বিশ্ব প্রবীণ দিবসের বিশেষ লেখা
আমাদের কথা শোনার কেউ নাই

প্রতীকী ছবি
সকালে হাঁটতে বের হয়েছি। ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকার ছোট একটি পার্ক। পার্কের একপাশে স্থায়ী কয়েকটি বেঞ্চ। সেখানে দুজন প্রবীণ বসে কথা বলছেন। কেন জানি না, তাদের কথা শোনার প্রতি আমার আগ্রহ তৈরি হলো। আমি তাদের আরেক পাশে বসলাম। উল্টো দিকে মুখ করে। তবে কান খাড়া থাকল তাদের দিকেই।
রমিজ উদ্দিন (ছদ্মনাম) বললেন, ‘কী ভাইসাব, শেষ পর্যন্ত সমাধান করতে পারলেন কিছু?’
মুন্সেফ আলী (ছদ্মনাম) কোনো কথা বললেন না। ঘাড় উঁচু করে আকাশের দিকে তাকালেন।
রমিজ সাহেব তাগাদা দিলেন, ‘আরে, কী হলো, কথা বলছেন না কেন?’
মুন্সেফ সাহেব পায়ের কাছ থেকে শুকনো একটি পাতা তুলে নিয়ে বললেন, ‘না, এখনো আলাদা থাকি। আমি আর আপনার ভাবি এক বাসায়। আমার ছেলে আর ছেলের বউ আরেক বাসায়। জানেনই তো, আপনার ভাবি অসুস্থ। সকালে হাঁটার পর বাইরে হোটেলে নাশতা করি। আর আপনার ভাবির জন্য কিনে নিয়ে যাই। টাকা-পয়সার অভাব ছিল না। কিন্তু যা চেয়েছিলাম, তা হলো না রে ভাই!’
ওপরের কথাটুকু বলে তিনি রমিজ সাহেবের দিকে তাকালেন। বললেন, ‘আপনার খবর কী?’
রমিজ সাহেব বললেন, ‘আমি তো খুব ঝরঝরে আছি। ছেলেমেয়ে সব কটা বিদেশে। ওখানেই সেটেল করেছে। আর ফিরছে না। খবর-টবরও কেউ রাখে না। খুব ভালো আছি।’
এসব কথা বলে তিনি বেঞ্চ থেকে হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, ‘চলেন, হাঁটি। আর এক চক্কর দিই। এসব বাজে প্যাচাল পেড়ে লাভ নাই।’
তিনি আর দেরি করলেন না। পার্কের পাশ দিয়ে হাঁটতে শুরু করে দিলেন।
বেশ কিছুদিন পর। গাইবান্ধা জেলায় গেছি।
জেলায় প্রবীণদের জন্য একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। আয়োজক আগামীর সময়ের গোল্ড ক্লাব। শতাধিক প্রবীণ উপস্থিত ছিলেন সেই আয়োজনে। অনুষ্ঠান মঞ্চে প্রায় ১৫ জন প্রবীণ প্রত্যেকে মনের কথা বললেন। সে কথাগুলোর সারসংক্ষেপ করলে এমন দাঁড়ায়—
১. প্রবীণ নির্যাতনের বিরুদ্ধে আইন থাকা দরকার।
২. দেশের প্রতিটি হাসপাতালে প্রবীণ কর্নার থাকা জরুরি।
৩. প্রতিটি বিভাগীয় শহরে সরকারি উদ্যোগে আধুনিক বৃদ্ধাশ্রম তৈরি করা।
৪. স্কুলপর্যায়ের পাঠ্যপুস্তকে প্রবীণদের প্রতি করণীয় বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা।
৫. যেকোনো সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের শুরুতে স্থানীয় প্রবীণদের আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মান জানানো।
অনুষ্ঠানে এ রকম নানা দাবি উঠে এলো প্রবীণদের কণ্ঠ থেকে। অনুষ্ঠান শেষ হলেও তাদের কথা শেষ হচ্ছিল না। অনুষ্ঠানের পর তারা পরস্পরের সঙ্গে কথা বলছিলেন।
একজন প্রবীণকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেমন আছেন আপনি?’
হেসে হেসে বললেন, ‘ভালো আছি। তবে বুড়োদের আজকাল কেউ ইজ্জতটিজ্জত করে না। আমরা ছোটবেলায় যা করতাম, এখন তার পুরাই উল্টো রকম দেখছি।’
পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন আরেক ভদ্রলোক। তিনি আমাদের কথা শুনছিলেন। বললেন, ‘কথা বলার লোক নাই। আমাদের কথা শোনার কেউ নাই।’
একবার মিরপুরে গিয়েছিলাম একটি বৃদ্ধাশ্রমে। এক বৃদ্ধার সঙ্গে আমার বেশ আলাপ জমে উঠল। তার সব কথাই তার স্বামী, ছেলেমেয়েদের নিয়ে। স্বামী মারা গেছেন পাঁচ বছর আগে। তিন ছেলেমেয়ে তার। দুই ছেলে, এক মেয়ে। তিনজনই বিদেশে থাকেন।
বললাম, ‘ছেলেমেয়েরা আপনার খোঁজ নেয় না?’
‘নিত। প্রথম প্রথম নিত। এখন আর নেয় না।’
‘আপনি যে এখানে আছেন, ছেলেমেয়েরা জানে?’
‘তা তো জানি না। কোনো যোগাযোগ নাই।’
‘কবে গেল ওরা বিদেশে?’
বৃদ্ধা বললেন, ‘বড় ছেলে বুয়েট থেকে পাস করে পাড়ি দিল ইউরোপে। মেজো ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে গেল আমেরিকায়। মেয়েটা ইডেনে পড়ত। বিয়ের পর সেও চলে গেল বিদেশে।’
বৃদ্ধাকে আর কোনো প্রশ্ন করার ক্ষমতা বা অধিকার— দুটোই হারিয়ে ফেলি আমি।
বৃদ্ধাশ্রমের একজন কেয়ারটেকারকে বলি, ‘আপনাদের এখানে কোনো টিস্যুপেপার নাই? চোখ দুটো যেন কেমন কেমন করছে।’
কেয়ারটেকার বললেন, ‘জি না স্যার। আমাদের এখানে কোনো টিস্যুপেপার নাই।’



