অফিসের টেবিলেও তাকওয়া প্রয়োজন

প্রতীকী ছবি
সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অফিসের টেবিল ঘিরেই কাটে অনেক মানুষের জীবনের দীর্ঘ একটি সময়। সামনে কম্পিউটার, পাশে ফাইল, হাতে দায়িত্ব। কখনো মানুষের সেবা, কখনো হিসাব-নিকাশ, কখনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ। এভাবেই কর্মজীবিরা যে যার অফিসের চাহিদা অনুযায়ী কাজ করে যান। কাজেই অফিসের এই টেবিলটি শুধু জীবিকা উপার্জনের জায়গা নয়, এটি একজন মানুষের আমানতদারিরও বড় একটি ক্ষেত্র। কারণ কর্মক্ষেত্রে আমরা যতটুকু দায়িত্ব পালন করি, তার প্রতিটি মুহূর্তই আল্লাহর নজরের মধ্যে।
তাকওয়া মানে শুধু মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়া কিংবা ধর্মীয় আচার পালন করা নয়। তাকওয়া হলো জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহকে ভয় করে চলা। অফিসের টেবিলে বসেও একজন মুসলিমের মনে থাকা উচিত, আমি যে সময়ের বিনিময়ে বেতন নিচ্ছি, সেটিও একটি আমানত। যে দায়িত্ব আমার ওপর অর্পিত হয়েছে, সেটিও একটি আমানত। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন, তোমরা আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দাও।’ (সুরা নিসা, আয়াত :৫৮)
কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনে অবহেলা শুধু পেশাগত দুর্বলতা নয়, এটি ইসলামের আমানতনীতিরও পরিপন্থী। অফিসে নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত না হয়ে বেতন নেওয়া, কাজ ফেলে ব্যক্তিগত কাজে সময় কাটানো, দায়িত্বে গাফিলতি করা কিংবা প্রতিষ্ঠানের সম্পদ নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করা একজন মুমিনের চরিত্রের সঙ্গে যায় না। কারণ বেতন শুধু উপস্থিত থাকার জন্য নয়, যথাযথ দায়িত্ব পালনের জন্য।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (বুখারি, হাদিস : ৭১৩৮) এই হাদিসটি কর্মজীবনের জন্যও গভীর একটি নীতি। একজন কর্মকর্তা তার অধীনস্থদের ব্যাপারে জবাবদিহির মুখোমুখি হবেন, একজন কর্মচারী তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন।
অফিসের টেবিলে তাকওয়ার আরেকটি বড় পরীক্ষা হলো ঘুষ ও স্বজনপ্রীতি। কোনো ফাইল দ্রুত এগিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ নেওয়া, যোগ্য ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে পরিচিত কাউকে সুযোগ দেওয়া, প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগত স্বার্থে প্রভাবিত করা, এগুলো শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, মানুষের অধিকার নষ্ট করারও নাম। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না এবং তা বিচারকদের কাছে পেশ করো না, যাতে জেনে-শুনে মানুষের সম্পদের কোনো অংশ অন্যায়ভাবে গ্রাস করতে পারো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৮)
একজন কর্মীর সততা তখনই সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায়, যখন তার অসততার সুযোগ আছে কিন্তু সে তা গ্রহণ করে না। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেখছেন না, ক্যামেরা নেই, হিসাব যাচাই হওয়ার সম্ভাবনাও কম, তবু সে অন্যায় করে না। কারণ তার কাছে অফিসের সিসিটিভির চেয়ে আল্লাহর নজর বড়। এই বিশ্বাসই মানুষকে প্রকৃত অর্থে বিশ্বস্ত করে তোলে।
কাজের মানের ক্ষেত্রেও তাকওয়া প্রয়োজন। দায়িত্বটি ছোট হোক বা বড়, মানুষের কাজ হোক বা প্রতিষ্ঠানের, মুমিন চেষ্টা করবে তা সর্বোত্তমভাবে সম্পন্ন করতে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ পছন্দ করেন, তোমাদের কেউ যখন কোনো কাজ করে, সে যেন তা সুচারুরূপে করে।’ (বায়হাকি, শুআবুল ঈমান, হাদিস : ৪৯২৯)। এই বাণী কর্মজীবনে দায়িত্বশীলতা ও উৎকর্ষের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়।
আমরা অনেক সময় মনে করি, তাকওয়া মানে কর্মব্যস্ত পৃথিবী থেকে নিজেকে আলাদা করে নেওয়া। অথচ ইসলামের শিক্ষা সম্পূর্ণ বিপরীত। একজন মুসলিমের তাকওয়া তার নামাজের জায়নামাজে যেমন প্রকাশ পাবে, তেমনি অফিসের টেবিলেও প্রকাশ পাবে; মসজিদের ভেতরে যেমন তাকওয়া দেখা যাবে, হিসাবের খাতাতেও তেমনি তাকওয়া পরিলক্ষিত হবে।
দিন শেষে অফিসের দরজা বন্ধ হয়ে যাবে, কম্পিউটার বন্ধ হবে, ফাইল তুলে রাখা হবে। কিন্তু আমাদের কাজের হিসাব বন্ধ হবে না। তাই কর্মজীবনে সবচেয়ে নিরাপদ পরিচয় হতে পারে একটিই: আমি একজন আমানতদার মানুষ। কারণ আমার নিয়োগকর্তা হয়তো আমাকে না দেখলেও মহান আল্লাহ কিন্তু সবসময় দেখছেন।
মাহন আল্লাহ আমাদের সকলকে নিজ নিজ দায়িত যথাযথ পালন করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক





