৭ দ্রষ্টা
প্রকৃতি চেনার ভিন্নধর্মী পদ্ধতি গড়ে তুলেছিলেন দ্বিজেন শর্মা

দ্বিজেন শর্মা (২৯ মে ১৯২৯ – ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭)
১৯২৯ সালের ২৯ মে, সিলেটের বড়লেখার শিমুলিয়া গ্রামের সবুজে ঘেরা এক পরিবেশে জন্ম নিয়েছিলেন দ্বিজেন শর্মা। পরে যিনি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের প্রকৃতি ও বিজ্ঞানচর্চার এক উজ্জ্বল নাম। শৈশব বেড়ে উঠেছেন গাছপালা, ফুল আর পাখির সান্নিধ্যে। কবিরাজ বাবার বাগান আর গ্রামীণ জীবনের সরল সৌন্দর্য তাকে খুব অল্প বয়সেই প্রকৃতির প্রেমে আবিষ্ট করে।
পরিবারের ইচ্ছা ছিল তিনি চিকিৎসক হবেন; কিন্তু দ্বিজেন শর্মা বেছে নেন উদ্ভিদবিজ্ঞানের পথ। কলকাতায় পড়াশোনা শেষে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভিদবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৫৮ সালে বরিশালের ব্রজমোহন কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। সেখানেই কর্মরত ছিলেন ১৯৬২ সাল পর্যন্ত। তারপর শিক্ষকতা শুরু করেন ঢাকার নটর ডেম কলেজে।
নটর ডেম কলেজে তার শিক্ষকতা শুধু পাঠদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি শিক্ষার্থীদের নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন প্রকৃতিকে চেনা ও ভালোবাসার মধ্য দিয়ে শেখার এক ভিন্নধর্মী পদ্ধতি।
১৯৭৪ সালে জীবনের নতুন এক অধ্যায় শুরু হয় মস্কোতে। সেখানে প্রগতি প্রকাশনীর অনুবাদক হিসেবে কাজ করেছেন জীবনের প্রায় দুই দশক। এই অনুবাদকের কাজ তাকে সমাজতন্ত্র, রাজনীতি ও সংস্কৃতি সম্পর্কে দেয় বাস্তব অভিজ্ঞতা ও বিশ্বদৃষ্টি।
বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানকে সহজ, প্রাঞ্জল ও আকর্ষণীয় করে তোলার ক্ষেত্রে তার অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
‘শ্যামলী নিসর্গ’-এর মতো গ্রন্থে বিজ্ঞানকে তিনি নিয়ে গেছেন অনুভবের জগতে। পাশাপাশি তিনি পরিবেশ সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তার লেখায় বারবার উঠে এসেছে মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থানের প্রয়োজনীয়তা। তরুণদের বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলার জন্য সহজ ভাষায় লেখালেখিকে তিনি একটি সামাজিক দায়িত্ব বলে মনে করতেন।
দ্বিজেন শর্মা তার অবদানের জন্য জীবদ্দশায় বহু সম্মাননা ও পুরস্কারে ভূষিত হন। উল্লেখযোগ্য পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে ড. কুদরাত-এ খুদা স্বর্ণপদক এবং বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার। এ ছাড়া তিনি এম নুরুল কাদের শিশু-সাহিত্য পুরস্কারসহ নানা স্বীকৃতি লাভ করেন এবং ২০০১ সালে চ্যানেল আই প্রবর্তিত প্রকৃতি সংরক্ষণ পদক অর্জন করেন। তিনি বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি প্রকাশিত ‘বাংলাপিডিয়া’র জীববিদ্যা বিভাগের অনুবাদক ও সম্পাদক (২০০১-০৩) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি বাংলা একাডেমির একজন সম্মানিত ফেলো ছিলেন।
২০১৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ভোররাত পৌনে ৪টার দিকে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। ৮৮ বছরের এই দীর্ঘ জীবন জুড়ে দ্বিজেন শর্মা রেখে গেছেন প্রকৃতি, জ্ঞান ও মানবিকতার এক স্থায়ী উত্তরাধিকার।




