নাজমুল একজন পারফেক্ট লিডার

সিলেট টেস্টের চতুর্থ দিন, মাঠে তখন চাপের মুহূর্ত। পাকিস্তানের ব্যাটাররা জুটি গড়ে ফেলেছে। সালমান-রিজওয়ানের এগিয়ে চলা থামানোই যাচ্ছে না। বাংলাদেশ বোলারদের শরীরী ভাষায়ও ক্লান্তির ছাপ। ঠিক সেই সময় এলো দ্বিতীয় নতুন বল। তাসকিন বা নাহিদ রানার হাতে নয়, নাজমুল হোসেন শান্ত বল তুলে দিলেন তাইজুলকে।
দ্বিতীয় নতুন বল হাতে প্রথম ওভারের পঞ্চম ডেলিভারি। তাইজুলের আর্মার না বুঝে বোল্ড সালমান। উইকেট পড়তেই পুরো দল ছুটে গেল বোলারের দিকে, শান্তই-বা বাকি থাকবেন কেন! স্লিপ থেকে উল্লাসের চিৎকার সবচেয়ে বেশি তার কণ্ঠেই শোনা গেল। গালভরা তৃপ্তির হাসি। যেন জানতেন, পরিকল্পনাটা কাজ করবেই।
বাংলাদেশ ক্রিকেটে অধিনায়ক এসেছেন অনেক। কেউ কৌশলী, কেউবা আবেগী। কিন্তু নাজমুল হোসেন এ সিরিজে নিজেকে আলাদা করেছেন সবকিছুর ভারসাম্য দিয়ে। তিনি অতিরিক্ত আবেগে ভেসে যাননি, আবার ছিলেন না নির্লিপ্তও। দলের প্রয়োজন বুঝে ঠিক ততটাই কঠোর, যতটা দরকার। মাঝেমধ্যে আবার শান্ত-সৌম্য চেহারায় কৌশল আঁটেন।
এ সিরিজে বাংলাদেশ শুধু পাকিস্তানকে হারায়নি, খুঁজে পেয়েছে একজন পূর্ণাঙ্গ নেতাকেও। যে শুধু টস করতে মাঠে নামেন না, বরং পুরো দলকে তুলে নেন নিজের কাঁধে। পাকিস্তান সিরিজে দায়িত্বের পরীক্ষায় শুধু পাস নয়, স্ট্যান্ড করেছেন শান্ত।
অবশ্যই উপভোগ করছি (নেতৃত্ব)। এই খেলোয়াড়দের সঙ্গে অনেক লম্বা সময় ধরে একসঙ্গে আছি, ঘরোয়া ক্রিকেট খেলি। তাই একজন আরেকজনের চিন্তাভাবনা সম্পর্কে জানি, কাকে কোন সময় ব্যবহার করলে দল উপকৃত হবে, তা জানি। -নাজমুল হোসেন শান্ত
‘ক্যাপ্টেন লিডিং ফ্রম দ্য ফ্রন্ট’ ক্রিকেটের বহুল প্রচলিত প্রবাদের একটি। বাংলাদেশ দলে এটি ঠিকঠাক হয়ে ওঠে না। নাজমুলের নেতৃত্বে এটি বোধহয় ঠিক হতে শুরু করেছে। এর জন্য যেটা প্রথমে দরকার নিজের পারফরম্যান্স। যেমন, এ সিরিজে চার ইনিংসে একটি সেঞ্চুরিসহ নাজমুলের অবদান ২৩২ রান। এমন হলো, দলের মধ্যে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করাও সহজ হয়ে যায়। নেতৃত্বটা তার কাছে উপভোগেরও, ‘অবশ্যই উপভোগ করছি (নেতৃত্ব)। এই খেলোয়াড়দের সঙ্গে অনেক লম্বা সময় ধরে একসঙ্গে আছি, ঘরোয়া ক্রিকেট খেলি। তাই একজন আরেকজনের চিন্তাভাবনা সম্পর্কে জানি, কাকে কোন সময় ব্যবহার করলে দল উপকৃত হবে, তা জানি। পাশাপাশি টিমের একটা প্ল্যান থাকে, কখন কে বল করবে। এগুলো আমার কাছে খুব পরিষ্কার, চেষ্টা করি সে অনুযায়ী বোলারদের ব্যবহার করতে। শেষ পর্যন্ত কাজটা করে বোলাররাই। আমি শুধু বলটা তাদের হাতে তুলে দিই। কৃতিত্বটা আসলে বোলারদের।’
নাজমুলের সিদ্ধান্ত নেওয়ার গুণ দেখে মুগ্ধ প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার, ‘লিটন, মিরাজও ভালো অধিনায়ক। শান্ত আলাদা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে। আজকে সিরিজ জেতার পর তার একটা সিদ্ধান্তের কথা অনেকেই ভুলে গেছেন। মিরপুর টেস্টে ওই মুহূর্তটায় ইনিংস ঘোষণা করাটা ছিল দুর্দান্ত সিদ্ধান্ত। ওই সময় এভাবে সাহস দেখানো, যা অনেকেই পারে না। তখন ডিক্লেয়ার না করলে পাকিস্তান জেতার জন্য খেলত না। ম্যাচটাও আমাদের দিকে আসত না। এদিক থেকে ও খুবই ভালো অধিনায়ক।’
প্রযুক্তির যুগে এখন স্টাম্পের পেছনের ফিল্ডারদের কথা শোনা যায় পরিষ্কার। আমরাও নাজমুলের কথা শুনেছি। কখন কাকে শাসাতে হবে, কাকে বোঝাতে হবে; সেই জ্ঞান তার ভালোই আছে। সতীর্থরা তার কথা মেনেও চলেন অক্ষরে অক্ষরে। পুরো দল যেন বুঝে গেছে— এই মানুষটা সামনে থাকলে লড়াই জেতা সম্ভব। তার নেতৃত্বে দলটা এক সুতোয় গাঁথা। কার কাছ থেকে অধিনায়ক কী চাইছেন, কার কী করণীয়, তা যেন সবার ভালোভাবে জানা আছে। এটিই একজন অধিনায়কের সবচেয়ে বড় সাফল্য। পাকিস্তানের বিপক্ষে এ সিরিজ হয়তো বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে নেবে। তবে এ জয়ের ভেতর থেকেও সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হতে পারে একটি উপলব্ধি— বাংলাদেশ হয়তো অবশেষে খুঁজে পেয়েছে এমন একজন অধিনায়ককে, যিনি শুধু ম্যাচ জেতাতে নন, একটি দলকে নেতৃত্ব দিতেও জানেন। নাজমুল হোসেন সত্যিই একজন পারফেক্ট লিডার।
ব্যাটিংয়ে ফিরেছে ভরসা
একসময় বাংলাদেশের টেস্ট ইনিংসের ত্রাণকর্তা ছিলেন হাবিবুল বাশার। তিনি আউট হলেই হুড়মুড়িয়ে শেষ হতো বাংলাদেশের ইনিংস। সেই দিন অতীত। এখন ৬ উইকেট হারানোর পরও সেঞ্চুরি করেন বাংলাদেশের ব্যাটাররা। তাতে লেখা হয় জয়ের কাব্য। সিলেটে ১১৬ রানে ৬ উইকেট হারানোর পরও লিটনের ১২৬ এবং দ্বিতীয় ইনিংসে ১১৫ রানে ৪ উইকেট হারানোর পরও মুশফিকের ১৩৭ তারই উদাহরণ।
ম্যাচ উইনিং বোলার
টেস্ট জিততে হলে ২০ উইকেট নেওয়ার যে প্রাচীন শর্ত, তা মেটানোর সামর্থ্য বেড়েছে বাংলাদেশের। পাকিস্তানের সঙ্গে এই সিরিজে সেরা পাঁচ বোলারের তিনজন বাংলাদেশের। তাইজুল সিলেটে শেষ ইনিংসে ৬ উইকেট নিয়েছেন। দুই ম্যাচে ১১ উইকেট পাওয়া নাহিদ রানা মিরপুর টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে নেন ৫ উইকেট। মেহেদী হাসান মিরাজ একই টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৯২ রানে ৫ উইকেটের সাফল্য দেখান। পাশাপাশি তাসকিন আহমেদের ভয়ংকর স্পেলও আছে।









