লিকুইড টেক্সটের দিনে ‘অ্যানালগ মুভমেন্ট’

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কিন্ডল, বুক রিডার ইত্যাদি চালু হলেও এখনো কাগজের আবেদন ফুরিয়ে যায়নি। কিন্তু বছর পঁচিশ পরে অবস্থা কী দাঁড়াবে তা বলা মুশিকিল। প্রযুক্তি যে গতিতে এগোচ্ছে তাতে অচিরেই ইমার্সিভ রিডিং ব্যাপক জনপ্রিয় হতে পারে। গ্রন্থ রচনা এবং পাঠের ক্ষেত্রে যুক্ত হতে পারে অনেক অভাবনীয় উপায়
‘হুট করে বৃষ্টি আসাতে দুজনকে ছাতিমগাছটার নিচে দাঁড়াতে হলো। তবু কি বাঁচা যায়, বৃন্ত থেকে ফুলের পাপড়ির মতো বেরোনো পাতাগুলো থেকে বৃষ্টির পানি চুইয়ে চুইয়ে পড়তে লাগল। ইলিয়ানার নাকের ওপরে কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি স্থির হয়ে থাকল, যেন বিন্দু বিন্দু ঘাম। সেদিকে লক্ষ করতেই নিঃশ্বাসে মাটি আর শুকনো পাতা ভেজা সোঁদা গন্ধ। আঙুল দিয়ে তার কপাল থেকে ঝুলে পড়া এক গোছা ভেজা চুল সরালাম। চোখের সামনের বাধা সরলে সে আমার দিকে বিব্রত চোখে তাকাল। এত কাছে থেকে দেখা আমার চোখের আকুতি কি ওর সারা জীবন মনে থাকবে না?’
পড়তে পড়তে পাঠক এক বৃষ্টিভেজা দুপুরে জঙ্গলমতো একটা জায়গায় আটকে গেল। বিজলির শব্দে তার মাথার ভেতরে ঝোড়ো হাওয়ার শোঁ শোঁ আলোড়ন আর শীতল জলীয় বাষ্পের ঝাপটা। ঝাপটায় মাথাটা সামান্য নড়ে উঠে প্রাচীন একটা গানও মনে পড়ল, ... দূরে কোথাও দু-এক পশলা বৃষ্টি হচ্ছে... পরমুহূর্তে নাকে লাগল সোঁদা গন্ধ। বৃষ্টির ঝাপটায় মাথা কয়েকবার হেলে যাওয়াতে হেডসেটটা নড়ে গেলে চোখে লাগল জানালার বাইরের কড়া রোদ। কিন্তু তাতে কী, ২০৬৫ সালের পর থেকে বলতে গেলে সে এভাবেই গল্প-উপন্যাস পড়ে। চোখের সামনে কাচের বাক্সের মতো একটা হেডসেট লাগিয়ে নিলেই হলো। মাথার পেছনের দিকে বেল্ট। গায়ে লাগে একটা হ্যাপটিক স্যুট। তারপর ঢুকে যেতে হয় এক অদ্ভুত জগতে। ছোট একটা গল্প-কবিতা-গান মানে কিছুক্ষণের জন্য অন্য এক জগতে প্রবেশ। সে জগতে রোদ উঠছে, বৃষ্টি-বাদল-বাতাস হচ্ছে, কখনো জলবায়ু পরিবর্তনের চিহ্নস্বরূপ তীব্র দাবদাহ গা ছুঁয়ে চলে যাচ্ছে। ইমার্সিভ রিডিংয়ে রচনা থেকে সরাসরি মস্তিষ্কে সংকেত পাঠানোর ফলে কল্পকাহিনি পড়া এখন দারুণ আনন্দের ব্যাপার।
তবে কোনো পাঠক ভাবতে পারে যে, যখন হেডসেটের মাধ্যমে সংকেত গ্রহণ না করে একজন পাঠক পড়ত, তখন কি সে বৃষ্টির শব্দ, রোদের তাপ, বাতাসের রিনরিনে সুর, ফুলের সুগন্ধ কল্পকাহিনি পড়ার সাথে সাথে কল্পনা করত না? তখন কি মানুষের কল্পনাশক্তি অনেক বেশি ছিল নাকি মানুষ এখন কল্পনাশক্তি কাজেই লাগাতে চায় না মোটে? এমনও হতে পারে যে কল্পনাকে নানান ব্যঞ্জনা দেওয়ার জন্য ধীরে ধীরে এই ব্যবস্থা হয়েছে।
যাই হোক, ইদানীং অতি উন্নত আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স ও একজন মানুষের বুদ্ধিমত্তা মিলে একেকটি সাহিত্য সৃষ্টি হচ্ছে। মানুষের আবেগ ও চেতনা যদি পৃথিবীর সবচেয়ে নিখুঁত তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে মেলানো যায়, তবে কত কী-ইনা সৃষ্টি হতে পারে। তাই তো একের পর এক গল্প-উপন্যাস প্রবন্ধ দিনে দিনে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে। তাতে বস্তুত মানুষের জীবনের ছাপই বেশি। কারণ মূলত প্রত্যেকেই নিজের জীবনের ঘটনাটা লিখে ফেলছে। আর কে না জানে যে প্রত্যেকের জীবনের ঘটনাই ভিন্ন।
আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স যখন সহায়তা করছে তখন আর বানান, বাক্য নিয়ে চিন্তা নেই। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে সত্যিকারের আবেগী লেখক না হলে সেই উপন্যাস তথ্যের ভাণ্ডার হয়ে উঠছে। সেসব মানুষ পড়বে কেন! লেখকের অনুভূতি, লেখকের চোখ বলে তো কিছু থাকতে হবে। তবে আবার সমস্যাও হচ্ছে না, নিজ নিজ গণ্ডির লেখককে পড়ছে সবাই। অন্য গণ্ডির প্রতি আগ্রহ নেই। মানুষ একেবারে নিজের চেনা জগতে ডুবে গেছে। বাকি পৃথিবী তার অচেনা।
২০৭৬ সালে সাহিত্যের সবচেয়ে মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো যে প্রযুক্তি এসেছে তা হলো, লিকুইড টেক্সট। পাঠক যখন হেডসেট পরে গল্প-উপন্যাস পড়া শুরু করছে তখন আর্টিফিশিয়াল সেন্সর মানুষের আবেগের খবর পেয়ে যাচ্ছে
তবে আজকের এই ২০৭৬ সালে সাহিত্যের সবচেয়ে মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো যে প্রযুক্তি এসেছে তা হলো, লিকুইড টেক্সট। পাঠক যখন হেডসেট পরে গল্প-উপন্যাস পড়া শুরু করছে তখন আর্টিফিশিয়াল সেন্সর মানুষের আবেগের খবর পেয়ে যাচ্ছে। তার কি মন খারাপ? তার কি বিশেষ কোনো উপদেশ লাগবে? নাকি বন্ধুর বাড়িয়ে দেওয়া হাতের মতো তার লাগবে খানিক সহমর্মিতা? চাহিদা অনুযায়ী গল্প বা উপন্যাসের পরিণতি ঠিক সেভাবেই তার সামনে উপস্থাপিত হচ্ছে। পড়া শেষ করলে তার মনের কষ্ট বা অস্থিরতাও দূর হচ্ছে। এ এক অদ্ভুত আবিষ্কার। লেখকের ওপর কারও কোনো রাগ-অভিমান থাকবে না। এমনকি লেখক কেন এত নিষ্ঠুর, অমুক চরিত্রকে না মারলেও পারতেন- এই জাতীয় কোনো অনুভূতিই আসবে না। একটা উপন্যাস পড়া তো বিনোদনও বটে! এই দ্রুতগামী জীবনে সাহিত্য পড়ে মুখ গোমড়া করে থাকার মানে আছে? এখন একই উপন্যাস দশজন পড়লে দশ রকমের অনুভূতি হবে। প্রত্যেকে খুশি। গল্প-উপন্যাসকে এরকম কাস্টমাইজড বা পারসোনালাইজড হিসেবে সৃষ্টি করতে একটি বৈশ্বিক লেখক-বিজ্ঞানী দলকে বছরের পর বছর গভীর গবেষণায় ডুবে থাকতে হয়েছে। ২০৭৬ সালের সাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য এটাই।
এই সময়ে সাহিত্যের ক্ষেত্রে আরেকটি যে বিশেষ যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে তা হলো, ভাষার দেয়াল সম্পূর্ণরূপে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। একে নিউরাল সাহিত্য বলা যায় তাই। হেডসেট মাথায় দিয়ে যা-ই পড়া হোক না কেন তা পাঠকের নিজের ভাষাতেই দেখা যাবে।
২০৭৬ সাল নাগাদ কল্পসাহিত্যের বিষয়বস্তুতে এসেছে আমূল পরিবর্তন। এখন বেশিরভাগ গল্প-উপন্যাস লেখা হয় কতকগুলো বিশেষ বিষয়ে, যেমন, উত্তর-মানববাদ। মানুষ ও যন্ত্রের সংমিশ্রণে তৈরি মানুষের মানসিক সংকট ও উত্তরণের উপায় এখন কল্পকাহিনির প্রধান বিষয়। এ ছাড়া আছে জলবায়ুর বিপর্যয় থেকে বাঁচার আকুলতা নিয়ে হাজার হাজার উপন্যাস। যদিও সেসব না পারছে মানুষকে সান্ত্বনা দিতে, না পারছে জলবায়ুর দ্রুতগামী পরিবর্তন থামাতে। মহাকাশে উপনিবেশ নিয়ে বেশ কিছু উপন্যাস বিখ্যাত হয়েছে। নানান ভাষাভাষী লোকেরা পড়ছে। নতুন আবাসে মানুষের একাকিত্ব, একঘেয়েমি, দিনরাতের দ্বন্দ্ব আর নতুন সংস্কৃতি গড়ে তোলার সংগ্রাম এসব উপন্যাসের উপজীব্য। অন্যদিকে ডিজিটাল ক্লাউডে মানুষের প্রতি মুহূর্তের স্মৃতির সংরক্ষণ এত নির্ভেজাল যে মানুষের মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, মৃত্যুর ধারণা বদলে যাওয়ার দর্শন নিয়ে বেশ কিছু নামকরা সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে। এ নিয়ে গবেষণার বইয়েরও প্রচুর চাহিদা। এসব গবেষণা বা সাহিত্য দিনশেষে মানুষকে দেয় অমরত্বের স্বাদ।
ওদিকে বিশুদ্ধ সাহিত্য পড়ার জন্য একদল অধিকারকর্মী ক্রমাগত পৃথিবীময় পাঠকের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তাদের ‘অ্যানালগ মুভমেন্ট’ ইদানীং ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তাদের আন্দোলনের নাম, ‘ফিরিয়ে দাও অরণ্য’। সব রকমের ডিজিটাল সংযোগ বন্ধ করে দিয়ে তারা কাগজের বই পড়ার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করাসহ এ নিয়ে একের পর এক কঠোর কর্মসূচি দিয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীময় বহু রাস্তার মোড়ে বই ছাপানোর মেশিন রেখেছে তারা যেন মানুষ নিজেই চাহিদামতো বই ছাপিয়ে নিতে পারে। এই অধিকারকর্মীদের চাপে বহু সরকারকে এখনো কাগজ তৈরি করতে হচ্ছে। কাগজে বই পড়ার আন্দোলনকে শক্তিশালী করতে তারা বিভিন্ন এলাকায় বছরে একবার বইমেলারও আয়োজন করছেন। যান্ত্রিক মানুষের জন্য অবশ্য মেলা নিষিদ্ধ। তারা বই না-কিনে, সেখানে দাঁড়িয়েই পড়ে বা কয়েক সেকেন্ডে কপিও করে, যা কপিরাইটের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
অবশ্য কপিরাইট আইন আদৌ থাকবে কি না বা এ বিষয়ে নতুন আইন কীভাবে প্রণয়ন করা যায়- এ নিয়ে চলছে বহু তর্কবিতর্ক। যেহেতু মানুষ এবং আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স একসঙ্গে রচনা করছে, আবার যেহেতু রচনা মানুষের ভাব-অনুভব বুঝে সেভাবেই নিত্যনতুন রূপে পরিবেশিত হচ্ছে, মানুষের মস্তিষ্ক এখানে জাগ্রত উপাদান হিসেবে উপস্থিত আছে, তাই কপিরাইট প্রকৃতপক্ষে কাকে দেওয়া উচিত, লেখক নাকি পাঠক- এ নিয়ে লেখক-প্রকাশক-পাঠকদের মধ্যে চলছে তর্কবিতর্ক। কিছু প্রকাশক যদিও অ্যানালগ মুভমেন্টের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ, তবুও কিছু প্রকাশক ফ্যাশন অনুযায়ী ডিজিটাল বই তৈরিতে ব্যস্ত। সেক্ষেত্রে, পাঠকদের ‘ব্রেইন ডেটা’ ব্যবহার করে সাহিত্য তৈরি হচ্ছে, তাই কেউ কেউ কপিরাইট দাবি করছেন দেখে প্রকাশকরা বিব্রত। অন্যদিকে তারা এই ভয়েও আছেন অধিকারকর্মীরা একে নৈতিকতাবিরোধী বা গোপনীয়তা ভঙ্গকারী কোনো কাজ হিসেবে ট্যাগ না লাগায়। তাহলে হেডসেটে বইয়ের যে রমরমা বাজার তা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হবে।
এসব সংকট কাটিয়ে উঠলে ২০৭৬ সালের সাহিত্য হবে মানুষের চেতনার এক বিরামহীন বিস্তার।
লেখক: কথাসাহিত্যিক





