সবাই ফিরতে চাইছেন ৮০-৯০ এর দশকে, কেমন ছিল সেই সময়

ফাইল ছবি
অতীতের ওপর মানুষের এক ধরনের অধিকার বোধ থাকে। সেই অধিকারের বোধ তাকে অতীতে ফিরিয়ে নিয়ে যায় কখনো। যদি ধরে নেই অতীত কয়েকটি ছবির সমষ্টি, তাহলে সেই ফেলে আসা জীবনের ছবিগুলো কখনো খুব অদ্ভুত, অথচ সরল আচরণ করে। মরুভূমির বুকে হারিয়ে ফেলা একদা নিজেরই পদচিহ্ন মানুষ খুঁজতে খুঁজতে পেছনের দিকে ফিরে যায়। কোনো একান্ত হাতবাক্সে তুলে রাখা লালচে রঙ ধরে যাওয়া ছবিগুলো ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে নিজেকে দেখতে চায়।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহু নেট-বাসিন্দা নিজেদের মুখাবয়বকে আট অথবা নয়ের দশকের অবয়বে পরিণত করে ছবি পোস্ট করছেন। গত কয়েক দিনে বিষয়টি একটি প্রবণতা হয়ে উঠেছে। পরিবর্তিত ছবিগুলোয় বহু মানুষ নিজেকে পেছনে ফেলে আসা একটি সময়ের অংশ করে তুলতে চাইছেন। বলাই বাহুল্য, এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তারা নিজেকে বর্তমান থেকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে অতীতের আলোয় ফেলে দেখে নিতে চাইছেন আরও কোনো অতীতকে।
কেমন ছিল সেই সময়টা? সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিচারে আশি এবং নব্বইয়ের দশকের মধ্যে একটি স্পষ্ট বিভাজন রেখা ছিল। আশির দশকে এই শহর ঢাকার কাঠামোও ছিল ভিন্ন। একবিংশ শতকে প্রবেশের দুই দশক আগে শহরের বাসিন্দাদের জীবনাচারণ, সংস্কৃতিচর্চা আর বোধের সঙ্গে অনাগত সময়ের কোনো মিল ছিল না এ কথা চোখ বন্ধ করে বলে দেয়া যায়। এই শহরের ঘরবাড়ির নির্মাণ প্রযুক্তির ক্ষেত্রটিও তখন আলাদা হয়ে পড়ছিল ক্রমাগত। সেই শহরে ফ্যাশন বা সামাজিক প্রবণতা অনুসরণকারী তরুণ-তরুণীদের চুলের কাট, পোশাক, আচরণ, এমনকি আড্ডার আয়োজনও ছিল প্রবল ভাবে অন্যরকম। আশির দশক ফুরিয়ে নব্বইয়ের দশকে পা রেখে সমাজ-জীবন নতুন পথে মোড় ঘুরিয়ে নিয়েছিল। তখন চিন্তার ক্ষেত্রে পরিবর্তন স্পষ্ট দৃষ্টিগোচর হচ্ছিলো। সাংস্কৃতিক আচরণের মধ্যে আগের দশকের তুলনায় অনেক বড় পরিবর্তন ঘটে গিয়েছিল। পৃথিবীতে রাজনৈতিক মতবাদের বড় ধরনের পরিবর্তন এবং অপসারণ এর একটি বড় কারণ বলে অনেক সমাজ গবেষক মনে করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত পরিবর্তিত ছবিগুলো জানান দিচ্ছে, চুলের ছাঁট, ব্যবহৃত পোশাক, সানগ্লাস, জুতোর ওপর পরবির্তনকামীরা প্রাধান্য দিয়েছেন বেশি। একবিংশ শতাব্দীর বাসিন্দা হয়েও তারা পুরনো আলোয় নিজেদের নতুন নামে ডাকতে চাইছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, হঠাৎ করে এই প্রবণতা সমাজে প্রবল হয়ে উঠল কেন?
হতে পারে গোটা প্রবণতাটিই একটি সামাজিক উচ্ছ্বাস। আবার এর পেছনে থাকতে পারে এখনকার একটি সামাজিক-রাজনৈতিক প্রবণতা অথবা ধারাকে নিজেদের অজ্ঞাতেই স্থানান্তর করার রাজনৈতিক চেষ্টা। মানুষ তার পেছনে ফেলে আসা সময় থেকে অনেক দূরে চলে এসে সেই সময়কেই আবার নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পায়। তখন সেই সময়ের নন্দনতত্ত্ব তার কাছে পুনরাবিষ্কৃত হয়।
নতুন সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে করতে ক্লান্ত মানুষ নিজেকে অপেক্ষাকৃত শান্ত একটি সময়ের মধ্যে আবিষ্কার করতে চায়। সেই সময়টা তার অতীতকাল। রাজনীতি, সামাজিক প্রবণতা, চিন্তা মানুষের ভাবনার গতিপথ নির্মাণ করে। অনেক ক্ষেত্রে ঘটনাগুলো ঘটে যায় ব্যক্তির অসচেতন মানসিক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে। আশি অথবা নব্বইয়ের দশকে এই শহর এবং তার বাসিন্দাদের সামাজিক জীবন একটি পরিবর্তনের মুখে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। আশির দশকে মোবাইল ফোন বলে একটি যোগাযোগ মানুষের হাতে ছিল না। ছিল না ইন্টারনেট প্রযুক্তি। মাত্র একটি দশক কাটতে না কাটতেই এই প্রযুক্তিগুলোর ব্যবহার মানুষের জীবনকে বদলে দিয়েছিল। সেটি ছিল একটি বড় পরিবর্তনের সূচনালগ্ন। আমরা একুশ শতকে প্রবেশ করেছি। পরিবর্তনের বড় বড় ঢেউ আমাদের জীবনকে লণ্ডভণ্ড করেছে বললে খুব একটা ভুল বলা হবে না। সেই আন্দোলনের তরঙ্গে ভাসতে ভাসতে মানুষ কি ক্লান্ত, তাই তারা পেছনের সময়ে ফিরতে চাইছে? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিজেদের অবয়ব তারা পাল্টে নিয়ে পৌঁছাতে চাইছে ফেরারি এক সময়ে?
তিন দশক আগে কেমন ছিলাম আমি? অথবা কেমন হতে পারলে ভালো হতো এই প্রশ্নগুলোর উত্তর মনে হয় এই প্রবণতা। মানুষ নিজেকে নিয়ে পরীক্ষা করতে চাইছে, ভূতের মতো পেছন দিকে হেঁটে অন্য সময়ে প্রবেশ করে নিজেরই পরিবর্তন ঘটাতে চাইছে। হয়তো এই চেষ্টারও মৃত্যু ঘটবে। কিছুদিন পরে সবাই ভুলে যাবে পরিবর্তনের চেষ্টার এই ধারাকে। কিন্তু ফেরারি সময়ের ফেরার আগ্রহ তার মধ্যে থেকেই যাবে হয়তো।





