আমার হৃদয়ে বাঁচো
রাজনৈতিক টোস্ট, চানাচুর এবং চা

ইরাজ আহমেদ। স্কেচ: আগামীর সময়
বিকেলবেলা পার্টি অফিসের খুবই স্বল্প প্রসারিত একটি ঘরে বসে চানাচুর দিয়ে মাখা মুড়ি চিবাতে চিবাতে কথাটা বলেছিলেন নির্মল সেন। বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক নির্মল সেনের দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন। শ্রমিক-কৃষক সমাজবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা পরিহিত মানুষটি আন্দোলন-সংগ্রামে থাকতেন সামনের সারিতে। তার কথাটা আজও আমার মনে পড়ে। রাজনীতির হালচাল বুঝতে মাঝে মাঝেই ঢাকার তোপখানা রোডে তার পার্টি অফিসে গেলে মুড়ি-চানাচুর খাওয়াতেন আর বলতেন, ‘খাও খাও, রাজনীতির খবর জানতে হলে টোস্ট বিস্কুট আর চানাচুর খেতে হয়। রাজনৈতিক রিপোর্টার হবে আর এই খাবার গলাধঃকরণ করবে না তা হবে না।’
কাঠের টেবিলের ওপর পত্রিকার একটি পৃষ্ঠা বিছিয়ে দিয়ে তার ওপর মুড়ি আর চানাচুর। বহুদিন সেই মুড়ি আর চানাচুর খেতে খেতে শুনেছি তার রাজনৈতিক পরিস্থিতির নিয়ে তার বিশ্লেষণ। অফিসে বসে সর্বদাই আড্ডার মুডে থাকতেন নির্মল সেন। চিরকুমার ছিলেন তিনি। জাতীয় প্রেসক্লাবের বড় ঘরটাতে দেখতাম সকালবেলা তুমুল আড্ডা দিচ্ছেন। আবার কখনো লাইব্রেরিতে গভীর মনযোগে পত্র-পত্রিকার পৃষ্ঠা উল্টাচ্ছেন। অন্য ছোট-বড় সব সাংবাদিকদের কাছে তিনি ছিলেন নির্মলদা। পিতার বন্ধু ও সহকর্মী ছিলেন বলে আমি ডাকতাম নির্মল কাকা। তার অফিসে চানাচুর আর দুধ দেওয়া চায়ের সঙ্গে কখনো বাড়তি হিসেবে মিলে যেত দেশের রাজনীতির গতিপথের আগাম পূর্বাভাস।
বামপন্থী রাজনৈতিক দলের অফিসে চা আর টোস্ট বিস্কুট দিয়ে আপ্যায়ন এক ধরনের সংস্কৃতিতে বরাবরই প্রচলিত। পুরানা পল্টনে সিপিবি অফিসে দুপুরবেলা খবর সংগ্রহের কাজে গেলে এই চা আর কখনো টোস্ট বিস্কুট ছিল বাঁধা। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে ওই অফিসে দিনেরবেলা নিশ্চিত ভাবে দেখা মিলত কমিউনিস্ট পার্টির একনিষ্ঠ কর্মী আবদুশ শহীদের। মাঝে মাঝে মনে হতো পার্টি অফিসটাই বোধহয় তার নিজস্ব গৃহ। দেখা হলেই স্মিত হেসে অনেক কথার ঝুলি নিয়ে এগিয়ে আসতেন। বয়স তখন কম। তখন সগর্বে প্রাণবান সাপ্তাহিক বিচিত্রায় চলছে হাতেকলমে সাংবাদিকতা শেখার পর্ব। নানা ছটফটানির কারণে শহীদ ভাইয়ের কথা মন দিয়ে শোনা হতো না। তবে কখনো কখনো পল্টনের ফুটপাত ধরে তার সঙ্গে হাঁটতাম। মাঝে পল্টনের গলিতে ছাপরা চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে চা খেতাম। দেশে সামরিক সরকার বিরোধী রাজনীতি, ছাত্র আন্দোলনের ভবিষ্যৎ, নিজের লেখা বই নিয়ে কথা হতো। কারাগারের স্মৃতি নিয়ে একটি বই প্রকাশিত হয়েছিল তার। লিখেছিলেন দুই খণ্ডে আত্মকথা। খুব মৃদু কণ্ঠে নিজের জীবনের নানা অধ্যায়ের গল্প করতেন। হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতেন লুপ্ত দৈনিক বাংলা অফিসে। একাধিক জাতীয় দৈনিক আর সাপ্তাহিক পত্রিকায় সাংবাদিকতাও করেছিলেন তিনি। রাজনীতির চমকপ্রদ কোনো খবর তার কাছে না মিললেও বিচিত্র জীবনের কাহিনি জানা হতো তার কাছ থেকে।





