মসজিদমুখী হৃদয় গঠনের উপায়
- মসজিদকে বলা হয় মুমিনের রূহের হাসপাতাল। মসজিদে যাওয়ার পর গুনাহের ক্ষতগুলো সিজদার পরশে আরোগ্য লাভ করে। এখানে দুনিয়াবী পেরেশানি ছাপিয়ে এক অনাবিল জান্নাতী প্রশান্তি হৃদয়কে সিক্ত করে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে অবস্থিত শেখ জায়েদ গ্র্যান্ড মসজিদ
দুনিয়ার ব্যস্ততা, কর্মচাঞ্চল্য ও নানামুখী প্রলোভনের ভিড়ে মানুষের হৃদয় অনেক সময় আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরে যায়। অথচ একজন মুমিনের প্রকৃত প্রশান্তি লুকিয়ে আছে আল্লাহর ঘর মসজিদে। কিয়ামতের দিন যে সাত শ্রেণির মানুষ আল্লাহর আরশের ছায়া লাভ করবে, তাদের অন্যতম হলো সেই ব্যক্তি, যার অন্তর মসজিদের সঙ্গে ঝুলন্ত থাকে (বুখারি, হাদিস : ৬৬০; মুসলিম, হাদিস : ১০৩১)।
মসজিদকে বলা হয় মুমিনের রূহের হাসপাতাল। মসজিদে যাওয়ার পর গুনাহের ক্ষতগুলো সিজদার পরশে আরোগ্য লাভ করে। এখানে দুনিয়াবী পেরেশানি ছাপিয়ে এক অনাবিল জান্নাতী প্রশান্তি হৃদয়কে সিক্ত করে। নানান কোলাহলের ভিড়ে মুয়াজ্জিনের সুমধুর আযানের ধ্বনি মূলত দিগভ্রান্ত বান্দাকে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার আহবান জানায়। এই মসজিদের সাথে কীভাবে সম্পৃক্ততা বাড়ানো যায়; কীবাবে নিজের অন্তরকে মসজিদ মুখি করা যায়; তাই আজকের প্রবন্ধে আমার আলোচনার বিষয়।
মসজিদমুখী হওয়ার প্রথম উপায় হলো মসজিদের মর্যাদা ও ফজিলত সম্পর্কে জানা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় স্থান হলো মসজিদসমূহ’। (মুসলিম, হাদিস : ৬৭১) মসজিদ কেবল নামাজের স্থান নয়; এটি আল্লাহর ঘর, রহমত ও প্রশান্তির কেন্দ্র। যে ব্যক্তি ওজু করে মসজিদে আসে, সে আল্লাহর মেহমান হিসেবে গণ্য হয় (তাবারানি, আল-মুজামুল কাবির, হাদিস : ৬১৩৯)।
দ্বিতীয় উপায়, জামাআতে নামাজের বিপুল সওয়াব সম্পর্কে চিন্তা করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জামাআতে আদায়কৃত নামাজ একাকী নামাজের চেয়ে সাতাশ গুণ বেশি মর্যাদাপূর্ণ।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৪৫; মুসলিম, হাদিস : ৬৫০)। মাত্র কয়েক মিনিট অতিরিক্ত সময় ব্যয় করে একজন মুসলিম প্রতিদিন অগণিত নেকি অর্জন করতে পারে।
তৃতীয় উপায়, ছোট ছোট পদক্ষেপ দিয়ে শুরু করা। শুরুতেই পাঁচ ওয়াক্ত জামাআতে নামাজ আদায়ের সংকল্প কঠিন মনে হলে অন্তত ফজর ও এশার নামাজ দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। কারণ এই দুই নামাজ মুনাফিকদের জন্য সবচেয়ে ভারী (বুখারি, হাদিস : ৬৫৭)। ধীরে ধীরে নিয়মিত হতে থাকলে এক সময় মসজিদমুখী জীবন সহজ হয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে কম হয়’ (বুখারি, হাদিস : ৬৪৬৪; মুসলিম, হাদিস : ৭৮৩)।
চতুর্থ উপায়, মসজিদের পরিবেশকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করা। মসজিদে অবস্থানকারী বান্দার প্রতি আল্লাহ বিশেষ সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নামাজ ও জিকিরের জন্য মসজিদকে আপন ঠিকানা বানায়, আল্লাহ তার আগমনে ততটাই আনন্দিত হন, যতটা দীর্ঘদিন পর প্রিয়জন ফিরে এলে পরিবার আনন্দিত হয়।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৮০০)।
পঞ্চম উপায়, আযান শোনার সঙ্গে সঙ্গে সাড়া দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলা। আযানকে শুধু একটি ধ্বনি নয়, বরং আল্লাহর সরাসরি আহ্বান হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। সালাফদের জীবনে দেখা যায়, তারা আযান শোনামাত্র দুনিয়ার সব কাজ স্থগিত করে মসজিদের দিকে ছুটে যেতেন।
ষষ্ঠ উপায়, মসজিদে যাওয়ার জন্য সুন্দর প্রস্তুতি নেওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘হে আদম সন্তান! তোমরা প্রত্যেক নামাজের সময় তোমাদের সৌন্দর্য গ্রহণ করো।’ (সুরা আ'রাফ, আয়াত : ৩১)। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক, সুগন্ধি এবং সুন্দর ওজু মসজিদমুখী হওয়ার আগ্রহ বৃদ্ধি করে।
সপ্তম উপায়, অলসতাকে প্রশ্রয় না দেওয়া। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘আল্লাহর মসজিদসমূহ তো তারাই আবাদ করে, যারা আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে, নামাজ কায়েম করে এবং আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করে না।’ (সুরা তাওবা আয়াত : ১৮)। মসজিদের সঙ্গে সম্পর্ক ঈমানের শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
অষ্টম উপায়, মসজিদমুখী বন্ধু নির্বাচন করা। সৎ সঙ্গ মানুষের জীবন বদলে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তুমি নিজেকে তাদের সঙ্গেই রাখো, যারা সকাল-সন্ধ্যা তাদের রবকে ডাকো।’ (সুরা কাহফ, আয়াত : ২৮)। একজন ভালো বন্ধু আযানের সময় স্মরণ করিয়ে দিতে পারে, অলসতা দূর করতে পারে এবং মসজিদের পথে সঙ্গী হতে পারে।
নবম উপায় , মসজিদের শিক্ষা ও সেবামূলক কার্যক্রমে অংশ নেওয়া। দ্বীনি আলোচনা, কোরআন শিক্ষা কিংবা মসজিদের খেদমতে অংশগ্রহণ মানুষের অন্তরে মসজিদের প্রতি গভীর ভালোবাসা সৃষ্টি করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি দ্বীনি জ্ঞান অর্জন বা শিক্ষা দেওয়ার জন্য মসজিদে যায়, সে পূর্ণ হজের সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করে (তাবারানি, আল-মুজামুল কাবির, হাদিস : ৭৪৭৩)।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, মসজিদ শুধু একটি ভবন নয়; এটি মুমিনের আত্মিক আশ্রয়স্থল। মসজিদের সঙ্গে সম্পর্ক যত গভীর হবে, আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কও তত দৃঢ় হবে। তাই আযানের ধ্বনি কানে পৌঁছামাত্র আমাদের হৃদয় যেন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। দুনিয়ার কোনো ব্যস্ততা, অলসতা বা মোহ যেন আমাদের আল্লাহর ঘর থেকে দূরে রাখতে না পারে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মসজিদমুখী বান্দা হিসেবে কবুল করুন। আমিন।
লেখক: শিক্ষার্থী, এন আকন্দ কামিল মাদরাসা, নেত্রকোনা।




