পাব কি খুঁজে স্বপ্নলোকের চাবি

ছবি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
সামান্য কিছু উদ্যোগ নিলেই আমাদের সাংস্কৃতিক জগতের চালচিত্র বদলে যেতে পারে দারুণভাবে। মাটি-মানুষকে ভালোবেসে কিছুুটা মানবিক হয়ে উঠলেই অভাবনীয় উন্নতির সম্ভাবনা জ্বলজ্বল করছে। বিজ্ঞানের হাত ধরে দুনিয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সেদিকেই কি এগোব আমরা নাকি স্বপ্ন দেখেই দিন কাটবে
আরে ব্বাস। এলাহি কাণ্ড! পিট পিট করতে করতে মাত্রই চোখ মেলতে পেরেছি। ঝাঁ-চকচকে ঘর। বিছানা ঘিরে ঢাউস ঢাউস যন্ত্র। ছাদের বাতিটা কেমন নীল-সবুজ আলো ফেলছে। কোমল, মায়াবী। দেয়াল শুধুই কাচ। ছাদ থেকে মেঝে পর্যন্ত। দৃষ্টি ঠেকে না। আদিগন্ত বিস্তৃত। কোথায়? এ কার ঘরে আমি!
ছা-পোষা সাংবাদিক। এলেম তো ছিল না এমন ঝকঝকে-তকতকে ঘর বানানোর! বউ অবশ্য রোবোটিকস নিয়ে পড়ে বড় একটা চাকরিতে ঢুকেছে। মায়ের প্রভাবে আমরা সবাই বাঙালির সংস্কৃতি চর্চা করি। ধর্ম নিয়ে দ্বন্দ্বে না জড়িয়ে জাতিসত্তায় বিশ্বাসী। বাসার আর সব কোথায়?
মন জিজ্ঞাসু হতেই সব এসে হাজির। বউ, ছেলেমেয়ে, বোন। কিন্তু এ কী! সবাই বেজায় বুড়িয়ে গেছে। সবারই মুখমণ্ডল বেয়ে বর্ষার অঝোর ধারা। মা, মা কোথায়? এক দেয়াল থেকে ভেসে এলো– ‘বাবু, তুমি কোমায় চলে যাওয়ার পর পনেরো বছর অপেক্ষা করেছি। প্রাণবন্ত ছেলেটাকে আর দেখা হলো না। মাথা ঘুরিয়ে বিস্মিত চোখ তাক করলাম। ওই তো মা। না না, কেবলই ছবি! চেনাচেনা, তবু অচেনা। সবকিছুই কেমন অদ্ভুত ঠেকছে। বলছে কী!’
হঠাৎ সশব্দ কান্না। বউ আমায় জড়িয়ে ধরেছে। আমার শার্ট ভিজে জবজবে। ভেজা চোখে হাসিমুখে মেয়ে আর ছেলে পাশে এসে দাঁড়াল। বোন কেমন আড়ষ্ট। বউয়ের কাঁচা-পাকা চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বলি– ‘মা ভিডিওতে কেন? এক রাতে তোমরা কেমন বদলে গেছ! আমরা কোথায়? কোমা, কীসের কোমা!’
জবাব মেলে না। শুধু দুপাশ থেকে ওরা সাদরে হাত আঁকড়ে ধরে। কিছু তো এক রহস্য আছে! বিছানার পাশের এক যন্ত্র গম গম করে উঠল– ‘দাদা, তুমি পঞ্চাশ বছর কোমায়। সবে তোমার ঘুম ভাঙল।
এখন তোমার সাতাত্তর। তবে দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ত্রিশ বছর আমরা তোমার শরীরের বয়স আগের জায়গায় রেখে দিয়েছি। বউমা এই পঁচাত্তরে পড়ল। ছেলের তিপ্পান্ন, মেয়ের একান্ন হতে চলেছে। বোনের সত্তর। মা চলে গেছেন ৩৫ বছর আগে।’
শিক্ষাব্যবস্থার প্রথম স্তরে ধর্ম, খেলা আর সংস্কৃতি পাঠ আবশ্যিক। শিশুরা যে যার ধর্মের বিশ্বাস, আচার, অনুষ্ঠান শিখে নেয়। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়তে অন্যান্য ধর্মের পাঠও থাকে। ছোঁয়া পাচ্ছে গান, বাজনা, নাচ, আঁকা, গড়া, অভিনয়, আবৃত্তির। খেলাধুলার পাশাপাশি আছে বাঙালির ঐতিহ্য এবং বাংলার প্রকৃতিপাঠ, বেড়ানো
ট্যাক ট্যাক করে জ্ঞান ঝেড়ে যাচ্ছে একটা যন্ত্র! বলে কী! না না, এ হতেই পারে না! কিন্তু সত্যিই তো, ওরা সব বুড়িয়ে গেছে। ইস্। কাল রাতেও তো এক বছুরে মেয়েটাকে আদর করে ঘুমোতে গেলাম! হলো কী! বউ ফোঁপাতে ফোঁপাতে মুখ খুলল— ‘আমাদের পহেলা বৈশাখের উৎসবে বোমা হামলা হয়েছিল। তুমি সারাদিন হাসপাতাল-ডাক্তার করেও তিনজনকে বাঁচাতে পারোনি। মাথায় চোট পেয়েছিলে। আমল দাওনি। সেই যে রাতে ঘুমালে, আর উঠলে না।’
এক দমকায় মনের পুরনো জানালাটা খুলে গেল। রমনার বটমূলে ছায়ানটের প্রভাতি আয়োজনের পর অন্যান্য দল নিয়ে সারাদিনের বর্ষবরণ উৎসব। সন্ধ্যায় পালাগানের আসরে বোমা। আগুন। আতঙ্ক। লাশ। চোট-জখম। কান্নাকাটি। হুড়োহুড়ি। হাসপাতাল। আহারে, সব ভুলে ছিলাম! উত্তেজনায় উঠে বসি—‘দেশ কেমন আছে, মানুষ কেমন আছে? বর্ষবরণ হয় কী!
বউয়ের মুখে স্বস্তির মৃদু হাসি।’ ‘তুমি ভাবতেও পারবে না। ওই হত্যাকাণ্ডের পর আমরা মরিয়া চেষ্টা চালাই। অনেক উত্থান-পতন। পাঁচ বছরের সংগ্রামে আমরা বেপথুদের বোঝাতে পেরেছি, মানুষ মানুষই; বৌদ্ধ-হিন্দু-খ্রিস্টান-মুসলমান সবাই মানুষ; সবাই স্রষ্টার সৃষ্টি; যে যার মতো চলবে-বাঁচবে; অংশী না হই, সবাই সবাইকে, সবার আচারকে শ্রদ্ধার চোখে দেখব; এক জাতিসত্তা একত্র; ঈর্ষা, দ্বন্দ্ব, হানাহানি ভুলে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতির দেশ গড়তে পারলে বিশ্ববাসীর সশ্রদ্ধ সম্ভ্রম মিলবে। আমরা, তোমার-আমার স্বপ্নের দেশ পেয়েছি গো।’
হ্যাঁ, স্বপ্ন তো ছিলই। কিন্তু আমি লম্বা ঘুমে! স্বপ্নপূরণও হয়েছে। সবাই এগিয়ে গেছে। আমিই শুধু পিছিয়ে! নাকি এখনো স্বপ্ন দেখছি? চিমটি কাটলাম। উহ্। লাগে। তবে? বউ হেসে ফেলল– ‘বুঝতে তোমার সময় লাগবে। মানুষ কিছুটা মানবিক হয়ে উঠলে, দিনে দিনে অশিক্ষা-কুশিক্ষা কেটেছে। এই মাটি-মানুষকে ভালোবেসে দুনিয়ায় এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। বছর কুড়ি আগে নানা আবিষ্কারে প্রযুক্তির লাফ-ঝাঁপ শুরু, অভাবনীয় উন্নতি। তোমাকেও টিকিয়ে রেখেছে বিজ্ঞান। বালিশের পাশে রাখা ছোট্ট ফোনসেটের মতো ডিভাইস, ওটা তোমার মাইন্ড রিডার। মনে যত জিজ্ঞাসা জাগবে, মুখ ফুটে বলার আগেই উত্তর পেয়ে যাবে।’
চোখ বড় বড় করে তাকাই। এ-ও সম্ভব! যন্ত্র খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে ওঠে– ‘হুম, ঠিক তাই। আমার পেটে ইনফো ঠাসা। ঠুসে ঠুসে আরো ঢোকানো হয়। সেগুলোই উগরে দিই।’ এই থামো।
বউ বলে— ‘বড্ডো বাক্ওয়াজ। ওর নাম মি অ্যান্ড মাইন। চলো চলো, তোমাকে ঢাকা শহরটা ঘুরিয়ে দেখাব। ছেলেমেয়েরা তো তোমাকে আর সেভাবে পায়নি। তুমি কোমায় থাকতে মি অ্যান্ড মাইন তোমার সব কল্পনা আর স্বপ্নের প্রেজেন্টেশন দিয়ে গেছে। তোমাকে চেনা বলতে ওটুকুই।
বড় জ্বালাবে বলে মি অ্যান্ড মাইনকে রেখেই বেরোলাম। চালকবিহীন গাড়ি। বউ যেমন বলছে, তেমন তেমন চলছে। রাস্তার দুপাশের সারি সারি আকাশ ফোঁড়া অফিসগুলো কোথায়! ছেলে হেসে ফেলল– ‘ওসবের আর দরকার হয় না। বহু কাজ এআই দিয়ে চলে। আবার ঢাকা থেকে অনেক মন্ত্রণালয় অন্যান্য জেলা শহরে সরিয়েছে। ঢাকায় এখন বাইশ লাখ মানুষ। তোমার সময় ছিল, দুই কোটি। দেখ, পথে কত কম লোকজন।
সত্যিই! এক্কেবারে ঈদের বড় ছুটির সময়ের ঢাকা। নস্টালজিয়া চলে আসে, ভিড়ভাট্টা আর ট্রাফিক জ্যামের জন্য মন আঁকুপাঁকু করে! আমার একটা ওরিয়েন্টেশন দরকার। তর সইছে না, সব জানতে চাই।’
জিজ্ঞেস করি– ‘মি অ্যান্ড মাইনকে আনলে হতো না? কত্ত কিছু যে জানতে ইচ্ছা করছে।’
‘বাহ্, আমি আছি না? বিয়ের আগে সাত বছরের প্রেম। তোমার মন তো পড়াই আছে! তোমার প্রতীক্ষায় থাকতে থাকতে আমি টুক টুক করে লিখেও রেখেছি। এই ধরো।’
একটা পেল্লাই ডায়েরি। বাঁ ধারে স্ক্রিন, ডান পাতায় লেখা। বুঝলাম পড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্ক্রিনে প্রাসঙ্গিক ভিজ্যুয়ালও পাব। এদের যা কায়-কারবার! মুহূর্তের মধ্যে ডুবে গেলাম দেখাপড়ায়।
শিক্ষাব্যবস্থার প্রথম স্তরে ধর্ম, খেলা আর সংস্কৃতি পাঠ আবশ্যিক। শিশুরা যে যার ধর্মের বিশ্বাস, আচার, অনুষ্ঠান শিখে নেয়। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়তে অন্যান্য ধর্মের পাঠও থাকে। ছোঁয়া পাচ্ছে গান, বাজনা, নাচ, আঁকা, গড়া, অভিনয়, আবৃত্তির। খেলাধুলার পাশাপাশি আছে বাঙালির ঐতিহ্য এবং বাংলার প্রকৃতিপাঠ, বেড়ানো। কলেজ আর ইউনিভার্সিটিতে সবই বিষয়ভিত্তিক। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ আলাদা কলেজ, ইউনিভার্সিটি। সবারই পছন্দের বিষয়ে পারদর্শী হওয়ার সুযোগ। স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে নিয়মিত বিষয়ভিত্তিক অনুষ্ঠান হয়। হয় বাঙালির জাতীয় দিবস আর ষড়ঋতু বরণের আয়োজন।
পাতা ওল্টাই। স্থান সংকুলান হয় না বলে মসজিদ, মন্দির, গির্জা, বৌদ্ধমন্দিরগুলোর আকার বড় হয়েছে। যে যার মতো আচার-অনুষ্ঠান পালন করে। ঈদের দিনে, পূজার দিনে বিশাল বিশাল শোভাযাত্রা হয়। ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে মানুষের জমায়েত। সবাই জোট বেঁধে যায় খেলার মাঠে। বাঙালির বিজয়ে প্রেরণা জোগায়। তেমনই সব ধর্মের বাঙালি এক হয় ঐতিহ্য আর সমসাময়িক গান-নাচ-পাঠের আয়োজনে। শহরের বাইরে গ্রামগঞ্জেও নাকি পাশাপাশি চলে ওয়াজ মাহফিল আর যাত্রা, পালা, কবির লড়াই। কোনো বিরোধ নেই। যে যার পছন্দের জায়গায়। আবার একই মানুষ অগ্রাধিকার দিয়ে একেক আসরে। অভূতপূর্ব!
বুঁদ হয়ে দেখছিলাম। কাঁধের ওপর আলতো চাঁটিতে চটকা ভাঙে। বউ– ‘দেখ কোথায় এসেছি।
বিশাল বিশাল ঘোড়া-হাতি হাতছানি দিচ্ছে। চারুকলা অনুষদ না! তাই তো। ওই তো পেছনেই উঁকি দিচ্ছে বকুলতলা!’ আমি উৎসুক– ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা? ওটার কী হাল?’
– ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ। ওটাও নিয়মিত হয়। শহর কেন, দেশ জুড়েই। মঙ্গল আর বৈশাখী নামে, যার যেমন পছন্দ। বর্ষবরণ অনুষ্ঠান আরও সংগঠিত। দেশ-বিদেশে। বছর জুড়ে যে পোশাকই পরি, ওই দিনটাতে আমার চাই শাড়ি। হিজাবের নিচে একটা টিপ। তোমার জন্য পাঞ্জাবি তোলা থাকে। এবারে পরবে।’
আমি উন্মনা। দেশের জাতিসত্তার এই অভূতপূর্ব জাগরণ, এমন সম্প্রীতির জোয়ার আমার দেখা হয়নি! কী দুর্ভাগা। তবে আমাদের স্বপ্নলোকের চাবি যে বাঙালি খুঁজে পেয়েছে, সেটাই তো পরম অর্জন। তাই ভাগ্যবানও বটে, পিছিয়ে পড়েও আমি চলতি উজ্জীবনের সহযাত্রী।
লেখক: সাংবাদিক, ছায়ানটের সহ-সভাপতি





