বাংলাদেশের নদনদীর স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্ন

নদীমাতৃক বাংলাদেশ নিয়ে আমাদের আহ্লাদের সীমা ছিল না। কিন্তু দখলে-দূষণে সেই নদীর এখন ত্রাহি অবস্থা। রাজনৈতিক সদিচ্ছা আর প্রশাসনের সততার সম্মিলন হলে আবার হয়তো প্রজাপতির মতো স্নিগ্ধ নদনদীর দেখা মিলবে। কৃষি থেকে পর্যটন– বহুক্ষেত্রে অবদান রেখে এই নদীই হয়ে উঠবে আমাদের অগ্রগতির অন্যতম বাহন
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বর সংখ্যায় ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ম্যাগাজিন ‘বাংলাদেশ- হোপ নারিশেস আ নিউ নেশন’ শিরোনামে প্রচ্ছদ প্রতিবেদন করেছিল। সেখানে দেখা যাচ্ছিল স্বচ্ছতোয়া ও আঁকাবাঁকা তুরাগ নদে সারি সারি ছোট-বড় নৌকা রঙবেরঙের পাল তুলে চলাচল করছে। বিশ্বখ্যাত ফটোগ্রাফার ডিক ডুর্যান্সের সেই আলোকচিত্রের ক্যাপশন ছিল, ‘প্রজাপতির মতো স্নিগ্ধ, বাংলাদেশের ঢাকার কাছে সর্পিলাকার তুরাগ নদে ধানের ক্ষেত পেছনে ফেলে যাতায়াত করছে নৌকা। শত শত জলজ মহাসড়ক এভাবে দক্ষিণ এশিয়ার নিম্নভূমির দেশটির কেন্দ্রীয় অঞ্চলকে জালের মতো বেঁধে রেখেছে’।
বলা বাহুল্য, গত প্রায় এক শতাব্দীতে বাংলাদেশের নদনদীর এই চিত্র সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। সবমিলিয়ে নদীগুলোর প্রতি অবিচার ও অবহেলা কতটা প্রকট, সেটা আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নদী বুড়িগঙ্গাকে দেখলেই বোঝা যায়। বুড়িগঙ্গার দখল, দূষণ, নিচু সেতুর কারণে বৃত্তাকার নৌপথ চালু হতে না পারার বিষয়গুলো নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু খোদ মৌলিক দুটি বিষয় নিয়ে বলি।
আমরা জানি, মানুষের মৌলিক অস্তিত্ব যেমন- নাম, বয়স, ঠিকানা, পারিবারিক সংযোগের ওপর নির্ভর করে, তেমনি নদীর মৌলিক বিষয় হচ্ছে নাম, উৎস, পতনস্থল ও দৈর্ঘ্য। কিন্তু ২০২৩-২৪ সালে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটি, দৃক ও রিভারাইন পিপলের পক্ষ থেকে একটি গবেষণা করতে গিয়ে দেখেছিলাম বুড়িগঙ্গার প্রকৃত দৈর্ঘ্য নিয়ে অনেক বিভ্রান্তি; পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন বলত, বুড়িগঙ্গা নদীর প্রকৃত দৈর্ঘ্য ২৯ কিলোমিটার, বিআইডব্লিউটিএর হিসাবে ৪৫ কিলোমিটার এবং পর্যটন করপোরেশনের হিসাবে ২৭ কিলোমিটার। কিন্তু আমরা ঐতিহাসিক মানচিত্র, সিএস জরিপ ম্যাপ, জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে নদীটির প্রকৃত প্রবাহপথ ও দৈর্ঘ্য নিরূপণ করে দেখিয়েছিলাম, কেরানীগঞ্জের হযরতপুরের ধলেশ্বরীর উৎপত্তিস্থল থেকে কোন্ডা ইউনিয়নের জাজিরা পর্যন্ত বুড়িগঙ্গার দৈর্ঘ্য ৪১ কিলোমিটার।
পূরণযোগ্য তিনটি প্রত্যাশা: ১. নদী দখল ও দূষণের সঙ্গে জড়িতরাই দখল উচ্ছেদ ও দূষণমুক্তির খরচ জোগাবে। ২. জলমহাল ও বালুমহাল ইজারা প্রথা বাতিল। ৩. যে এলাকায় নদী দখল-দূষণ হবে, সেখানকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জবাবদিহি করতে হবে
মজার ব্যাপার, ১৯১২ সালে প্রকাশিত যতীন্দ্রমোহন রায়ের লেখা ‘ঢাকার ইতিহাস’ গ্রন্থে রয়েছে বুড়িগঙ্গার দৈর্ঘ্য ২৬ মাইল। কিলোমিটারে কনভার্ট করলে ৪১ দশমিক ৮ কিলোমিটার! তার মানে, এক শতাব্দী আগের ব্যক্তি-উদ্যোগের গবেষণা ও গ্রন্থগুলোতেও যেখানে নদীর দৈর্ঘ্যের মতো মৌলিক বিষয়গুলো ঠিক থাকত; অথচ এত ‘আধুনিক’ প্রতিষ্ঠান, যন্ত্রপাতি, জনবল থাকা সত্ত্বেও এখন নদীর বিষয়ে অবহেলা প্রকট মূলত সদিচ্ছা বা সততার অভাবে। বুড়িগঙ্গা নিয়েই আরেকটি চিত্রে সেটি প্রমাণ হবে।
আলোচ্য গবেষণায় আমরা দেখতে পাই, বুড়িগঙ্গার দৈর্ঘ্য নিয়ে বিভ্রান্তির মূলে রয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠানের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর অসততা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি দলিলের ২০০৫ সালের সংস্করণে নদীটির দৈর্ঘ্য দেখানো হয় ৪৫ কিলোমিটার। একই দলিলের ২০১১ সালের সংস্করণে বলা হয়েছিল সেটি ২৯ কিলোমিটার। এই ১৬ কিলোমিটার নদী বাদ দেওয়া হয়েছিল দখল ও ভরাটকে জায়েজ করতে এবং ‘পুরো নদী’ উদ্ধারের কৃতিত্ব নিতে।
আমাদের গবেষণার প্রাথমিক ফল প্রকাশ হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঢাকার চারপাশের নদী পুনরুদ্ধারে যে কমিটি করা হয়, সেখানে আমাকেও রাখা হয়েছিল এবং আমি প্রায় প্রতি সভায় বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিতে থাকি। সৌভাগ্যবশত, পরে বুড়িগঙ্গার ওই ১৬ কিলোমিটার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নথিপত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
কথা হচ্ছে, রাজধানীর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত বুড়িগঙ্গার ভাগ্যেই যদি এমন দুঃস্বপ্ন ঘটতে পারে, দেশের তালিকাভুক্ত ১ হাজার ৪১৫টি নদীর কতটির ভাগ্যে এমন কী ঘটেছে, আমরা কীভাবে জানব।
বিশ্বের অন্যান্য অংশের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের নদনদীর মতো এত উপযোগিতা আর কোথাও নেই। যেমন ইউরোপের কোনো কোনো নদী সারা বছর নৌ-চলাচলের উপযোগী থাকে না শীতকালীন বরফের কারণে। আবার আমেরিকার কোনো কোনো নদী জনবিরল অনুর্বর ভূমি কিংবা জঙ্গলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় সেখানে কৃষি সেচ সম্ভব হয় না। আর বিশ্বের খুব কম নদীই বাংলাদেশের নদীগুলোর মতো ‘অ্যাকটিভ ডেল্টা’ বা সক্রিয় ব-দ্বীপ গঠন করে চলেছে। ব-দ্বীপ ব্রাজিল কিংবা নেদারল্যান্ডসেও রয়েছে; কিন্তু সেগুলো বঙ্গীয় ব-দ্বীপের মতো এখনো দক্ষিণে ভূমি গঠন করে চলছে না।
তবে জীবন ও জীবিকাদায়ী উপযোগিতার জন্য নদনদীকে দুইভাবে মুক্ত থাকতে হয়: প্রথমত, মরফোলজিক্যালি বা প্রবাহ কাঠামোগত দিক থেকে বা দৈহিকভাবে; দ্বিতীয়ত, হাইড্রোলজিক্যালি বা জলকাঠামোর দিক থেকে বা জৈবিকভাবে।
দৈহিকভাবে মুক্ত নদী শুধু একটি উপযোগিতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ; সেটা হচ্ছে নৌ-চলাচল। বাকি পাঁচটি উপযোগিতার জন্য নদীকে জৈবিকভাবেও মুক্ত থাকতে হয়; সেগুলো হচ্ছে- সুপেয় এবং গৃহস্থালি ও শিল্পক্ষেত্রের পানি, কৃষি সেচের পানি, মৎস্য সম্পদের আধার, আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এবং ভূমি গঠন ও প্রতিবেশগত ভারসাম্যের দিক থেকে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উপযোগহীনতা বা সংকটের সংখ্যাও ছয়টি- অদূরদর্শী স্থাপনা, ভারসাম্যহীন প্রবাহ ও ভাঙন, ভরাট ও দখল, বালু উত্তোলন, দূষণ, আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা। এই ছয়টি সংকট আবার দুষ্টচক্রের মতো; একটির সঙ্গে আরেকটি সম্পর্কিত।
যেমন- প্রথমত, কোনো নদীতে যদি উজানে বাঁধ, ড্যাম, ব্যারাজ, স্লুইসগেট, অপ্রশস্ত সেতুর মতো অদূরদর্শী স্থাপনা নির্মিত হয় বা পানি প্রত্যাহার করা হয় বা বন উজাড়করণ ও খনন কাজ চলে, তাহলে ভাটির দিকে প্রবাহ ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে।
দ্বিতীয়ত, প্রবাহের ভারসাম্যহীনতার কারণে বা শুষ্ক ও বর্ষা মৌসুমে প্রবাহের তারতম্যের কারণে ভাঙন দেখা দিতে থাকে। ভাঙন দেখা দিলে নদী প্রশস্ত ও অগভীর হতে থাকে।
তৃতীয়ত, প্রশস্ত ও অগভীর নদী ভরাট ও দখলের শিকার হতে থাকে; কারণ, গভীর ও স্রোতস্বিনী নদী কখনো ভরাট বা দখলের শিকার হয় না।
চতুর্থত, ভরাট ও দখল প্রক্রিয়ায় প্রয়োজন হয় বালু উত্তোলনের। ভরাট নদী ‘নাব্য’ করতে গিয়ে বা ভরাট নদীতে স্থাপনা তৈরি করতে গিয়েও বালু উত্তোলনের প্রয়োজন হয়। এক নদীর বালু নিয়ে অন্য নদী ভরাটের নজিরও রয়েছে। এর ফলে নদীর কাঠামো, জীববৈচিত্র্য, প্রবাহ সবই নষ্ট হতে থাকে।
পঞ্চমত, দখল ও ভরাট নদীতে যে আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প স্থাপনা গড়ে ওঠে, সেখান থেকে শুরু হয় দূষণ।
ষষ্ঠত, এই দুষ্টচক্রের মূলে রয়েছে নদীর সঙ্গে আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা। কখনো এই বিচ্ছিন্নতার কারণে নদীতে অদূরদর্শী স্থাপনা থেকে দূষণ পর্যন্ত ঘটে; কখনো এগুলোর মধ্য দিয়েই বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হয়।
বর্তমানে বাংলাদেশের অধিকাংশ নদীই আলোচ্য দুষ্টচক্রের শিকার। প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের নদনদীর বর্তমান দুষ্টচক্র বা দুঃস্বপ্ন কাটিয়ে শতাব্দী আগের স্বপ্ন ফিরিয়ে আনতে হলে কী করতে হবে?
কিছু বহুল উচ্চারিত কথা তো বলাই যায়। এর মধ্যে ‘পূরণযোগ্য’ অন্তত তিনটি প্রত্যাশা রয়েছে; সেগুলো সরকার চাইলে স্বল্প সময়ের মধ্যে পূরণ করতে পারে।
এক. ‘পল্যুটারস পে’ নীতি বাস্তবায়ন। নদী দখল ও দূষণের সঙ্গে জড়িতরাই দখল উচ্ছেদ ও দূষণমুক্তির খরচ জোগাবে। দখল-দূষণ ‘ব্যয়বহুল’ করে তুলতে পারলে আর কেউ সে পথে যাবে না।
দুই. জলমহাল ও বালুমহাল ইজারা প্রথা বাতিল। এ দুই খাত থেকে বছরে ৫০০ কোটি টাকাও আসে না; ৭-৮ লাখ কোটি টাকার জাতীয় বাজেটের তুলনায় অতি সামান্য। কিন্তু এই এক আদেশে লাখ লাখ জেলে জীবিকা ও অধিকার ফিরে পাবে এবং বালুমহাল নিয়ে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি এবং পরিবেশ ধ্বংস বন্ধ হবে।
তিন. যে এলাকায় নদী দখল-দূষণ হবে, সেখানকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদেরই জবাবদিহি করতে হবে; পদোন্নতি, বেতন বৃদ্ধি আটকে থাকবে। তাহলে নদীর রক্ষক ও ভক্ষকদের মধ্যে যোগসাজশ নিয়ন্ত্রণে আসবে।
চার. গঙ্গাসহ ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনায় অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনা বা নদীর পানি বণ্টনের বদলে সুফল ভাগাভাগি মডেলের দিকে যেতে হবে। মেকংয়ের ক্ষেত্রে কম্বোডিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম যেভাবে অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করেছে, সেটা গঙ্গার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ, ভারত ও নেপাল মিলে করতে হবে। তবে অববাহিকাভিত্তিক ব্যবস্থাপনার পূর্বশর্ত অববাহিকাভিত্তিক অধিকার। এজন্য আগে দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় অববাহিকাভিত্তিক ও স্থায়ী চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক রক্ষাকবচ থাকতে হবে। এজন্য গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও বরাক বা মেঘনা অববাহিকাভিত্তিক সর্বোচ্চ তিনটি চুক্তি হতে হবে। গঙ্গা চুক্তি নবায়নের পর সিন্ধুর মতো এর আওতায় গঙ্গার সব উপনদীকেও আনতে হবে। বাংলাদেশ-ভারতে প্রবাহিত সোয়া শতাধিক নদীর একেকটি ধরে গত সাড়ে পাঁচ দশকের গতিতে চুক্তি করতে গেলে ন্যূনতম এক হাজার বছর লেগে যাবে।
লেখক: নদী গবেষক; মহাসচিব, রিভারাইন পিপল





