স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত ঠিক করে দিচ্ছে কে মুক্তিযোদ্ধা: তাসনিম জারা

তাসনিম জারা
পিরোজপুরে ৮৭ বছর বয়সী বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফন নিয়ে জামায়াতের নেতাকর্মীদের অবস্থানের সমালোচনা করেছেন সাবেক এনসিপি নেত্রী তাসনিম জারা। ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি অভিযোগ করেন, জামায়াতের নেতাকর্মীরা মিছিল, মাইক ও সামাজিক মাধ্যমে ঘোষণা দিয়ে মানিক পশারীকে পিরোজপুরে দাফন করতে না দেওয়ার কথা বলেছেন। তার ভাষ্য, একজন মুক্তিযোদ্ধা ‘ভুয়া’ কি না, সেই সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বা আদালতের মাধ্যমে হওয়ার কথা থাকলেও দাফন ঠেকানোর মাধ্যমে বিষয়টির মীমাংসা করার চেষ্টা করা হয়েছে।
পোস্টে তাসনিমা জারা লেখেন, ‘আমাদের সমাজে কেউ মারা গেলে কবর খুঁড়তে কাউকে ডেকে আনতে হয় না। খবর পেয়ে পাড়ার ছেলেরা কোদাল হাতে নিজেরাই চলে আসে। কেউ বাঁশ কেটে আনে, কেউ চাটাই। মৃত মানুষের দাফনে দেরি করতে নেই, এটা শুনেই বড় হয়েছি।’
তিনি বলেছেন, ‘শনিবার সকাল ১০টার দিকে ৮৭ বছর বয়সী একজন বৃদ্ধ মানুষ, মানিক পশারী মারা গেছেন। সারা দিন তার পরিবারকে মরদেহ নিয়ে উৎকণ্ঠার সাথে অপেক্ষা করতে হয়েছে। স্থানীয় জামায়াতের নেতাকর্মীরা মিছিল করেছেন, মাইকে আর ফেসবুকে ঘোষণা দিয়েছেন, পিরোজপুরে তাকে দাফন করতে দেওয়া হবে না।’
তালেবানদের সঙ্গে ছবি তোলা মারিয়ান ঢাকায়, ঘুরছেন বস্তিতে ফুটপাতে খাচ্ছেন হালিম
২২ অক্টোবর ২০২৬
মানিক পশারীর পরিবারের পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি লিখেছেন, ‘তার জন্য বাড়িতে প্রথমে একটা কবর খোঁড়া হয়েছিল। মেয়ে সীমু আক্তার স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘কিছু মানুষ এসে তা ভরাট করে ফেলে। পরে ফুফুদের নিয়ে আমি নতুন কবর খুঁড়ি।’ পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কায় কবর খুঁড়তে আর কাউকে পাওয়া যায়নি।’
তাসনিম জারার ভাষায়, ‘যে কোদাল পাড়ার ছেলেদের হাতে থাকার কথা, সেদিন তা ছিল মৃত ব্যক্তির মেয়ে আর বোনেদের হাতে।’
দাফনের সময়ের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, ‘অবশেষে রাত ২টার দিকে পুলিশ পাহারায়, মেয়ে আর বোনেদের খোঁড়া সেই কবরে ওনার দাফন হয়েছে। প্রশাসনের লোকজন ছাড়া পরিবারের বাইরের আর কেউ সেখানে ছিলেন না।’
মানিক পশারী সরকারি গেজেটভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন উল্লেখ করে তাসনিমা জারা লেখেন, ‘এই বৃদ্ধ মানুষটি একজন সরকারি গেজেটভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা। পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি সেদিন বলেছেন, মানিক পশারী ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা; তাকে গার্ড অব অনার দিতে দেওয়া হবে না, পিরোজপুরের মাটিতে দাফনও করতে দেওয়া হবে না। দাফনের পর সেই একই নেতা বলেছেন, জামায়াতের নেতারা লাশের রাজনীতি করেন না।’
মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রসঙ্গে তাসনিম জারা বলেছেন, ‘মানিক পশারী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কি না, সেই প্রশ্ন আপনি চাইলে তুলতে পারেন। তোলার জায়গাও আছে। যাচাইয়ের জন্য রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান আছে, আদালত আছে। কিন্তু জামায়াতের নেতাকর্মীরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সেই প্রশ্নের মীমাংসা তারা করবেন দাফন করা ঠেকিয়ে দিয়ে, মাইক হাতে নিয়ে।’
মৃত ব্যক্তির জানাজা ও ক্ষমা চাওয়ার সামাজিক রীতির কথা তুলে ধরে তিনি লেখেন, ‘আমাদের দেশে জানাজার আগে মৃতের ছেলে বা ভাই সবার সামনে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আমার আব্বা যদি কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকেন, মাফ করে দেবেন।’ আমরা মাফ করে দিই। কারণ মৃত্যুর পর মানুষের সব হিসাব-নিকাশ শেষ। যা বাকি থাকে, তার বিচার আল্লাহর হাতে। শনিবার পিরোজপুরে জামায়াতের নেতাকর্মীরা অন্য পথে হেঁটেছেন। নিজের গ্রামে মানিক পশারীর জানাজাটুকুও হয়নি। গ্রামের মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে মাফ চাওয়ার সুযোগটুকুও পায়নি তার পরিবার।’
দাফন নিয়ে দেওয়া বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি লেখেন, ‘মানিক পশারীর ‘দাফন পিরোজপুরে হতে দেওয়া হবে না’ এ কথাটা জামায়াতের নেতাকর্মীরা এমনভাবে বলেছেন, যেন এই মাটির দলিল ওনাদের নামে লেখা। যেন একজন মানুষ নিজের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে শুয়ে থাকবেন কি না, সেই অনুমতিও তাদের কাছ থেকে নিতে হবে। ওনাদেরকে একসময় একই ভাষায় বলা হতো, ‘জামাত-শিবির রাজাকার, এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়।’ এটা যে কেমন অন্যায় কথা, সেটা ওনাদের ভালোই জানার কথা। কিন্তু ক্ষমতা একটু হাতে আসার সাথে সাথেই বিরোধী দলে থাকতেই সেটা ভুলে গেছেন।’
জামায়াতের ঐতিহাসিক অবস্থান প্রসঙ্গে তাসনিমা জারা লেখেন, ‘একাত্তরে জামায়াত দল হিসেবে স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। সেই দলের নেতাকর্মীরা আজ ঠিক করে দিতে চাইছেন কে মুক্তিযোদ্ধা আর কে ভুয়া, কে রাষ্ট্রীয় সম্মান পাবেন আর কার কবর কোথায় হবে। নিজেদের নেতাদের ক্ষেত্রে জামায়াত ন্যায় বিচার, মানবাধিকার, ডিউ প্রোসেস আর মানবিক মর্যাদার কথা বলেন। কিন্তু অন্যদের ক্ষেত্রে সেটা করতে নারাজ।’
তিনি আরও লেখেন, ‘ভোটের আগে আর বক্তৃতায় ইনসাফের কথা বলেন। কিন্তু একজন মৃত মানুষের সাথে ও তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সাথে এমন আচরণ করেন। বিরোধী দলে থাকতেই নিজের বসতভিটায় কবর দিতে বাধা দিচ্ছেন, রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতা ওনাদের হাতে গেলে কী করবেন?’






