মাল্টিপোলার বিশ্বব্যবস্থা থামানোর কোনো উপায় নেই

আগে কখনো বহুকেন্দ্রিক বিশ্বের দেখা না মিললেও এবার যেন সে সম্ভাবনা বেশ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। অচিরেই হয়তো আমরা এই মাল্টিপোলার বিশ্বের জটিল কাঠামোর মুখোমুখি হব। কিন্তু তাকে মোকাবিলা করার জন্য যে অভিজ্ঞতা, যে কূটনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দক্ষতা দরকার, তা কি আমাদের আছে?
পৃথিবী পরিবর্তনশীল, সবসময় পৃথিবী পরিবর্তনশীল ছিল। একসময় পৃথিবীতে বড় আকারে এককেন্দ্রিক কাঠামো তৈরি হয়েছিল, সেটি ছিল গ্রেট ব্রিটেন, যেটাকে প্যাক্স ব্রিটানিকা বলা হতো। তারপর দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের প্রভাবে তার পতন ঘটল এবং একটা বাইপোলার পৃথিবী তৈরি হলো, যার একপাশে যুক্তরাষ্ট্র ও তার বন্ধুরা। মোটাদাগে পশ্চিমা দেশের কাঠামো একদিকে; আরেকদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার মিত্ররা। সেই বাইপোলার বিশ্বটা ভেঙে গেল যখন সোভিয়েত ইউনিয়নে গর্বাচেভ ক্ষমতায় এলো।
সে সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন সামরিক শক্তিতে হয়তো বাড়ছিল; কিন্তু অর্থনৈতিক শক্তির দিক দিয়ে ছিল একেবারেই দুর্বল। বিশ্ব দেখল, গর্বাচেভ পেরস্ত্রোইকা এবং গ্লাসনস্তের প্রস্তাবনার ভেতর দিয়ে কাঠামো পরিবর্তন করে সোভিয়েত ইউনিয়নকে ভেঙে ফেলল। তারপর রাশিয়া মনে করল, পূর্ব ইউরোপ ছেড়ে দেওয়াই তার জন্য ভালো। তখন থেকে ইউনিপোলার পৃথিবীর আলোচনা আসতে শুরু করল। সেটার নাম দেওয়া হলো প্যাক্স আমেরিকানা। কিন্তু এই শতাব্দীর প্রথম দিকে এ কাঠামো বিভিন্ন সমস্যা তৈরি করছিল এবং ২০০৮ সালে যখন অর্থনৈতিক মন্দায় ইকোনমিক ক্রাশ এলো— তখনই বোঝা গেল, আমেরিকা এককভাবে যে আধিপত্য তৈরি করছিল, সেটা ধরে রাখা কঠিন। এর বড় কারণ চীন তো অবশ্যই, ভারত, ব্রাজিল, তুরস্কসহ এমন একাধিক দেশ তাদের অর্থনৈতিক সামর্থ্য বাড়িয়ে ফেলছিল। তখন থেকে বোঝা যাচ্ছিল পৃথিবী মাল্টিপোলারের দিকে যাচ্ছে।
মাল্টিপোলার ওয়ার্ল্ড মোকাবিলা করতে হলে জ্ঞানগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনের সংস্কৃতি না বদলালে, জাতীয় ঐকমত্য তৈরি না হলে মাল্টিপোলার বিশ্বকে মোকাবিলা করা খুব ডিফিকাল্ট
এখানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাসটা বিশ্বের ওই ক্ষমতা কাঠামোতে বিশেষভাবে লক্ষণীয়। কারণ, মনে রাখতে হবে একেবারে স্নায়ুযুদ্ধের তুঙ্গস্পর্শীকালে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র বড় আকারেই বিরোধিতা করেছিল এবং পাকিস্তানের পক্ষে ছিল। অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে ছিল। তখনকার বাইপোলার পৃথিবীতে দুই পরাশক্তির দুই পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় বাংলাদেশের স্বাধীন হওয়ার প্রশ্নটি জটিল হয়ে ওঠে। আমরা ওই স্নায়ুযুদ্ধের মধ্যে জন্ম নিলাম। ফলে বাংলাদেশের চিন্তাভাবনার মধ্যে সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখার বিষয়টি চলে আসে, যা পরে বাংলাদেশের বড় দুটি দল আওয়ামী লীগ (বর্তমানে নিষিদ্ধ) এবং বিএনপি মোটাদাগে মেনে চলতে চেয়েছে। স্নায়ুযুদ্ধের পৃথিবীতে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল বলেই হয়তো একটা সচেতনতা তৈরি হয়েছিল।
এ ছাড়া, এখন বিশ্ব জুড়ে সবার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক রাখার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে । যত বেশি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, তত বেশি অর্থনৈতিক লাভ হবে— এমন একটা ধারণা চলছে। সেই হিসেবেও আমরা ২০৫০ সাল নাগাদ মাল্টিপোলার বিশ্বব্যবস্থাই দেখতে পাব বলে মনে হয়। এটা থামানোর কোনো উপায় নেই; এর বড় কারণ হলো, সব দেশের জনগণের মধ্যেই বিশাল আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে এবং কোনো দেশের জনগণই আগের কলোনিয়াল সেটআপে যেতে রাজি হবে না।
তবে মাল্টিপোলারের মতো এ ধরনের পপুলার বিশ্বব্যবস্থা পৃথিবীতে কখনোই হয়নি। অঞ্চল হিসেবে হয়তো ছিল। ইউরোপ, আফ্রিকা এমনকি দক্ষিণ এশিয়ায়ও মাল্টিপোলার ছিল। কিন্তু পুরো পৃথিবী জুড়ে মাল্টিপোলার কখনোই হয়নি। ইউনিপোলার ছিল। যেমন ব্রিটানিকা বা আরও পরে প্যাক্স আমেরিকানা আর না হলে স্নায়ুযুদ্ধের বিশ্ব, সেটা আবার বাইপোলার বলে একটা ক্ষমতার ভারসাম্য রাখত। এই প্রথমবার পৃথিবী জুড়েই একটা মাল্টিপোলার ব্যবস্থার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। তবে এর মধ্যে সংশয়, ভয় সবকিছুই আছে। কারণ, এটার জন্য একটা প্রস্তুতি প্রয়োজন, আর সে প্রস্তুতির অভাব এখনো রয়ে গেছে।
মনে রাখতে হবে, এই মাল্টিপোলার কিন্তু রিজিড মাল্টিপোলার হবে না। বাইপোলার বা ইউনিপোলার কিন্তু খুব রিজিড ছিল। এই মাল্টিপোলার হবে ফ্লুইড। কারণ, বিশ্বায়নের ফলে একটা পোলারের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে সবকিছু আমদানি-রপ্তানি করা সম্ভব হবে না ; একাধিক পোলারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হবে এবং এতে করে একটা জটিল বা কমপ্লেক্স স্ট্রাকচার তৈরি হচ্ছে।
এই মাল্টিপোলার কাঠামোর সঙ্গে মোকাবিলা করতে, যে পেশাদারত্ব এবং যে এফিশিয়েন্সি বা যে জ্ঞান দরকার, সেটা এখনো সব দেশের হয়ে ওঠেনি। কম-বেশি হয় ইউনিপোলার না হয় বাইপোলার— এই দুটো কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলার মোটামুটি একটা অভিজ্ঞতা আছে সবার। তাই মাল্টিপোলারের সঙ্গে সম্পর্ক করাটা হয়ে ওঠেনি বা দরকার হয়নি। এ কারণেই সেখানে বড় আকারে জ্ঞানের ঘাটতি আছে। ভাষাগত দক্ষতার পাশাপশি এখানে কূটনৈতিক ও কালচারাল দক্ষতা অর্জনের বিষয় আছে। কূটনৈতিক কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে হবে। সব দেশের একধরনের কূটনীতি কাঠামো নেই, বিভিন্ন ধরনের কূটনৈতিক কাঠামো, ভিন্ন ভিন্ন পোলারাইজেশনে কাজ করত। ফলে মাল্টিপোলার বিশ্ব কাঠামোতে সব কূটনীতির সঙ্গে পরিচিত হওয়া দরকার। আমাদেরও এখানে শিক্ষিত হয়ে ওঠার বিষয় রয়েছে।
বাংলাদেশের যদি ২০৫০ নাগাদ এই মাল্টিপোলার ওয়ার্ল্ড মোকাবিলা করতে হয়, তাহলে আমাদের জ্ঞানগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এ ছাড়া আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনের সংস্কৃতি যদি না বদলায়, জাতীয় ঐকমত্য যদি না থাকে— তাহলে মাল্টিপোলার বিশ্বকে মোকাবিলা করা খুব ডিফিকাল্ট। এখানে নতুন ধরনের রাজনীতির প্রয়োজন।
মাল্টিপোলার পৃথিবীতে যদি আমি বড় আকারে লাভ করতে চাই তাহলে বলতে হচ্ছে, আমাদের এখনো ঘাটতি রয়ে গেছে। আমরা এখনো ওইভাবে ওয়ার্ল্ড ক্লাস এডুকেশন সিস্টেম করতে পারিনি এবং মনে রাখতে হবে, এটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করলে হবে না, একেবারে প্রাইমারি স্কুল থেকে শুরু করতে হবে। প্রাইমারি স্কুলকে প্রথমে গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডে আনা দরকার। তারপরে কলেজ, তারও পরে ইউনিভার্সিটির কথা আসবে। আমাদের মতো দেশ, যারা আসলে সেই অর্থে আঞ্চলিক পরাশক্তিও নয়, মানে আমাদের পাশে ভারত আছে, পাকিস্তান আছে; সেক্ষেত্রে পশ্চিমা বা গ্লোবাল চিন্তা সরিয়ে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিকে মোকাবিলা করে স্ট্র্যাটেজি তৈরি করতে গেলেও আমাদের এডুকেশন সিস্টেম ঠিক করার বিষয় আছে।
আমাদের জ্ঞানের কাঠামো বাড়ানোর ক্ষেত্রে বেশকিছু উদাহরণ আমাদের সামনে আছে। এর একটা বড় এক্সাম্পল ইরান প্রদর্শন করেছে। কারণ, ইরান ২০ বা ২১ বছর আগেই তাদের চিন্তা দিয়ে স্ট্র্যাটেজি পেপার তৈরি করেছে। আমেরিকা এবং ইসরায়েল তাদের আক্রমণ করে বসলে কীভাবে তা মোকাবিলা করবে, ইরান তাদের স্ট্র্যাটেজি পেপার তৈরির সময়ই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল, বিদেশ থেকে টেকনোলজি বা এয়ারক্রাফট, ড্রোন কিনে লাভ নেই। কারণ তাহলে ওইসব দেশের ওপর ডিপেন্ডেন্সি চলে আসবে। ইরাকের সঙ্গে তারা আট বছর যুদ্ধ করেছে। সে যুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলো ইরাককে সহায়তা করেছিল। ওই অভিজ্ঞতা ইরানের কাজে দিয়েছে। ফলে তারা সিদ্ধান্ত নিল, আমাদের মিসাইল এবং ড্রোন টেকনোলজিতে সক্ষমতা লাগবে।
তখন তারা ভেবেচিন্তে নারী এডুকেশনে ইনভেস্ট করার কথা ভাবল। নারী সায়েন্টিস্ট, ইঞ্জিনিয়ার তৈরির পথে এগিয়ে গেল তারা। যার জন্য বর্তমানে যখন আমরা কথা বলছি পৃথিবীর সবচেয়ে পার ক্যাপিটা ইঞ্জিনিয়ার তৈরির ক্ষেত্রে নাম্বার ওয়ান হলো ইরান। পার ক্যাপিটা জনসংখ্যার মধ্যে অ্যাবসোলিউট নাম্বারে তারা খুব সম্ভব চতুর্থ; কিন্তু তাদের পপুলেশন যেহেতু ৯৩ মিলিয়ন— সে জায়গায় চীন আর ভারত বা যুক্তরাষ্ট্র হয়তো অ্যাবসোলিউট নাম্বারে বেশি; কিন্তু পার ক্যাপিটা হিসাবে নাম্বার ওয়ান ইরান। একইভাবেই নারী সায়েন্টিস্ট পৃথিবীতে তারা এক নম্বর।
একইভাবে সিঙ্গাপুরকেও আনা যায়। তারা অবশ্য সামরিক দিকে ফোকাস করেনি। তার দরকারও ছিল না। কিন্তু এখানে মোদ্দাকথা হচ্ছে, কিছু কিছু দেশ আছে যারা আগে থেকেই চিন্তাভাবনা করে তাদের কাঠামোগত পরিবর্তন করেছে। এজন্য তারা ফোকাসটা করেছে এডুকেশন সিস্টেমে এবং সেই সুফলটাকে স্ট্র্যাটেজিক্যালি কাজে লাগিয়েছে। বাংলাদেশকেও ওইভাবে চিন্তা করতে হবে, আমি একটা জ্ঞানগত সক্ষমতা তৈরি করব আর সে শক্তিটা কীভাবে অর্জন করব এবং ব্যবহার করব। এখন বাংলাদেশের জটিলতাটা আরেকটু বেশি। কারণ, বাংলাদেশের আশপাশে ভারত ও চীনের মতো দুটো বড় দেশ আছে। আবার ওদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটা বড় সম্পর্ক আছে। বিশেষ করে আমাদের রপ্তানি আমরা ওখানেই করে থাকি।
আমাদের অনেকে আছেন, যারা পলিসিমেকার তাদের এক পা আবার পশ্চিমা দেশে। এ রকম একটা কাঠামো নিয়ে বাংলাদেশের বড় হওয়ার সুযোগ আছে বলে আমার মনে হয় না। এসব জায়গায় নতুনভাবে চিন্তা করা দরকার, কীভাবে তাদের দুই পা বাংলাদেশের মধ্যেই থাকবে। আমার জিওপলিটিক্যাল যে কাঠামো আছে, সেটার দিকেও তাকানো দরকার। আমি যদি পাসপোর্টের কথা বলি, দুটো বা তিনটা পাসপোর্ট রাখার যে বিধান, সেটা পরিবর্তন করব কি না, ভাবা দরকার।
কাজেই, ২০৫০ সালের দিকে যদি আমরা তাকাতে চাই, সেক্ষেত্রে এখনই তার প্রস্তুতি শুরু করার শেষ সময়। এখানে করণীয় অনেক কিছু আছে। তবে আমি মনে করি, বাংলাদেশ পুরনো সভ্যতারই একটা কাঠামো। এখানকার ইতিহাস খুব দৃঢ়, সহজেই হাজার বছর পেছনে চলে যাওয়া যায়। তো কীভাবে ইতিহাসের সেই জমিনেই দুই পা নিয়ে বাংলাদেশ দাঁড়াতে পারবে, সে চিন্তাভাবনা যদি শুরু করা যায়, তাহলে বলা যায় আমরা মাল্টিপোলার বিশ্বব্যবস্থায় নিজেদের জায়গা করে নিতে পারব।
লেখক: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক





