আপনি কি চোর

ছোট্ট একটি গল্প
বারিধারা থেকে লাবণ্য ফোন দিয়েছিল তার ফুপিকে, ‘ফুপি, ফুপা তো কাস্টমস অফিসার, তার মানে একজন সরকারি অফিসার।’
‘অফিসার কী রে, উচ্চপদস্থ একজন সরকারি কর্মকর্তা।’
‘মেজো চাচু?’
‘ও তো সচিবালয়ে আছে। সে-ও বড় একজন সরকারি কর্মকর্তা, সচিব।’
‘তোমার একজন মামা আছেন না, ওই যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আছেন।’
‘আছে তো, মস্ত বড় দাপুটে অফিসার। দেশের সব হাসপাতাল তো তার কথায় ওঠে-বসে।’
‘বাবার একজন চাচাতো ভাই আছেন।’
‘অ-।’ ফুপি কেড়ে নিলেন লাবণ্যর কথা, ‘বজলু ভাই। পাসপোর্ট অফিসে আছেন।’
‘তিনি কি সরকারি কর্মকর্তা?’
‘অবশ্যই।’ ফুপি একটু থেমে বললেন, ‘কিরে, এতো সরকারি কর্মকর্তার খবর নিচ্ছিস!’ ফুপি আরও একটু থামলেন। কী একটা হিসাব করে বললেন, ‘আমাদের পরিবারে কমপক্ষে এগারজন সরকারি কর্মকর্তা আছেন। ঠিকমতো হিসাব করলে আরও বেশি হতে পারে।’
ডান কান থেকে মোবাইলটা বাম কানে নিল লাবণ্য। কিছুটা দ্বিধা নিয়ে বলল, ‘এবার একটা প্রশ্ন করতে পারি তোমাকে?’
‘প্রশ্ন করবি ভালো কথা, কিন্তু এতো সংকোচ করছিস কেন?’
‘তোমাদের পরিবারের এই এগারজন সরকারি কর্মকর্তার মধ্যে চোর আছেন ঠিক কতজন?’
‘কী বললি?’ চিৎকার করে উঠলেন ফুপি।
‘চিৎকার করো না ফুপি, তুমি ঠিকই শুনেছো। কেন, তুমি জানো না— আমাদের জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ আংকেল কী বলেছেন? তিনি বলেছেন— আমাদের এই অদ্ভুত দেশ! অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তা চোর। তাই কৌতূহল আর কী— এগারজনের মধ্যে ঠিক কতজন চোর আছে আমাদের পরিবারে!’
দুটি শব্দ
কী আশ্চর্য, মাত্র দুটি শব্দের একটি অক্ষর পাল্টালেই পাল্টে যায় পুরোটা, আক্ষরিক অর্থে বদলে যায় মানেটা। শব্দ দুটি হলো— Chief এবং Thief। যথাক্রমে যাদের বাংলা মানে হচ্ছে— প্রধান এবং চোর।
ভাষার শুরুতে ইংরেজি শব্দ যারা সৃষ্টি করেছেন, সেই বিজ্ঞজনরা সম্ভবত আগেই বুঝতে পেরেছিলেন— প্রধানরাই বড় চোর। যেমন গ্রামের চেয়ারম্যান, অফিসের বড় বস, প্রজেক্টের পিডি, নির্বাচনী এলাকার এমপি, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মন্ত্রী, দেশের প্রধান শাসক ইত্যাদি। যার জন্য মাত্র একটা অক্ষরের বদলাবদলিতে নিজের পদবি পাল্টে যায়, হয়ে যায় পুরোদস্তর চোর!
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ যেমন জানেন, জানি আমরা সাধারণ মানুষরাও— পুরো একটা দেশ চালান দেশের প্রধান সরকারি কর্মকর্তারাই!
একটি রূঢ় কৌতুক
রাকিব শুনতে পেল— একটা চোর ধরা পড়েছে এলাকায়। রাকিবের বয়স চার বছর। দৌড়ে বাবার রুমে গিয়ে বলল, ‘বাবা, চোর দেখব।’
চোর দেখাতে নিয়ে গেলেন বাবা। একটা গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে চোরকে। রাকিব চোরের কাছাকাছি গিয়ে গা ছুঁয়ে কিছু একটা বোঝার চেষ্টা করল। বাবার দিকে তাকাল তারপর। কিছুটা দ্বিধা নিয়ে বলল, ‘বাবা, এতো চোর না, এটা তো মানুষ!’
চোর আছে হরেকরকম: চোর নিয়ে আমাদের প্রিয় বাংলা ভাষায়ও আছে অনেক চমৎকার কিছু জিনিস। একটি সত্যকথন— চোর না শোনে ধর্মের কাহিনি। একটি পরিচয়— চোরের মায়ের বড় গলা। একটি উপলব্ধি— চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে। একটি সতর্কতা— চোরের দশ দিন, গৃহস্থের এক দিন। একটি সম্পর্ক— চোরে চোরে মাসতুতো ভাই। একটি সাফল্য— চুরি বিদ্যা বড় বিদ্যা, যদি না পড়ে ধরা।
আমাদের দেশে চোরও আছে হরেকরকম— সিঁধেল চোর, ছিঁচকে চোর, পুকুর চোর, রিলিফ চোর, ব্যাংক চোর।
পাঁচমিশালি কিছু চোরও আছে আমাদের। তারা মসজিদের জুতা চুরি করে, আবার লুঙ্গি-গামছাও চুরি করে। পকেট চুরি করে কেউ কেউ, মুরগিও চুরি করে, গোয়াল থেকে গরুও।
বিদ্যুৎ চুরি করে কেউ, নেতাও চুরি করে কোনো কোনো দল।
চোর নিয়ে আমাদের দেশে বেশ কয়টা জনপ্রিয় গানও আছে—- চোর আমি ডাকু আমি, বল না রে..., এক চোর যায় চলে, মন চুরি করে..., চোর চোর চোর, চারিদিকে চোর...। আর নচিকেতার সেই বিখ্যাত গানটা তো আছেই— প্রতিদিন চুরি যায় মূল্যবোধের সোনা, আমাদের স্বপ্ন আমাদের চেতনা/চুরি গেছে আমাদের সব প্রতিরোধ/প্রতিদিন চুরি যায় দিনবদলের আশা/তবু চুরি যায় প্রতিবাদের ভাষা।
লালনও লিখেছেন— ধর চোর হাওয়ার ঘরে ফাঁদ পেতে, সেকি সামান্য চোরা, ধরবি কোনা কানচিতে...।
আপনি কি চোর: যদি আপনাকে প্রশ্ন করা হয়— আপনি কি চোর?
মিষ্টি হেসে আপনি নিশ্চয়ই বলবেন— অবশ্যই। বাবার পকেট থেকে চুরি, মায়ের আঁচল থেকে চুরি, ছোটখাটো আরও অনেক চুরি। আরও একটা চুরি আছে— মন চুরি। এ জীবনে কেউ না কেউ আপনার মন চুরি করেছে, আপনিও করেছেন অনেকের।
কি, বুকের ভেতর কেমন একটা করে উঠল না হঠাৎ!
এতো সব সাধারণ চোরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর চোর হচ্ছে—ভোট চোর। যার খেসারত সবাইকে দিতে হয়, কাউকে কাউকে চুরিসারে পালাতে হয় দেশ থেকে!
আর কে যেন বলেছিলেন— রাজনীতি হচ্ছে ক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদ চুরি করার একটি বৈধ প্রক্রিয়া।
সম্ভবত এজন্যই লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার ভোলাকোট ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেনের গোয়াল থেকে একটি গরু উদ্ধার করা হয় গত ১৫ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার। গরুটির মালিক হতি বেগম, যার বাড়ি ভাটরা ইউনিয়নের নলছারা জোয়ার বাড়ি, ১০ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার চুরি হয়ে গিয়েছিল এই গরুটি!
কিছু বোঝা গেল।
সহজ প্রশ্নের কঠিন উত্তর: সতের বছরের এক চোর ধরা পড়েছে এলাকায়। রব পড়ে গেছে চারপাশে। কারণ অনেক কিছু চুরি করেছে সে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি দলবল নিয়ে দেখতে গেলেন চোরটাকে, শাসন করবেন উত্তমরূপে। তরুণ চোরটার সামনে দাঁড়িয়ে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করলেন নেতা তাকে। কাছেই রাখা চুরির বিস্তর মালপত্র দেখে তিনি বললেন, ‘সবকিছই তো চুরি করিস তুই! কোনো কিছুই বাদ যায় না। কী কী জিনিস চুরি করিস না, বল তো?’
মাথা নিচু করে থাকা তরুণ চোরটি চোখ মেলল সামনে। জনপ্রতিনিধির চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দেশ চুরি করি না, দেশের সম্পদ চুরি করি না, পাচারও করি না!’



