চাটুকারদের বিষয়ে নবীজির কঠোর সতর্কবার্তা

প্রতীকী ছবি
মানুষ প্রশংসা ভালোবাসে। সৎ কাজের স্বীকৃতি মানুষকে অনুপ্রাণিত করে, সম্পর্ককে দৃঢ় করে এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টি করে। কিন্তু প্রশংসা যখন সত্যের সীমা অতিক্রম করে স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন তা আর গুণ থাকে না, বরং ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়। চাটুকারিতা সত্যকে আড়াল করে, অন্যায়কে বৈধতা দেয়, শাসক ও নেতাদের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে এবং ব্যক্তির মধ্যে অহংকার ও আত্মপ্রবঞ্চনার জন্ম দেয়। ইতিহাসে বহু ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের পতনের পেছনে এই চাটুকার সংস্কৃতির ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাই ইসলাম যেমন সত্যভিত্তিক প্রশংসাকে অনুমোদন করেছে, তেমনি অতিরঞ্জিত ও স্বার্থান্বেষী প্রশংসার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত শক্ত ভাষায় সতর্ক করে বলেছেন,
إِذَا رَأَيْتُمُ الْمَدَّاحِينَ فَاحْثُوا فِي وُجُوهِهِمُ التُّرَابَ
‘যখন তোমরা চাটুকার বা অতিরিক্ত প্রশংসাকারীদের দেখবে, তখন তাদের মুখে মাটি নিক্ষেপ করো।’ (মুসলিম, হাদিস : ৩০০২)
এই হাদিসে المدّاحين (আল-মাদ্দাহীন) বলতে সাধারণ প্রশংসাকারীকে বোঝানো হয়নি। ইমাম নববী (রহ.) বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সেই ব্যক্তি, যে মানুষের সামনে অতিরঞ্জিত প্রশংসা করে, মিথ্যা বলে অথবা দুনিয়াবি স্বার্থ হাসিলের জন্য চাটুকারিতা করে। (শারহু সহিহ মুসলিম)
হাদিসে ‘মুখে মাটি নিক্ষেপ করো’ কথাটি মূলত চাটুকারিতার প্রতি কঠোর ঘৃণা ও নিরুৎসাহ প্রকাশের ভাষা। অধিকাংশ মুহাদ্দিস ও ভাষাবিদ উল্লেখ করেছেন, এটি সব সময় আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করার নির্দেশ নয়; বরং এমন আচরণকে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করার শিক্ষা। ইমাম নববী (রহ.) বলেন, এর উদ্দেশ্য চাটুকারদের নিরুৎসাহিত করা এবং তাদের কর্মকাণ্ডকে গুরুত্ব না দেওয়া।
অন্য একটি হাদিসে এসেছে- আবূ বকরাহ (রা.) হতে বর্ণিত যে, নবী (সা.)-এর সম্মুখে এক ব্যক্তির আলোচনা হল। তখন এক লোক তার খুব প্রশংসা করলো। নবী (সা.) বললেন, আফসোস তোমার জন্য! তুমি তো তোমার সঙ্গীর গলা কেটে ফেললে। এ কথাটি তিনি কয়েকবার বললেন। (তারপর তিনি বললেন) যদি কারো প্রশংসা করতেই হয়, তবে সে যেন বলে, আমি তার ব্যাপারে এমন, এমন ধারণা পোষণ করি, যদি তার এরূপ হবার কথা মনে করা হয়। তার প্রকৃত হিসাব গ্রহণকারী তো হলেন আল্লাহ, আর আল্লাহর তুলনায় কেউ কারো পবিত্রতা বর্ণনা করবে না।’ (বুখারি, হাদিস : ৬০৬১)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, এমন প্রশংসা যা মানুষের মনে আত্মতুষ্টি, অহংকার বা আত্মঅহমিকা সৃষ্টি করে, তা ইসলামে অপছন্দনীয়।
পবিত্র কোরআনও অহংকার ও আত্মপ্রশংসা থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
فَلَا تُزَكُّوا أَنْفُسَكُمْ ۖ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنِ اتَّقَى
‘তোমরা নিজেদের পবিত্র বলে দাবি করো না। কে প্রকৃত মুত্তাকি, তিনি তা ভালোভাবেই জানেন।’ (সুরা নাজম, আয়াত : ৩২)
আজকের সমাজে চাটুকারিতার রূপ আরও বহুমাত্রিক। রাজনৈতিক অঙ্গন, প্রশাসন, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেক সময় ব্যক্তিপূজা ও অন্ধ প্রশংসার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। কেউ ক্ষমতার নৈকট্য লাভের জন্য, কেউ আর্থিক সুবিধার আশায়, আবার কেউ ব্যক্তিগত স্বার্থে সত্য গোপন করে প্রশংসার ফুলঝুরি ছড়ায়। এতে ভুল সিদ্ধান্ত সংশোধনের সুযোগ নষ্ট হয়, দুর্নীতি উৎসাহিত হয় এবং যোগ্যতার পরিবর্তে তোষামোদ মূল্যায়নের মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়।
তবে ইসলাম ন্যায্য ও সত্যভিত্তিক প্রশংসাকে নিরুৎসাহিত করেনি। কোনো মানুষের ভালো কাজের স্বীকৃতি দেওয়া, তাকে উৎসাহিত করা এবং তার গুণাবলি বাস্তবতার আলোকে তুলে ধরা বৈধ। নিষিদ্ধ হলো মিথ্যা, অতিরঞ্জন এবং স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে করা চাটুকারিতা।
একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি সত্য কথা বলবেন, প্রয়োজন হলে সম্মান বজায় রেখে গঠনমূলক সমালোচনাও করবেন। তিনি কারও সন্তুষ্টির জন্য সত্য গোপন করবেন না এবং দুনিয়ার লাভের আশায় মিথ্যা প্রশংসায় লিপ্ত হবেন না।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই বাণীতে খুব পরিষ্কারভাবে প্রমাণিত হয় যে, চাটুকারিতা ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। যে সমাজে সত্যবাদী উপদেষ্টার চেয়ে চাটুকারের কদর বেশি, সেখানে ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও সুশাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই একজন মুসলমানের কর্তব্য হলো সত্যভিত্তিক মূল্যায়ন করা, মিথ্যা প্রশংসা থেকে বিরত থাকা এবং এমন সংস্কৃতি গড়ে তোলা, যেখানে মানুষের মর্যাদা নির্ধারিত হবে সততা, যোগ্যতা ও তাকওয়ার ভিত্তিতে, চাটুকারিতার ভিত্তিতে নয়।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক
saifpas352@gmail.com




