ওরা কয়েকজন: সম্মিলিত নিঃসঙ্গতার সংলাপ

সংগৃহীত ছবি
মনে হলো অনেকদিন পর আবার এক রেল স্টেশনের ওয়েটিং রুমে জেগে উঠলাম। হয়ত শীতের রাত। বাইরে কুয়াশার চাদর ছড়ানো। ওয়েটিং রুমে কয়েকজন তরুণ-তরুণী; আর কোনো যাত্রী নেই। তারা ভেঙে ভেঙে অনেক কথা বলছে। তাদের কাছ থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে কবি আবুল হাসান। আঙুলের ফাঁকে জ্বলন্ত সিগারেট; তাকিয়ে আছেন ওই জটলার দিকে। তার মাথা ভর্তি চুল, খাঁড়া নাক, দুটি ঠোঁট একে-অপরকে চেপে ধরে আছে। চোখের দৃষ্টিতে অনলংকৃত বিষাদ। একটি কাব্যনাট্য পুর্নপাঠের পরের প্রতিক্রিয়ায় স্টিল লাইফের মতো কতগুলো ছবি ফুটে উঠছে নাটকীয় ধারাবাহিকতায়। সেখানে স্পষ্ট ঝরে পড়ছে শীতের শিশিরের মতো মানুষের বিচ্ছিন্নতাবোধ, নৈঃসঙ্গচেতনা, স্মৃতিমুগ্ধতা আর নিজের ভিতরে ফিরে আসার জন্য তীব্র অনুভূতি।
মাত্র ২৯ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু ঘটে। পিজি হাসপাতালের একটি বেডে শুয়ে নিঃশ্বাস নিতে ব্যর্থ হয়েছিল তার ফুসফুস। জা আরতুঁর র্যাবো অথবা জন কিটসের মতো গোলাপের নিচে নিহত কবি কিশোর। তার সংক্ষিপ্ত কাব্যচর্চা বাংলা কবিতাকে উপহার দিয়েছে ‘রাজা যায় রাজা আসে’, ‘যে তুমি হরণ করো’ এবং ‘পৃথক পালঙ্ক’—এর মতো তিনটি উজ্জ্বল কাব্যগ্রন্থ।
আবুল হাসান রচিত কয়েকজন তরুণ এবং এক অচেনা যুবকের সংলাপমুখর কাব্যনাটক ‘ওরা কয়েকজন’। অনেক বছর পর ক্ষীন স্বাস্থ্যের অধিকারী নাটকটির পৃষ্ঠা উল্টে যেতে যেতে মনে হলো, বাংলা কবিতার পৃথক পালঙ্কে শুয়ে আবুল হাসান যে জয়শ্রী জীবনের স্বপ্ন দেখতেন তারই প্রলম্বিত রূপ এই কাব্যনাট্যের শরীরে ছলকে পড়েছে। কিন্তু পাশাপাশি আবুল হাসান দেয়ালে ঝোলানো সেই আয়না ভেঙে পড়ার শব্দও শুনেছেন। আয়নায় ফুটে উঠেছে এক অজানা এবং অজ্ঞাত নারীর শরীর। কিন্তু সে আয়না ভেঙে পড়ার শব্দকে উল্লেখ করেছেন তিনি নাটকে। গল্পের চরিত্র ভেঙে আরেকটি ভাঙা চরিত্রের নির্মাণে এক রহস্যময় জগত তৈরি করেছেন আবুল হাসান। কে সেই নারী? কী তার পরিচয়? সেই নিঃসঙ্গ তরুণের পূর্ব-প্রেমিকা অথবা তার চাইতেই অজ্ঞাত কেউ? নাটকের ভিতরে আবুল হাসান এক রহস্যময় জগত নির্মাণ করেছেন যা নাটকীয়তাকে বাড়িয়ে তুলেছে খুবই সংক্ষিপ্ত দক্ষতায়। কবির ভাষায় সেই নারী সুচিস্মিতা, সুযৌবনা সুচপলা এবং লাবণ্যসম্ভবা। বিবরণ থেকে থেকে বুঝে নেয়া যায়, আয়নায় প্রষ্ফুটিত নারী অবয়বটি যুবকের সাবেক প্রেমিকা। অনুভূতির একটি শৃঙ্গে পৌঁছে তিনি নাটকে লেখেন:
ফের তুমি? তুমি ফের কেন এলে?
তুমি নেই বলেই তো
আমি দুই চোখ তৃষ্ণার মতোন ধরি পৃথিবীর মানুষের দিকে
তুমি নেই বলেই তো,
আমি বুকের গভীরে ঢেউয়ের শব্দ শুনি
আমার শহরে সব অন্ধকার আলো হয়।
অজ্ঞাত এবং স্মৃতিনির্ভর এক স্টেশনের ওয়েটিং রুমের ভিতর থেকে নাটকের গল্প এগিয়ে গিয়ে আবার থামে সেই অজ্ঞাত পরিচয় যুবকের ঘরে, আয়নার ভিতরে, অন্ধকারে অথবা অন্য এক জীবনের গল্পে। কিন্তু সেখানে আলো আছে, আলোর পরিত্রাণময় উত্থানের কাহিনি লেখা হয়েছে। আবুল হাসান কবিতায় উচ্চারণ করেছিলেন, ‘‘বলো তারে শান্তি শান্তি’’। সেই অনিঃশেষ শান্তিকামী আলোর ঝর্ণাধারা যেন তাঁর কাব্যনাটক। সেই অজ্ঞাত এবং অচেনা তরুণের নিঃসঙ্গতার বেদনাবোধ আবুল হাসানকে চিনিয়ে দিতে ভুল করে না। কাব্যনাট্যের কেন্দ্রীয় চরিত্র সেই অচেনা তরুণ অনমনে সংলাপ উচ্চারণ করে:
আশ্চর্য তো! আমি ভেবেছিলাম এরা
সবাই ছুটিতে যাচ্ছে এক জায়গায়,
সেই দূরে মাইল দশেক গেলে ছিমছাম পাহাড়ী নদী,
থাকবার সুবন্দোবস্ত, সব আছে, শয্যা, ঘুম হাসি অবসর
অনেকেই সেখানে পিকনিকে যায়,
কেউ ফিরে এসে ইনিয়ে-বিনিয়ে গল্প লেখে
কারো কবিতায় থাকে কত যে বিরহ,
কিন্তু এরা, এরা সব নিজের নিজের দিকে
চলে যাচ্ছে, আশ্চর্য তো!
নিজের দিকে যাওয়া, নিজেকে কোথাও আবিষ্কার করার বদলে আরও হারিয়ে ফেলার জন্য হাসানের যে বেদনাবোধ তা তাকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছে ধারাবহিক আত্মজৈবনিক রচনা। তাঁর সামগ্রিক রচনার ভিতরে ক্রমাগত একটি জীবনের গল্প প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটু একটু করে। সে জীবন বস্তুত তার সকল সৃষ্টির গভীরে এক ধরণের দুঃখবোধ, স্বপ্নময় বিষাদ তৈরি করেছে জাদু বাস্তবতার এক জগত। তিনি নিমজ্জিত হতে চেয়েছেন নিজস্ব অন্তস্তলে; কিন্তু সংবেদনশীল শিল্পীসত্তা তাকে অন্তর্মুখিনতা থেকে তুলে এনেছে অন্য এক জনময়তায়। তাই বিরূপ এক পৃথিবীর ভিতরে ডুবে যেতে যেতে আবুল হাসান অভাব, মড়ক, প্রণয়ের অনুপস্থিতি, প্রতারণা, রিক্ততা আর নিজস্ব আত্মার রুগ্নতাকে অতিক্রম করে পৌঁছে যান সামষ্টিক চেতনায়। তাই কাব্যনাটকে গভীর বিষাদে নিমজ্জিত হতে হতে সেই প্রেমিক যুবক প্রশ্ন করে :
কী করে বুঝলেন,
আমি আলো চাই, সেই আলো
যে আলো আপনারও দরকার,
প্রেমিক হৃদয়ের আলো?
আপনিও প্রেমিক?
তারপরেই যেন জীবনের দিকে ফিরতে চেয়ে লেখেন এমন সংলাপ:
আর নেই কোনো চিত্তবিকারের পরিণতি,
প্রকৃত আলোর কোনো ক্ষয় নেই।
আলো অনিঃশেষ
আলো শান্তিকামী।
কাব্য নাটকের গভীরে এক কবিকে দেখতে পাওয়া যায় সংলাপ নির্মাণের ক্ষেত্রে আত্মগত ভাবনার শিল্পপ্রতিমা নির্মাণই ছিল যার অন্বিষ্ট। ব্যক্তি-মানুষের অন্তর্গত রক্তক্ষরণ তাঁর কবিতায়, এই কাব্যনাট্যে তা অপরূপ হয়ে প্রকাশিত হয়েছে। কবিতায় বললাম এজন্যই যে, কবি আবুল হাসান সমাজ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েননি কখনোই। আবার ব্যক্তিগত আত্মার উন্মোচন তিনি ঘটাতে চেয়েছেন বিচ্ছিন্ন হয়েই। এ যেন আত্মজৈবনিক অভিজ্ঞতা দিয়ে তৈরি করা শিল্পের অনুভূতি। একদিকে কবি ভাঙতে চেয়েছেন নিজের মূর্তি, যা বিষাদে ছাপানো। আবার অন্যদিকে তিনি লিখছেন:
কেউ বলে আমাদের আলো চাই, সুনিশ্চিত আলো।
সেই আলোর জন্য প্রার্থনার ভিতরে তার বিশুদ্ধ আত্মার ছবি লগ্ন হয়ে থাকে। মনে হয়, তিনি নিজেই সেই গল্প নির্মাণ করছেন যেখানে উচ্চারণ করছেন:
তুমি কোন আলো চাও?
মেয়েরা গোপনে যেই আলো ফেলে
পুরুষের গভীর হৃদয়ে-সেই আলো!
অপ্রকাশিত নাটক ‘পরিস্থিতি’তেও সেই শান্তির জন্য প্রার্থনা উচ্চারিত হয়েছে একই ভাবে। সেখানেও একজন নাট্যকারের পেছনে সক্রিয় থেকেছে একজন সক্রিয় কবির আত্মা। কবিতার লাবণ্যকে অনুভব করি শব্দের ব্যবহার, সংলাপ ও নির্মিতিতে। আবুল হাসান লিখেছেন নায়িকার সংলাপে:
বুঝছো না কেন, আমাদের সিদ্ধান্তটা তো মাকে জানানো দরকার।
উত্তরে নায়ক বলছে:
লিখে দাও, আমরা আগামী মাসে মফস্বলে বেড়াতে যাবো। শিকারে যাবো। শিশিরে ¯œান করবো।
প্রকৃতপক্ষে এই দুইয়ের দ্বৈরত তার কবিতা, গল্প এবং কাব্যনাটককে এক অদ্ভুত দোলাচলে নিক্ষেপ করেছে। ওরা কয়েকজন কাব্যনাটকে আসলে অনেকজন অথবা একা এক কবি অনর্গল তার আত্মকথনে নিমজ্জিত। শেষ কাব্যগ্রন্থ ‘পৃথক পালঙ্ক। অপরূপ বাগান কবিতায় তিনি লিখছেন:
চলে গেলে তবু কিছু থাকবে আমার: আমি রেখে যাবো
আমার একলা ছায়া, হারানো চিবুক, চোখ আমার নিয়তি।
ওই নিয়তিই যেন আবুল হাসান। কী তীব্র আকাঙ্খা জীবনের প্রতি! অথচ জেনে গিয়েছিলেন, আয়ুরেখাকে ছেঁটে ফেলেছে মারাত্মক ব্যধি। তাই হয়তো লিখেছিলেন এমন চরণ:
যেনো আমার এখন সব কিছুকেই অবহেলা করার সময়
উপেক্ষা করার সময়।
আবুল হাসান উপেক্ষা করতে চেয়েছিলেন সব কিছুকে। পেরেছিলেন কি?
১৯৭৫ সালের নভেম্বরের তীব্র শীতের মধ্যে আবুল হাসান পৃথিবীকে বিদায় জানানোর পর ১৯৮৮ সালে মুদ্রিত হয় তাঁর লেখা কাব্যনাটক ‘ওরা কয়েকজন’। প্রকাশক নওরোজ সাহিত্য সংসদ। সম্ভবত নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে নাটকটি পুনঃপ্রকাশিত হয় কবি তারিক সুজাতের ‘জার্নিম্যান’ প্রকাশনা সংস্থা থেকে অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষের সম্পাদনায়। আবুল হাসান ১৯৪৭ সালের ৪ অগাস্ট গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ার বর্নি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈত্রিক নিবাস পিরোজপুর জেলার নাজিরপুরে।
লেখক, কবি ও সাংবাদিক





