অভিশাপ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রথম গল্প
বাবার চোখের দিকে ঠিক তাকাতে পারল না ছেলেটি। বাবা মাথা উঁচু আর কিছুটা বুক ফুলিয়ে বললেন, ‘সমস্যা নেই বাবা, যা বলতে এসেছিস বল। কোনো সংকোচ করিস না, দ্বিধা করিস না।’
‘তোমাকে নিয়ে একটু সমস্যা হচ্ছে বাবা।’
‘বুঝতে পেরেছি। তোকে বিয়ে করানোর পর থেকেই ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরেছি আমি।’ ম্লান হাসলেন বাবা, ‘তা কোন বৃদ্ধাশ্রমটা ঠিক করেছিস?’
বটগাছের ছায়াঘেরা একটি বৃদ্ধাশ্রমে বাবাকে নিয়ে এলো ছেলে। গাড়ি থেকে ব্যাগ আর প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো নামিয়ে বারান্দায় রাখল সে। চারপাশটা একপলক দেখে মাথা নিচু করে ফেলল তারপর। বাবা একটু এগিয়ে গিয়ে বললেন, ‘সম্ভবত আরও কিছু বলার আছে তোর। সমস্যা নেই, বল।’
‘বাবা—।’ গলাটা সামান্য কেঁপে উঠল ছেলের, ‘তোমার আর আমাদের বাসায় যাওয়ার দরকার নেই। আমি তোমাকে মাঝেমধ্যে দেখে যাব।’
বাবা আবার হাসলেন, ম্লান হাসি।
বাসায় ফেরার পথে ছেলের হঠাৎ মনে পড়ল— বাবার হাতে কিছু টাকা দেওয়ার কথা ছিল তার। ফিরে এলো সে বৃদ্ধাশ্রমে। গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকেই দেখে— বাবা প্রচণ্ড ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন এরই মধ্যে। বৃদ্ধাশ্রমের ফুলগাছগুলো ছেঁটে দিচ্ছেন তিনি, মাঠের কোনায় বেড়ে ওঠা ঘাসগুলো কাটছেন, বারান্দার পাশে পড়ে থাকা কাগজগুলো পলিথিনে ভরছেন, কোনোদিকে তাকানোর সময় নেই তার। বাবার মুখটা উজ্জ্বল দেখাচ্ছে, চকচক করছে চোখ, আনন্দ আর কর্মে কেমন মুক্তির ছোঁয়া তার পুরো অবয়বে। গ্লানি নেই, নেই বঞ্চনার কোনো ধারা।
বাবার বয়সী একটা মানুষ এসে দাঁড়ালেন ছেলেটির সামনে। ভালো করে তার মুখটা দেখে বললেন, ‘আমি এই বৃদ্ধাশ্রমটি বানিয়েছি। এর ঠিক পেছনে একটা এতিমখানা আছে, ওটাও আমার। ওখানকার অধিকাংশ বাচ্চা রাস্তা থেকে কুড়িয়ে আনা, কোনো কোনো বাচ্চা ডাস্টবিন থেকেও এনেছি আমি। ওই যে মানুষটাকে দেখছ—।’
বয়স্ক ভদ্রলোকটি মাঠের কোনায় ছেলেটির ব্যস্ত বাবাকে দেখালেন, ‘আটাশ বছর আগে এই এতিমখানা থেকে একটি ছেলেকে দত্তক নিয়েছিলেন তিনি, যাকে আমি ডাস্টবিনে ফেলে রাখা পলিথিন থেকে কুড়িয়ে এনেছিলাম। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে— ডাস্টবিনের ওই ছেলেটিই তুমি!’
দ্বিতীয় গল্প
বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সাইফুল্লাহ মানিক চল্লিশতম জন্মদিন পালন করবেন তার। সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন তিনি। প্রায় সব বন্ধুকে দাওয়াত করলেন। তিনি এটাও খেয়াল করলেন— তার সব বন্ধুই একেকজন সফল ব্যবসায়ী, কেউ ভালো চাকরিজীবী, সবাই গাড়ি-বাড়ির মালিক; শুধু একজন বন্ধু বেশ অসচ্ছল।
বিশাল লাল রঙের কেক কাটা হলো। একেকটা টুকরো হাতে নিয়ে তিনি মুখে তুলে দিচ্ছেন বন্ধুদের। হঠাৎ খেয়াল করলেন, তার ডান হাতের আংটিটা নেই। বেশ দামি পাথরের দামি আংটি।
শোরগোল পড়ে গেল অনুষ্ঠানে। একেকজন একেক কথা বলছেন। কেউ বলছেন, সবাইকে চেক করা হবে। কেউ বলছেন, পুলিশ ডাকা হবে। নানাজনের নানা রকমের কথা। সাইফুল্লাহ মানিক মানা করলেন এসব করতে, সামান্য একটা আংটিই তো!
তার কথা কেউ শুনলেন না। পুলিশ ডাকা হলো না অবশ্য, তবে সবাইকে চেক করা হলো। হঠাৎ এক বন্ধু খেয়াল করলেন— একজনকে চেক করা বাকি আছে, অনুষ্ঠানের কোনায় বসে আছেন তিনি। সাইফুল্লাহ মানিকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই তিনি দেখলেন— ওই বন্ধুটি আর কেউ নন, তার ওই অসচ্ছল বন্ধুটি। তিনি কিছুটা হাতজোড় করে মানা করলেন, তার ওই বন্ধুটিকে চেক না করতে; কিন্তু কেউ শুনল না তার কথা।
ডান হাত দিয়ে পাঞ্জাবির একটা পকেট চেপে ধরে বসে আছেন অসচ্ছল বন্ধুটি। সবাই গিয়ে সামনে দাঁড়াল তার। কিন্তু তিনি কিছুতেই চেক করতে দেবেন না তাকে। পকেটটা চেপে ধরে আছেন তিনি আগের মতো।
ব্যাপারটা চরম লজ্জার দিকে এগোচ্ছে। ভিড় ঠেলে সাইফুল্লাহ মানিক এগিয়ে এলেন সামনে। আবার হাতজোড় করলেন তিনি, ‘আমার আন্তরিক অনুরোধ সবার প্রতি, ব্যাপারটা এখানেই শেষ হোক।’
বাসায় ফিরে পরনের কোটটি খুলতে নিয়েই একটা হাত গেল সেটার ভেতরের পকেটে। কী যেন লাগল হাতে। সাইফুল্লাহ মানিক বের করলেন জিনিসটা, তার সেই আংটি! পকেটে কয়েকবার হাত ঢুকিয়েছিলেন অনুষ্ঠানের সময়, কখন যে খুলে ঢুকে গেছে পকেটে!
অপরাধবোধে রাতে আর তেমন ঘুম হলো না সাইফুল্লাহ মানিকের। খুব সকালে তিনি সেই অসচ্ছল বন্ধুর বাসায় গেলেন। অনেক কথা বলার পর সাইফুল্লাহ মানিককে শোয়ার ঘরে নিয়ে গেলেন অসচ্ছল বন্ধুটি। বিছানায় শুয়ে থাকা দশ-এগারো বছর বয়সী মেয়েকে দেখিয়ে বললেন, ‘জন্ম থেকেই আমার এ মেয়েটি হাঁটতে পারে না। দুই পা অচল। তোর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যাওয়ার সময় বলেছিল— বাবা, তোমার বন্ধুটি তো অনেক বড়লোক। বড়লোকের জন্মদিনের কেক তো অনেক মজার হবে, তাই না?’ অসচ্ছল বন্ধুটি মাথা নিচু করে ফেললেন, ‘তোরা যখন কেক খাওয়া নিয়ে ব্যস্ত, আমি তখন দুই টুকরো কেক একটা টিস্যুতে পেঁচিয়ে নিজের পকেটে রেখেছিলাম। বারবার আমার মেয়ের মুখটি ভেসে উঠছিল তখন।’
তৃতীয় গল্প
আমার একটা মেয়ে আছে। আমি একজন বাবা।
বন্দর নিয়ে দেশ বিক্রি হলো কি হলো না, এটা নিয়ে আপাতত আমার মাথাব্যথা নেই। মুক্তিযুদ্ধ একবার, তালিকা ৭ বার— যত্রতত্র ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা নিয়েও ভাবতে চাই না আগের মতো। সড়ক খাতে মাফিয়া নিয়ন্ত্রণ দূর করতে হবে, ছেলেভুলানো বুলি কপচানো নিয়েও কিছু বলব না আজ। অন্য দেশের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবছেন নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা বাংলাদেশের এক মন্ত্রী, ব্যাপারটা এড়িয়ে যাব এই মুহূর্তে।
আমি শুধু আমার মেয়ের নিরাপত্তার কথা ভাবব। প্রতিদিন, প্রতি সপ্তাহ, প্রতি মাসে যেমন খুশি তেমন শ্লীলতাহানি, মৃত্যুর নৃশংস দাপট আর অনিরাপত্তার ঘোর অন্ধকার থেকে আমি পরিত্রাণ চাই, মুক্তির বুকভরা শ্বাস চাই। ‘পিতা তার নিজের অস্তিত্ব বিলিয়ে দেন সন্তানের অস্তিত্ব রক্ষা করতে। আর এ কাজটা উনি এত নীরবে করেন যে, আমরা ভুলে যাই উনি আছেন, ওনার ছায়াতেই বেঁচে আছি আমরা। একজন বাবা হচ্ছেন সবচেয়ে আনসাং, সবচেয়ে কম প্রেইজড, সবচেয়ে আননোটিসড; কিন্তু সবচেয়ে ভ্যালুয়েবল মানুষ। যতক্ষণ পর্যন্ত উনি থাকেন, ততক্ষণ পর্যন্ত উনি যে আছেন, বুঝতে দেন না এটাও...।’
একটা লেখায় পড়েছিলাম ওপরের কথাগুলো।
আমি আমার মেয়ের নিরাপত্তা চাই, বাংলাদেশের সব মেয়ের নিরাপত্তা চাই, আমাদের প্রধানমন্ত্রীর মেয়ের মতো নিরাপত্তাই চাই! না হলে আকাশ-বাতাস সাক্ষী রেখে, স্রষ্টাকে সামনে রেখে, অভিশাপ দেব আমি, যে অভিশাপে পৃথিবীর সব মেয়ে একদিন প্রজাপতি হয়ে উড়ে যাবে গগনে, ফিরবে না আর এ মৃতসম মাটিতে!



