বলিউড থেকে বিবিএল হয়ে বাংলাদেশের বিপক্ষে ওয়াডিয়া

সংগৃহীত ছবি
অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটারদের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছানোর পথটা এরকম- অনূর্ধ্ব বয়সভিত্তিক প্রতিনিধিদলে খেলা, নজরে আসা, ভালো পারফর্ম করা এবং জাতীয় দলে জায়গা করে নেওয়া। 'ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশ'-এর খেলোয়াড় জার্সিস ওয়াডিয়ার পথটা সেরকম ছিল না।
ভারতে জন্ম নেওয়া ২৪ বছর বয়সী এই তরুণ গত মৌসুমে 'অ্যাডিলেড স্ট্রাইকার্স'-এর হয়ে হঠাৎ শিরোনামে চলে আসেন। নিজের ক্যারিয়ারের মাত্র দ্বিতীয় বিগ ব্যাশ লিগ (বিবিএল) ম্যাচে 'ব্রিসবেন হিট'-এর বিপক্ষে প্রথম তিন বলে তিনটি বিশাল ছক্কা হাঁকান তিনি। এই এক ইনিংসই তাকে তারকা বানিয়ে দেয়।
সেই মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ইনিংসের পরের দিনগুলোর কথা মনে করে ওয়াডিয়া বলেছেন, ‘চারপাশের মিডিয়া কাভারেজ এক লাফে অনেক বেড়ে গিয়েছিল। শুরুতেই সামলানো একটু কঠিন ছিল, তবে আমার মনে হয় ভারত থেকে আসা আর আমার পেছনের গল্পটাই সবার নজর কাড়ে।’
ওয়াডিয়ার পরিচয় শুধু তার বেড়ে ওঠার শহর মুম্বাইয়েই আটকে নেই। তার বাবা দিলজান বলিউড অভিনেতা। আর দাদা নেভিল মাইনর ক্রিকেটে সেঞ্চুরি করা সবচেয়ে বয়সী হিসেবে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে নাম লিখিয়েছেন। আর বলিউড অভিনেতার ছেলে ওয়াডিয়া এখন স্বপ্ন দেখছেন অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলার।
ডারউইনে বাংলাদেশের বিপক্ষে তিন দিনের প্রস্তুতি ম্যাচে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশে সুযোগও পেয়েছেন তিনি। এ নিয়ে তিনি যেমন উচ্ছ্বসিত, তেমনি সতর্কও, ‘মানুষ এখন আমাকে চিনবে, আমার দক্ষতা সম্পর্কে জানবে এবং আমাকে কীভাবে আটকানো যায় তার কৌশল খুঁজবে। এবার আমাকে আরও ভালো কিছু করে তাদের টেক্কা দিতে হবে। আমার প্রথম লক্ষ্য বিগ ব্যাশ ট্রফি জেতা। স্ট্রাইকার্সে আমার জন্য দুর্দান্ত সুযোগ রয়েছে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলা আর দিনশেষে আমার চূড়ান্ত লক্ষ্য অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় দলে খেলা। এজন্যই এত দূরে এসেছি।’
ওয়াডিয়ার ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা তৈরির পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান ছিল তার দাদারই। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়াকে তিনি বললেন, ‘দাদা আমাকে ক্রিকেটার হিসেবে দেখতে মুখিয়ে ছিলেন। আমি মুম্বাই থেকে ৪০০ কিলোমিটার দূরে দাদা-দাদির কাছে গিয়ে থাকতে শুরু করি। কারণ আমার বাবা-মা দুজনেই কাজ করতেন এবং আমি ছোট থাকায় আমাকে অনুশীলনে নিয়ে যাওয়ার সময় তাদের ছিল না। আমার শৈশব ও জুনিয়র ক্রিকেটের দিনগুলোতে তারাই আমাকে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছেন।’
দাদা-দাদির কাছে থাকার সময় ওয়াডিয়ার পরিচয় হয় হার্দিক পান্ডিয়া ও ক্রুনাল পান্ডিয়ার সঙ্গে। ভারতীয় দলের এই দুই তারকার সঙ্গে তার ভালো সুসম্পর্কও গড়ে ওঠে। এ নিয়ে বললেন, ‘হার্দিক ও ক্রুনাল যখন ছোট ছিল, তখন আমার পরিবার তাদের পড়াশোনায় সাহায্য করেছিল। সেখান থেকেই আমাদের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আমার বাবা, হার্দিক এবং ক্রুনাল একসঙ্গে ক্রিকেট খেলতেন। হার্দিক যখন আইপিএলে সুযোগ পেল, তখন কিছুদিনের জন্য সে আমার মা-বাবার সঙ্গেই থেকেছিল। কারণ মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সে খেললেও মুম্বাইয়ে তখন তার থাকার মতো নিজস্ব কোনো জায়গা ছিল না।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশে সুযোগ পাওয়ার পর আর বিগ ব্যাশে অভিষেকের পর হার্দিক ও ক্রুনাল দুজনেই আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছে। সবাই এমন সুযোগ পায় না, বিশেষ করে ভারতীয় ক্রিকেটারদের সঙ্গে এভাবে কথা বলার সুযোগ, তারা তো একদম রক স্টারের মতো।’
কোভিড মহামারী যখন বিশ্বকে স্থবির করে দেয়, তখন ওয়াডিয়ার জীবনের এক বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আসে। ওয়াডিয়া বললেন, ‘কোভিডের কারণে আমি ভারতের অনূর্ধ্ব-১৯ দলে খেলার সুযোগ হাতছাড়া করি, আর তারপর রাজ্য পর্যায়ের জুনিয়র ক্রিকেটও বাতিল হয়ে যায়। ভারতে এত বিশাল জনসংখ্যার মাঝে একবার অনূর্ধ্ব-১৯ থেকে ছিটকে গেলে নতুন করে মূল স্রোতে ফেরা কতটা যে কঠিন, তা কল্পনাও করা যায় না।’
২০১৯ সালে ক্লাব ক্রিকেট খেলতে ডারউইনে আসার অভিজ্ঞতা থেকে ওয়াডিয়া সিদ্ধান্ত নেন নিজের ব্যাগ গুছিয়ে প্রায় ১০,০০০ কিলোমিটার দূরে অ্যাডিলেডে চলে যাওয়ার, যাতে পেশাদার ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নপূরণ করা যায়, ‘আমি জানি না কেন, তবে মনে হয়েছিল অস্ট্রেলিয়াই আমার জন্য সঠিক জায়গা। আমার মা-বাবা ভেবেছিলেন এটা একটা অদ্ভুত সিদ্ধান্ত, কিন্তু দাদা আমার ওপর বিশ্বাস রেখেছিলেন এবং আমি নিজেই নিজের স্বপ্নের পেছনে ছুটতে চেয়েছিলাম।’
শুরুটা এই তরুণ মুম্বাইকরের জন্য একেবারেই সহজ ছিল না। বিশেষ করে ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট সংস্কৃতির বড় পার্থক্য তাকে মানিয়ে নিতে হয়েছিল। তিনি বললেন, ‘(ক্রিকেট সংস্কৃতি) ভারতে একদম আলাদা। ছোটবেলা থেকে আমাদের শেখানো হয় অনুশাসনে থাকতে। সফরের সময় হোটেলে থাকা, অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়া বা পাব-এ গিয়ে পান না করা ইত্যাদি। সেখানে কেউ এটা করলে এটা নিয়মভাঙা হিসেবে দেখা হয়। ক্রিকেট শেষ তো সোজা বাড়ি-এটাই ছিল রীতি।’
এরপর অস্ট্রেলিয়ার সংস্কৃতি নিয়ে বললেন, ‘অস্ট্রেলিয়াতে খেলা শেষে পুরো বিষয়টি থেকে মন সরিয়ে নেওয়ার দারুণ উপায় আছে। আমার প্রথম দু-একটি সফরে ম্যাচের বাইরে দলের সঙ্গে তেমন মিশতাম না, আর তারা আমাকে কারণ জিজ্ঞেস করেছিল। আমার কোচদের সঙ্গে সামাজিক মেলামেশা বাড়ানো নিয়ে অনেক কথা হয়েছে, কারণ আমি দলের সঙ্গে মিশতে আরও দক্ষ হতে চাই। মাঠের ক্রিকেটের দিক থেকে সব একই লেগেছে, কিন্তু মাঠের বাইরের সাংস্কৃতিক জীবনটা একটু ভিন্ন-এখানে সামাজিক হতে হয়, দলের সঙ্গে বাইরে যেতে হয়।’
দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ায় চার মৌসুম প্রিমিয়ার ক্রিকেট খেলার পর গত বছর 'টপ অ্যান্ড টি-টোয়েন্টি' টুর্নামেন্টে অ্যাডিলেড স্ট্রাইকার্স একাডেমির হয়ে নজর কাড়েন ওয়াডিয়া। এরপর গত বছরের ডিসেম্বরে তিনি স্ট্রাইকার্সের হয়ে মূল বিগ ব্যাশে অভিষেকের সুযোগ পান।
সুযোগের জন্য কিছুটা ধৈর্য ধরতে হলেও পরবর্তী ধাপে যাওয়ার জন্য তাকে ঠিক কী করতে হবে, তা নিয়ে ওয়াডিয়ার মনে সবসময় স্পষ্ট ধারণা ছিল। হোবার্ট হারিকেন্সের অলরাউন্ডার নিখিল চৌধুরীর তৈরি করে দেওয়া পথ তাকে বেশ সাহায্য করেছিল।
২০০১ সালে লিসা স্থালেকারের পর জুন মাসে নিখিল চৌধুরী প্রথম ভারতীয় বংশোদ্ভূত ক্রিকেটার হিসেবে অস্ট্রেলিয়া দলের হয়ে আত্মপ্রকাশ করেন। ওয়াডিয়া বললেন, ‘বিগ ব্যাশ ও পেশাদার ক্রিকেটে পৌঁছানোর পথ নিয়ে আমার স্পষ্ট ধারণা ছিল। আমার পথটা প্রচলিত কোনো পথ নয়, তবে অনূর্ধ্ব-১৭ বা অনূর্ধ্ব-১৯ সিস্টেম পার না করেও নিজের লক্ষ্যে কীভাবে পৌঁছাতে হবে, তা নিয়ে আমার ধারণা ছিল। নিখিল চৌধুরীর সঙ্গে আমি নিজেকে সবচেয়ে বেশি মেলাতে পারি। দুই বছর আগে যখন তাকে হারিকেন্সের হয়ে খেলতে দেখেছিলাম, তখন ভেবেছিলাম তাহলে তো সত্যি সত্যিই এটা সম্ভব! আর যখন সে অস্ট্রেলিয়া দলের হয়ে খেলল, তখন মনে হলো আমি যদি কঠোর পরিশ্রম করি এবং সঠিক কাজগুলো চালিয়ে যাই, তবে আমারও অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলার সুযোগ রয়েছে।’
এর একটা বড় পরীক্ষাই হবে বাংলাদেশের বিপক্ষে ৬ আগস্ট শুরু হতে যাওয়া প্রস্তুতি ম্যাচে।







