সোবার্স ছিলেন ব্র্যাডম্যানের ‘ফাইভ ইন ওয়ান’ ক্রিকেটার

স্যার গ্যারি সোবার্স (২৮ জুলাই ১৯৩৬-১৭ জুলাই ২০২৬)
ক্রিকেট যখন রঙিন হয়নি, তখনই রাঙিয়েছেন সবুজ মাঠের প্রতিটি কোণ। তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজের বার্বাডোজের সন্তান গ্যারফিল্ড সেন্ট অবরুন সোবার্স—পৃথিবী তাকে চিনেছে স্যার গ্যারি সোবার্স নামে। ক্যারিবিয়ান এই কিংবদন্তি ৯০তম জন্মদিনের মাত্র দুই সপ্তাহ আগে মারা গেলেন আজ। ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই অলরাউন্ডারের মৃত্যুতে ক্রিকেট বিশ্বে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
সোবার্স খেলেছেন এমন এক সময়ে যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট মানেই ছিল টেস্ট। ১৯৫৪ থেকে ১৯৭৪ পর্যন্ত ২০ বছরের ক্যারিয়ারে টেস্ট খেলেছেন ৯৩টি। ওয়ানডে মাত্র ১টি। ২৬ সেঞ্চুরি ৩০ ফিফটিসহ ৫৭.৭৮ গড়ে তার টেস্ট রান ৮ হাজার ৩২। সর্বোচ্চ রানের ইনিংস ৩৬৫*। নিয়েছেন ২৩৫ টেস্ট উইকেট। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে ২৮ হাজার ৩১৪ রানের পাশাপাশি নিয়েছেন ১ হাজার ৪৩ উইকেট। এমন কীর্তি আছে কতজনের? এজন্যই সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ক্রিকেটারের নামে দেওয়া হয় আইসিসির বর্ষসেরা ক্রিকেটারে পুরস্কার, যার নাম স্যার গারফিল্ড সোবার্স ট্রফি’। ১৯৭৫ সালে নাইটহুড (স্যার) উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল তাকে।
ব্যাট হাতে ধুন্ধুমার ফেলে দেওয়া সোবার্স ইনিংসের শুরুতে নতুন বলে ওপেন করতেন। আবার বল পুরনো হলে হয়ে যেতেন চায়নাম্যান বোলার। প্রয়োজনে মিডিয়াম পেসও করতে পারতেন! আবার ফিল্ডিংয়েও ছিলেন বিদ্যুতের মতো ক্ষিপ্র। তালুবন্দি করেছেন ১০৯ ক্যাচ। এজন্যই স্যার ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান তাকে বলতেন ‘ফাইভ ইন ওয়ান’ ক্রিকেটার।
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সোবার্সই প্রথম ব্যাটার হিসেবে এক ওভারে ছয় ছক্কা হাঁকান! ম্যালকম ন্যাশের ওভারের ষষ্ঠ বলে মারা ছক্কাটি এতই বিশাল ছিল যে, বলা হয়েছিল ‘ওটা ছয় নয়, বারো’। বল পড়েছিল স্টেডিয়াম পেরিয়ে কার পার্কের পাশের রাস্তায়!
মাঠে তার সাবলীল চলাফেরা ছিল রাজার মত। তার হাঁটার ভঙ্গিতেই ছিল রাজকীয় একটা ব্যাপার। ক্রিকেটের এই ‘রাজা’ জন্মভূমি বার্বাডোজের হয়ে খেলেছেন ফুটবল, বাস্কেটবল ও গলফও। ১৯৫৩ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সেই প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয় সোবার্সের। পরের বছরই সুযোগ পেয়ে যান ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলে।
বিশ্বক্রিকেটে প্রতাপ দেখানো ক্যারিবিয়ান দলে এক কিশোরের সুযোগ পাওয়াটা বিশেষ কিছুই ছিল। ক্যারিয়ারের প্রথম ইনিংসে কিংস্টনে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নিয়েছিলেন ৪ উইকেট। সেই ম্যাচে ব্যাট হাতে নেমেছিলেন ৯ নম্বরে। এরপর কখনও ওপেন করেছেন তো কখনও নেমেছেন মিডলঅর্ডারে। প্রথম সেঞ্চুরি ১৯৫৮ সালে কিংস্টনে পাকিস্তানের বিপক্ষ। পাকিস্তানি বোলারদের শাসন করে অপরাজিত ছিলেন ৩৬৫ রানে, যা ছিল সে সময় টেস্টের সর্বোচ্চ স্কোর।
এই রেকর্ড টিকেছিল ৩৬ বছর। ১৯৯৪ সালে সেই রেকর্ড ভেঙে দেন ওয়েস্ট ইন্ডিজেরই ব্রায়ান চার্লস লারা। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে লারাকে মাঠে থেকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন সোবার্স।
কেবল পরিসংখ্যানে সোবার্সের মতো প্রতিভাকে মাপা যায় না। তার ক্রিকেটীয় উচ্চতা আরও বিশাল। অধিনায়ক হিসেবে বহু ক্রিকেটারকে তুলে এনেছেন। ছিলেন শত শত ক্রিকেটারের আদর্শ। তিনি শুধু ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জেই নয়, গোটা বিশ্বের ক্রিকেটেরই চিরবিস্ময়। মৃত্যু হলেও থেকে যাবে সেই বিস্ময়। খেলাটির অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তিমান হিসেবে থেকে যাবে তার নাম।




