শেষ দিনে সম্ভব যেকোনো কিছুই

সংবাদ সম্মেলনে মোহাম্মদ আশরাফুল। ছবি: আগামীর সময়
ঢাকা টেস্টে চার দিনে প্রায় ২৬৮ ওভারের খেলা শেষে এখনো সম্ভাবনার অঙ্ক টস হওয়ার আগে যা ছিল তাই। অর্থাৎ, বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের জয়ের সম্ভাবনা সমান, কিংবা ম্যাচটা হতে পারে অমীমাংসিত। বাংলাদেশের জয় অথবা পাকিস্তানের জয় কিংবা ড্র, শেষ দিনে হতে পারে যেকোনো কিছুই।
তৃতীয় দিনের মতো সোমবার চতুর্থ দিনের খেলাতেও বাদ সাধল বৃষ্টি। দুপুর গড়াতেই আকাশ কালো করে নামল মুষলধারে বৃষ্টি। ঘণ্টা দুয়েকের বেশি সময় (চা বিরতির সময়সহ ১৬৫ মিনিট) খেলা বন্ধ থাকার পর ফের যখন বাংলাদেশের দুই ব্যাটার নাজমুল হোসেন শান্ত ও মুমিনুল হক মাঠে নামলেন, তখন আনুষ্ঠানিক বার্তায় জানানো হলো, ২ ঘণ্টা ৩০ মিনিট খেলা হবে, আলো থাকা সাপেক্ষে চলবে ৬টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত। কিন্তু বিকাল ৫টা ১৫ মিনিটেই আলোর স্বল্পতায় খেলা থামিয়ে দিলেন আম্পায়াররা। টেস্টে চার দিনের খেলায় নিয়ম অনুযায়ী ৩৬০ ওভারের খেলা হয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও স্লো ওভাররেট, বৃষ্টির বাগড়া মিলিয়ে মাঠে গড়িয়েছে ২৬৭ ওভার, অর্থাৎ ৯৩ ওভারের ঘাটতি, যা একদিনের খেলারও বেশি।
মধ্যাহ্নভোজের বিরতির সময়ই ঝেঁপে নামে বৃষ্টি। মুমিনুলের রান তখন ৮২ বলে ৩৭, শান্তর ৫৭ বলে ৩৪। একটা সেশন বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়ার পর দুজনে যখন ফের ব্যাটিংয়ে নামলেন, তখনো কৌশলে কোনো বদল নেই। মুমিনুল পঞ্চাশের নিচে স্ট্রাইকরেটে ব্যাট করে হাফসেঞ্চুরি তুলে নিয়েছেন, তার খানিক পরেই শাহিন শাহ আফ্রিদির বলে সময়মতো ব্যাট নামাতে না পেরে উইকেটের পেছনে ক্যাচও দিয়েছেন।
এ সময়টায় দ্রুত রান তোলার জন্য লিটন দাসকে পাঠানো যেতে পারত, কিন্তু ড্রেসিংরুমে যারা ছিলেন তারা মুশফিকুর রহিমকেই পাঠালেন। নোমান আলির বলে জোরালো আপিলে বেঁচে যাওয়ার পর মুশফিক তার বলেই বাউন্ডারি মেরে রানের খাতা খুলেছেন ঠিকই, তবে দিনশেষে রানটা ২৮ বলে অপরাজিত ১৬। অন্যপ্রান্তে শান্ত ১০৫ বলে ৫৮, তার স্ট্রাইকরেট মুমিনুলের চেয়ে ভালো, তবে সেটাও পঞ্চাশের ঘরে।
ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গের একটা বিখ্যাত উক্তি আছে, ‘কোনো ঝুঁকি না নেওয়াটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।’ বিখ্যাত ধনকুবের ও বিনিয়োগকারী ওয়ারেন বাফেটেরও কাছাকাছি উক্তিটা এরকম, ‘যখন আপনি জানেন না যে কী করছেন, তখনই ঝুঁকি তৈরি হয়।’ বাংলাদেশ দল খুব সম্ভবত এখনো দ্বিধাগ্রস্ত যে, এই ম্যাচটা তারা কি জেতার জন্য খেলবে নাকি ড্র করার জন্য। জিততে হলে পাকিস্তানের ১০টি উইকেট নিতেই হবে বোলারদের, ধরাছোঁয়ার ভেতর থাকা একটা লক্ষ্য আর সেই সময়টা কি দিতে পারবেন ব্যাটসম্যানরা?
মোহাম্মদ আশরাফুলের কথায় যা জানা গেল, ‘যদি কোনো বৃষ্টি না হয় ৯৮ ওভার খেলার সুযোগ থাকবে। অবশ্যই আমরা জেতার জন্য খেলছি এবং আমি মনে করি, আমাদের যে বোলিং আক্রমণ বিশেষ করে আমাদের স্পিন বোলিং এবং ফাস্ট বোলিং নিয়ে আমরা যদি ৭০-৭৫ ওভার বোলিং করতে পারি কালকে (মঙ্গলবার), তাহলে আমাদের জেতার সম্ভাবনা থাকবে।’
মুমিনুল আউট হওয়ার পর লিটনকে কেন আগে ব্যাটিংয়ে পাঠানো হলো না— এই প্রশ্নে আশরাফুল বলেছেন, ‘যদি আবহাওয়া ভালো থাকে তো আমরা আসলে যেভাবে টেস্ট ক্রিকেট খেলা উচিত সেভাবেই খেলব। আমি মনে করি, এই উইকেটে ভালো ব্যাটিং করতে হবে। এখন টেস্টে প্রথম ইনিংসে ৪০০-৫০০ রান করার পরেও কিন্তু তৃতীয় ইনিংসে ভালো ব্যাটিং না করলে ফল খারাপ হয়। আমার কাছে মনে হয়, আমাদের ব্যাটসম্যানরা ওইভাবেই খেলছেন। মুশফিকও কিন্তু বাজে বলের শাস্তি দিয়েছে, আমার তো মনে হয় যে সহজ একটা পরিকল্পনাই ছিল।’
টেস্টের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ চালু হওয়ার পর থেকে যখন টেস্টে জয়ের জন্য পয়েন্ট পদ্ধতির প্রবর্তন হয়, তারপর থেকেই জয়ের জন্য দলগুলো বাড়তি ঝুঁকি নেওয়া শুরু করে। পাকিস্তানের সালমান আলি আগাও বলে গেলেন, বড় পুরস্কারের জন্য বড় ঝুঁকিই নিতে হবে, ‘আমার মনে হয় বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ শুরু হওয়ার পর থেকে টেস্ট ক্রিকেটের ধরন বা ফরম্যাটে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এখন প্রতিটি দলই প্রতিটি ম্যাচ জেতার জন্য মরিয়া হয়ে মাঠে নামে। এমনকি আমরা পাকিস্তানেও এখন এমনভাবে উইকেট তৈরি করছি যাতে ম্যাচের একটি নিশ্চিত ফলাফল আসে।’
সালমান স্পষ্ট করেই জানিয়ে দিয়েছেন, শেষ দিনে ৬০ ওভারে ৩০০ রানের মতো লক্ষ্যও যদি সামনে আসে সেই রানটা তাড়া করবে পাকিস্তান, ‘আপনি যদি ১০ বা ১৫ বছর আগের দিকে তাকান, তবে দেখবেন তখন উইকেটগুলো ছিল অত্যন্ত ফ্লাট বা ব্যাটিং সহায়ক, যার ফলে অধিকাংশ ম্যাচই ড্র হতো। কিন্তু বর্তমান চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন; এখন আপনি খুব একটা ড্র দেখতে পাবেন না। অধিকাংশ ম্যাচেই এখন জয়-পরাজয় নির্ধারিত হচ্ছে। মূলত বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট টেবিলের সমীকরণের কারণেই দলগুলো এখন ফল পেতে সহায়ক উইকেট তৈরিতে বেশি মনোযোগী হয়েছে।’
বাংলাদেশ এ ম্যাচটা আদৌ জিততে চায় নাকি ঢাকায় ড্র করে সিলেটে সুযোগ নিতে চায়, সেটা স্পষ্ট হয়ে যাবে মঙ্গলবার সকালের ব্যাটিং দেখেই। যদি ২০ ওভারে ১০০ রান করতে ওভারপ্রতি ৫ রান করে তোলার মতো ব্যাটিংটা করেন শান্ত-মুশফিকরা, তাহলে বোঝা যাবে জিততে মরিয়া বাংলাদেশ। কিন্তু যদি চতুর্থ দিনের বিকালের মতো দেখেশুনেই সকালটা কাটিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা থাকে, তাহলে স্পষ্ট হয়ে যাবে, জয়ের জন্য ঝুঁকিটা নিচ্ছে না বাংলাদেশ। যেমনটা নেয়নি গত বছর শ্রীলঙ্কায়।







