক্রফটের বল ঘষার রিপ্লেটি ভেসে ওঠে। মাঠে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ব্যানক্রফট বুঝে যান, তার কুকীর্তি ধরা পড়েছে। তখন তিনি ঘাবড়ে গিয়ে চরম আতঙ্কে পকেট থেকে স্যান্ডপেপারটি বের করে অন্তর্বাসের মধ্যে লুকিয়ে ফেলেন। সুপারস্পোর্টের ক্যামেরায় সেই দৃশ্যও নিখুঁতভাবে ধরা পড়ে।
এ কারণে ম্যাচ রেফারি ও আম্পায়াররা মাঠে তল্লাশি চালালেও তখন কেবল সানগ্লাসের ব্যাগ দেখতে পান। তবে ব্রডকাস্ট টিমের কাছে ততক্ষণে সব পরিষ্কার হয়ে গেছে। থার্ড আম্পায়ার ও ধারাভাষ্যকারদের কাছ থেকে বারবার রিপ্লে দেখানোর অনুরোধ আসতে থাকে। এক পর্যায়ে থার্ড আম্পায়ার ইয়ান গোল্ড নাকি আলভিনকে অনুরোধ করেছিলেন, টিভি রিপ্লে আর না দেখানোর জন্য। জবাবে আলভিন সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি তার পেশাগত দায়িত্ব পালন করছেন এবং থার্ড আম্পায়ারকেও তার নিজের দায়িত্ব পালন করতে হবে।
ম্যাচের পর সংবাদ সম্মেলনে এসে নিজেদের দোষ স্বীকার করেন তৎকালীন অধিনায়ক স্টিভ স্মিথ ও ক্যামেরন ব্যানক্রফট। ডেভিড ওয়ার্নারসহ এই তিন তারকাকে দেশে ফিরিয়ে নেওয়া হয় এবং লম্বা সময়ের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়। অস্ট্রেলিয়ায় ফিরে সংবাদ সম্মেলনে স্টিভ স্মিথের কান্নায় ভেঙে পড়ার দৃশ্যটি দেখে ব্রডকাস্ট টিমের মধ্যেও এক ধরণের কষ্ট কাজ করেছিল বলে জানান আলভিন।
দীর্ঘ আট বছর পর অস্ট্রেলিয়ার আবারও যাচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে। এই সফরকে কেন্দ্র করে পুরনো ঘটনার স্মৃতিচারণ করে আলভিন নাইকার সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান যুগে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এত ক্যামেরা এবং প্রযুক্তি রয়েছে যে চাইলেও কেউ মাঠে কোনো কিছু লুকিয়ে রাখতে পারবে না। আধুনিক ক্যামেরার চোখ ফাঁকি দিয়ে মাঠে লুকিয়ে থাকা অসম্ভব।






