ইস্তিগফারের অপরিসীম ফজিলত

প্রতীকী ছবি
মানুষ মাত্রই ভুল করে। কখনো প্রবৃত্তির তাড়নায়, কখনো শয়তানের প্ররোচনায়, আবার কখনো অসতর্কতায় মানুষ গুনাহে জড়িয়ে পড়ে। তবে মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো, সে গুনাহের ওপর অবিচল থাকে না; বরং নিজের ভুল উপলব্ধি করে আল্লাহ তাআলার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। ইসলামের পরিভাষায় এই ক্ষমা প্রার্থনাকেই বলা হয় ইস্তিগফার। ইস্তিগফার শুধু মুখের উচ্চারণ নয়; বরং অনুতপ্ত হৃদয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে আসা এবং পাপ থেকে মুক্ত থাকার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করার নাম।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَ مَنۡ یَّعۡمَلۡ سُوۡٓءًا اَوۡ یَظۡلِمۡ نَفۡسَهٗ ثُمَّ یَسۡتَغۡفِرِ اللّٰهَ یَجِدِ اللّٰهَ غَفُوۡرًا رَّحِیۡمًا
‘আর যে মন্দ কাজ করে অথবা নিজের প্রতি জুলুম করে, অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু পাবে।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১১০)
গুনাহের পর অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে আসা মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তওবার জন্য গুনাহ পরিত্যাগ, অনুতাপ এবং পুনরায় সেই গুনাহ না করার সংকল্প জরুরি। অন্যের অধিকার নষ্ট করা হলে তা ফিরিয়ে দেওয়া বা যথাযথভাবে মিটিয়ে দেওয়াও আবশ্যক।
ইস্তিগফারের গুরুত্ব সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
وَاللَّهِ إِنِّي لَأَسْتَغْفِرُ اللَّهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ فِي الْيَوْمِ أَكْثَرَ مِنْ سَبْعِينَ مَرَّةً
‘আল্লাহর শপথ! আমি প্রতিদিন সত্তরেরও বেশি বার আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং তাঁর কাছে তওবা করি।’ (বুখারি, হাদিস: ৬৩০৭)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই আমল উম্মতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। তিনি নিয়মিত ইস্তিগফার করতেন, অথচ তাঁর অতীত ও ভবিষ্যতের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়ার কথা কোরআনে উল্লেখ রয়েছে। তাই ইস্তিগফার শুধু গুনাহ মোচনের উপায় নয়; এটি আল্লাহর প্রতি বিনয়, কৃতজ্ঞতা ও আনুগত্য প্রকাশেরও মাধ্যম।
ইস্তিগফারের বিশেষ সময় হলো রাতের শেষ তৃতীয়াংশ। পবিত্র কোরআনে মুত্তাকিদের গুণাবলি বর্ণনা করে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَالْمُسْتَغْفِرِينَ بِالْأَسْحَارِ
‘আর তারা শেষ রাতে ক্ষমা প্রার্থনা করে।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৭)
এ সময়ের মর্যাদা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
مَنْ يَسْتَغْفِرُنِي فَأَغْفِرَ لَهُ
‘কে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব।’ (বুখারি, হাদিস: ১১৪৫)
রাতের নীরবতায় একনিষ্ঠ হৃদয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার এই সুযোগকে সালাফে সালেহিন বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। তাফসিরে ইবনে কাসিরে সুরা আলে ইমরানের ১৭ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় তাদের কয়েকজনের আমলের উল্লেখ রয়েছে।
আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) রাতে নফল নামাজ আদায় করতেন। এরপর তার খাদেম নাফিকে জিজ্ঞেস করতেন, ‘সাহরির সময় হয়েছে কি?’ নাফি যখন জানাতেন যে সাহরির সময় হয়েছে, তখন থেকে সুবহে সাদিক পর্যন্ত তিনি দোয়া ও ইস্তিগফারে মশগুল থাকতেন। (তাফসিরে ইবনে কাসির, সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৭-এর তাফসির)
একই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবরাহিম ইবনে হাতিব তার পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, একদিন সাহরির সময় তিনি মসজিদের এক কোণে একজনকে দোয়া করতে শুনলেন। তিনি বলছিলেন, ‘হে আল্লাহ, আপনি আদেশ করেছেন, আমি তা পালন করেছি। এখন সাহরির সময়, অতএব আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিন।’ পরে কাছে গিয়ে তিনি দেখতে পান, দোয়াকারী ব্যক্তি ছিলেন বিশিষ্ট সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)। (তাফসিরে ইবনে কাসির, সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৭-এর তাফসির)
এই বর্ণনাগুলো থেকে বোঝা যায়, সালাফে সালেহিনের কাছে রাতের শেষাংশ ছিল আত্মসমালোচনা, অনুতাপ ও আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার বিশেষ সময়। তাঁরা শুধু ইবাদতের বাহ্যিক রূপেই মনোযোগী ছিলেন না; বরং নিজেদের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার প্রতিও ছিলেন যত্নশীল।
ইস্তিগফারের গুরুত্ব সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে নুহ (আ.)-এর বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে,
فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا
‘আমি বলেছি, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি মহাক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টিধারা বর্ষণ করবেন।’ (সুরা নুহ, আয়াত: ১০-১১)
অতএব, ইস্তিগফারকে শুধু বিপদে পড়লে কিংবা গুনাহ করার পরের আমল হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। প্রতিদিনের জীবনে নিয়মিত ইস্তিগফারের অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। নিজের ভুল স্বীকার, অন্যের অধিকার রক্ষা এবং আল্লাহর আনুগত্যে ফিরে আসার মধ্য দিয়েই ইস্তিগফারের প্রকৃত তাৎপর্য প্রকাশ পায়। রাতের শেষাংশে কিছু সময় আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনায় ব্যয় করা হতে পারে আত্মশুদ্ধির এক মূল্যবান সুযোগ।
মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে তাওফিক দান করুন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



