রিপোর্টিং
ফ্রন্টলাইনের আমলনামা

ছবি: আগামীর সময়
‘আগামীর সময়’-এর রিপোর্টিং বিভাগে পা রাখলে মনে হতে পারে, আপনি কোনো দৈনিক পত্রিকার অফিসে নয়, বরং যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে ঢুকে পড়েছেন। সেজন্য পত্রিকাটি বাজারে আসার আগেই সম্পাদক মোস্তফা মামুন এ সেকশনের সদস্যদের নাম দিয়েছেন ‘দ্য ফ্রন্ট রানার্স’। চারদিকে ডেস্কে ডেস্কে পাহাড়সমান ফাইল, আধখাওয়া ঠান্ডা চায়ের কাপ আর কি-বোর্ডের অবিরাম খটখট শব্দ। এটাই আমাদের রিপোর্টিং বিভাগ— যেখানে ২৪ ঘণ্টাই সূর্য ডোবে না; কারণ এসির নিচে বসে কারোরই সময়ের জ্ঞান থাকে না। আজকের কাজ শেষ তো আগামীকাল কী রিপোর্ট দেবে, তা নিয়ে অনেক সময় নির্ঘুম রাতও কাটে আগামীর সময়ের রিপোর্টারদের।
এ বিভাগের প্রাণ আমাদের ক্রাইম অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন অ্যাফেয়ার্স টিম। এদের কাজই অন্যের হাঁড়ির খবর বের করা। টিমের প্রধান মাহবুব আলম লাবলু এরই মধ্যে তার আগমনী বার্তা জানান দিয়ে হইচই ফেলে দিয়েছেন। তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি একটা সাধারণ চায়ের দোকানের আড্ডা থেকেও ‘আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র’ খুঁজে বের করতে পারেন। এ টিমের সদস্য সাখাওয়াত কাওসার আসলে ফেলুদা বা শার্লক হোমসের মতো। সাধারণ একটা কথা থেকেও খবরের গন্ধ পান। শহিদুল ইসলাম রাজী ও সাইফুল ইসলামও কম যান না। দিন-রাত লেগে আছেন অপরাধ জগতের চমকপ্রদ সব তথ্য উন্মোচনের নেশায়।
খুবই শান্ত ও ভদ্র স্বভাবের মানুষ, কিন্তু মারদাঙ্গা রিপোর্টার হিসেবে এরই মধ্যে মিডিয়া ও বাণিজ্য জগতে স্থান করে নিয়েছেন বিজনেস এডিটর মিজান চৌধুরী। তবে খানিকটা গাফিলতিতেই আবার তার অগ্নিমূর্তি রূপ দেখেন টিমের সদস্যরা। এ টিমের নুরুজ্জামান তানিম, ইব্রাহিম হোসাইন (রেজোয়ান) ও ওবায়দুর রহমান সারাক্ষণ ছুটছেন শেয়ারবাজারের উত্থানপতনসহ বিভিন্ন কোম্পানির ভেতরের নানা খবরের সন্ধানে। ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নানা অনিয়ম এবং দুর্নীতির খবর স্বভাবসুলভ হাসিতেই বের করে নিয়ে আসেন জয়নাল আবেদীন খান। পরিকল্পনা কমিশনের খবরাখবর নিয়ে এরই মধ্যে ঝড় তুলেছেন অ্যাকটিভ রিপোর্টার হামিদ উজ জামান মামুন। গায়ে-গতর আর চলন-বলনে ডিফেন্সের বড় কোনো অফিসার মনে হলেও বিভিন্ন প্রকল্পের ভেতরের আরও খবর নিয়ে মাঠ-ঘাট চষে বেড়াচ্ছেন তিনি। বাজেটে রাজস্ব খাতের আগাম রিপোর্ট করে আলোচিত আল আমিন।
প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ের হাঁড়ির ভেতরের সব তথ্য জানাতে উন্মুখ হয়ে আছেন তারকা রিপোর্টার উবায়দুল্লাহ বাদল। জ্বালানি খাতের আদ্যোপান্ত তুলে ধরতে বেশ তৎপর অত্যন্ত স্বল্পভাষী নাজমুল লিখন। এই খাত নিয়ে তার ক্ষুরধার বিশ্লেষণধর্মী রিপোর্ট বেশ আলোচিত।
শিক্ষা খাতে আরেক আতঙ্কের নাম নূর মোহাম্মদ। দেশের বিচারাঙ্গনসহ আইন-আদালতের নানা বিশ্লেষণ নিয়ে পাঠকের কাছে হাজির করেন গোলাম রব্বানী বিকাশ। নিম্ন আদালতের রিপোর্ট নিয়ে ঘুম নেই মাসুদ রানার। রিপোর্টের সঙ্গে তার ভিডিওগ্রাফির প্রশংসায় পঞ্চমুখ সবাই।
এরপর আসা যাক আমাদের পলিটিক্যাল বিটের রিপোর্টারদের কথায়। রাজকুমার নন্দীর চালচলন অনেকটাই ছদ্মবেশী গোয়েন্দাদের মতো। ফোনের ওপাশে কার সঙ্গে কথা বলছেন, তা কেউ জানে না। অফিসই তার কাছে প্রিয় জায়গা। সেজন্য অফিসে আসার সময় থাকলেও তার যেন যাওয়ার কোনো তাড়া নেই। কাজ তার নেশা। বাকি সব অর্থহীন। খুব ছটফটে ও অস্থির আরেক রিপোর্টার আমজাদ হোসেন হৃদয়। রিপোর্টিংয়ে এক ঝাল মরিচ। রাজনীতির নানা অ্যাঙ্গেলে তার রিপোর্ট নিয়ে গভীর রাতেও অতিষ্ঠ থাকে অফিস ম্যানেজমেন্ট!
যোগাযোগের আইডিয়া মাস্টার সজিব ঘোষ। তার দেওয়া নানা ধরনের রিপোর্ট আইডিয়ায় যেন নাভিশ্বাস অবস্থা আমাদের। এরই মধ্যে আগামীর সময় অনলাইনে ঝড় তুলেছেন তিনি। সংস্কৃতি ও বিনোদনের আরেক হিরো রিপোর্টার পাভেল রহমান। মৃদুভাষী এ রিপোর্টার অফিসের চেয়ে সংস্কৃতি জগৎকেই বেশি প্রাধান্য দেন।
স্বাস্থ্যসেবার সব ধরনের খবর পাঠকের সামনে তুলে ধরতে বেশ তৎপর মুসলিমা সেতু। হামসহ নানা ইস্যুতে তার প্রতিবেদন বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তাকে খানিকটা স্বস্তি দিতে পাশে রয়েছেন কাউসার আহমেদ। স্বাস্থ্যের টুকিটাকি খবর নিয়ে বেশ দৌড়ঝাঁপ তার।
এ ছাড়া নির্বাচন কমিশন ও পরিবেশ রিপোর্ট নিয়ে সদা ব্যস্ত রিয়াজ হোসেন। কূটনৈতিক রিপোর্টিংয়ে নিজেকে জাহির করতে বেশ পরিশ্রম করে যাচ্ছেন নোমান মোশাররফ। সেবা খাত নিয়ে শুধু ভালো রিপোর্টই নয়, প্রতিনিয়ত বাসা থেকে হরেক রকম খাবার-দাবার এনে সহকর্মীদের প্রতি সেবার মানসিকতায় কখনোই ছেদ পড়েনি শম্পা বিশ্বাসের। আর মিম আক্তার শুধু খেতেই পছন্দ করেন না; নারী ও শিশুদের নিয়ে দারুণ সব রিপোর্টের অন্বেষণেও আগ্রহ তার।
তবে সন্ধ্যা নামলে রিপোর্টিং বিভাগে শুরু হয় ‘সাব-এডিটর বনাম রিপোর্টার’ যুদ্ধ। রিপোর্টাররা চান তাদের প্রতিটি শব্দ হিরোশিমা-নাগাসাকির বোমার মতো বিস্ফোরিত হোক আর সাব-এডিটররা কাঁচি হাতে বসে থাকেন— কখন কোন বাক্য কেটে ছোট করবেন। রিপোর্টার যদি লেখেন, ‘সূর্য যখন রক্তিম আভা ছড়িয়ে দিগন্তের ওপারে বিলীন হয়ে যাচ্ছিল...,’ সাব-এডিটর নির্দয়ভাবে সেটা কেটে লিখে দেন, ‘সন্ধ্যায়’। এই ‘সৃজনশীলতা বনাম বাস্তবতা’র লড়াই চলতেই থাকে। এই যে সারা দিনের ক্লান্তি, টেনশন আর ডেডলাইনের চাপ— সব ধুয়ে-মুছে যায় এক কাপ ধোঁয়া ওঠা লাল চায়ে।
পরদিন সকালে যখন ফ্রেশ কাগজের গন্ধ নিয়ে আগামীর সময় পাঠকদের হাতে পৌঁছায়, তখন সেই খবরের আড়ালে থাকা এই মানুষগুলোর গল্প কেউ জানে না। রিপোর্টিং বিভাগ আবারও সেজে ওঠে নতুন কোনো খবরের সন্ধানে, নতুন কোনো উত্তেজনায়।




