দোয়া কবুলের পথে যেসব বাধা

প্রতীকী ছবি
দোয়া মুমিনের জীবনে এক অনন্য ইবাদত। এটি শুধু বিপদে পড়ে আল্লাহর কাছে কিছু চাওয়ার নাম নয়; বরং বান্দার অসহায়ত্ব, নির্ভরতা, আশা ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থার প্রকাশ। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন- ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।’ (সুরা গাফির, আয়াত : ৬০) অন্য এক আয়াতে বলা হয়েছে- ‘আর যখন আমার বান্দারা আমার সম্পর্কে তোমাকে জিজ্ঞেস করে, আমি তো নিকটেই আছি। আহ্বানকারী যখন আমাকে আহ্বান করে, আমি তার আহ্বানে সাড়া দিই।’ (সুরা বাকারা, আয়অত : ১৮৬) যাতে প্রমাণিত হয় যে, একজন মুমিন বান্দার জীবনে দোয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়।
তবে দোয়া কবুলের বিষয়টি কেবল মুখে প্রার্থনা করার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বান্দার উপার্জন, খাদ্য-পানীয়, জীবনাচরণ, অন্তরের অবস্থা এবং দোয়ার প্রতি তার ধৈর্য ও বিশ্বাসও এর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। কখনো দোয়া কবুলে বিলম্ব হয়, কখনো বান্দা যা চায় তা না দিয়ে তার পরিবর্তে অন্য কোনো কল্যাণ দেওয়া হয়, আবার কখনো দোয়ার কারণে বিপদ দূর করা হয়। তাই দোয়া কবুল হয়নি মনে করে হতাশ হওয়ার আগে নিজের জীবন ও দোয়ার পদ্ধতি পর্যালোচনা করা জরুরি। একই সঙ্গে কিছু কাজ ও অভ্যাস সম্পর্কে কোরআন-হাদিসে সতর্ক করা হয়েছে, যেগুলো দোয়া কবুলের পথে অন্তরায় হতে পারে।
এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো হারাম উপার্জন ও হারাম খাদ্য-পানীয়। মানুষের খাদ্য যেমন তার শরীর গঠনে ভূমিকা রাখে, তেমনি তার হালাল-হারামের বিষয়টি ঈমানি জীবন ও ইবাদতের ওপরও প্রভাব ফেলে। সুদ, ঘুষ, প্রতারণা, চুরি, আত্মসাৎ কিংবা অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে খাদ্য, পোশাক ও জীবনযাপন করলে তা মুমিনের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া গ্রহণ করেন না।’ এরপর তিনি এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেন, যে দীর্ঘ সফর করেছে, এলোমেলো চুল ও ধুলায় ধূসরিত শরীর নিয়ে আকাশের দিকে হাত তুলে ‘হে আমার রব, হে আমার রব’ বলে দোয়া করছে; কিন্তু তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং তার শরীর হারাম দ্বারা গঠিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তাহলে তার দোয়া কীভাবে কবুল হবে?’ (মুসলিম, হাদিস : ১০১৫)
হাদিসটি দোয়া কবুলের ক্ষেত্রে হালাল উপার্জন ও পবিত্র জীবনের গুরুত্ব অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। শুধু দোয়ার সময় হাত তোলা যথেষ্ট নয়, বরং সেই হাতের উপার্জনও পবিত্র হতে হবে; মুখের আহারও হতে হবে হালাল। একজন মানুষ দীর্ঘ সফর করে, বিনয়ের সঙ্গে দোয়া করে, বাহ্যিকভাবে দোয়া কবুলের নানা অনুকূল অবস্থাতেও থাকে; কিন্তু তার জীবন যদি হারাম উপার্জনে পরিপূর্ণ হয়, তাহলে সেটি দোয়া কবুলের পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অন্তরায় হলো সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করার দায়িত্ব পরিত্যাগ করা। ইসলাম ব্যক্তিগত ইবাদতের পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ব পালনেরও শিক্ষা দেয়। অন্যায় দেখে নীরব থাকা, সমাজে অনৈতিকতা ছড়িয়ে পড়তে দেওয়া এবং নিজের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও মানুষকে ভালো কাজে উৎসাহিত না করা মুসলিমের দায়িত্ববোধের ঘাটতি তৈরি করে।
হুযাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা অবশ্যই সৎকাজের আদেশ করবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে; তা না হলে অচিরেই আল্লাহ তোমাদের ওপর তাঁর পক্ষ থেকে শাস্তি পাঠাবেন। তখন তোমরা তাঁর কাছে দোয়া করবে, কিন্তু তোমাদের দোয়া কবুল করা হবে না।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২১৬৯)
অর্থাৎ একজন ব্যক্তি নিজের জন্য কল্যাণ কামনা করবে, কিন্তু সমাজের অন্যায়-অবিচার সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন থাকবে, এমন মানসিকতা ইসলামের সামগ্রিক শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অবশ্য সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করার ক্ষেত্রেও জ্ঞান, প্রজ্ঞা, সামর্থ্য ও শরিয়তসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে।
দোয়া কবুলের আরেকটি বড় অন্তরায় হলো দোয়া করে তাড়াহুড়ো করা। অনেকেই কয়েক দিন, কয়েক সপ্তাহ কিংবা কয়েক মাস দোয়া করার পর মনে করেন, ‘আমি তো অনেক দোয়া করলাম, কিন্তু কিছুই হলো না।’ এরপর তিনি দোয়া ছেড়ে দেন। অথচ এমন হতাশা রাসুলুল্লাহ (সা.) নিষেধ করেছেন।
আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, ‘বান্দার দোয়া কবুল হতে থাকে, যতক্ষণ সে কোনো গুনাহ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার দোয়া না করে এবং তাড়াহুড়ো না করে।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘তাড়াহুড়ো কী?’ তিনি বললেন, ‘সে বলে, আমি দোয়া করেছি, কিন্তু আমার দোয়া কবুল হতে দেখলাম না। এরপর সে ক্লান্ত ও নিরাশ হয়ে দোয়া ছেড়ে দেয়।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৭৩৫)
এখানে তাড়াহুড়ো বলতে দ্রুত ফল পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা বোঝানো হয়নি; বরং দোয়া করে ফল না পাওয়ায় আল্লাহর রহমত সম্পর্কে হতাশ হয়ে দোয়া পরিত্যাগ করাকে বোঝানো হয়েছে। কারণ বান্দা তার জন্য কোন সময়, কোন পদ্ধতিতে এবং কোন জিনিসে প্রকৃত কল্যাণ রয়েছে তা সবসময় জানে না। আল্লাহ সব জানেন। তাই দোয়ার সঙ্গে ধৈর্য ও আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর আস্থা থাকা জরুরি।
কোরআনে মানুষের তাড়াহুড়োপ্রবণতার কথাও এসেছে, ‘মানুষ অকল্যাণের জন্যও সেভাবেই দোয়া করে, যেভাবে সে কল্যাণের জন্য দোয়া করে; মানুষ তো অতিশয় তাড়াহুড়োপ্রবণ।’ (সুরা বণী ইসরাঈল, আয়াত : ১১) তাই দোয়া করার পর ফলাফল নিজের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী না আসায় হতাশ না হয়ে বান্দার উচিত দোয়া অব্যাহত রাখা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করা।
অন্তরের উদাসীনতাও দোয়ার গুরুত্বপূর্ণ একটি অন্তরায়। দোয়া শুধু জিহ্বার উচ্চারণ নয়; এর সঙ্গে অন্তরের উপস্থিতি ও আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস জড়িত। মানুষ মুখে দোয়া করছে, কিন্তু অন্তর অন্য চিন্তায় ব্যস্ত; কী চাইছে, কার কাছে চাইছে এবং যিনি দিচ্ছেন তাঁর প্রতি তার আস্থা কতটুকু, সে বিষয়ে কোনো অনুভূতি নেই, তাহলে দোয়ার প্রকৃত রূহ দুর্বল হয়ে যায়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহকে এমন অবস্থায় ডাকো যে, তোমরা কবুল হওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস রাখবে। আর জেনে রাখো, আল্লাহ এমন অন্তরের দোয়া কবুল করেন না, যে অন্তর উদাসীন ও অমনোযোগী।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৪৭৯)
তাই দোয়ার সময় নিজের মনকে একত্র করা, অর্থ বোঝা, বিনয়ী হওয়া এবং আল্লাহর ক্ষমতা ও দয়ার ওপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখা প্রয়োজন। দোয়ার শব্দ যত সুন্দরই হোক, অন্তর যদি তার বিপরীতে থাকে, তাহলে দোয়ার উদ্দেশ্য ও আধ্যাত্মিক সৌন্দর্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, দোয়া কবুল হওয়া মানেই বান্দা যা চেয়েছে ঠিক সেটিই এবং ঠিক সেই সময়েই পাওয়া নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে দোয়া করলে এবং তাতে গুনাহ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয় না থাকলে আল্লাহ তাকে তিনটির একটি দান করেন: তার দোয়া কবুল করেন, অথবা তার সমপরিমাণ কোনো অকল্যাণ দূর করেন, অথবা তার জন্য তা আখিরাতে সঞ্চয় করে রাখেন। (মুসনাদ আহমদ, হাদিস : ১১১৩৩)
সুতরাং দোয়া করে কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়াকে দোয়া সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যাত হওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। বান্দার কাজ হলো বৈধ বিষয়ে দোয়া করা, নিজের আমল ও উপার্জন শুদ্ধ করা, গুনাহ থেকে তওবা করা, ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর প্রতি সুদৃঢ় আস্থা রাখা।
তাই আসুন, দোয়ার আগে ও দোয়ার সঙ্গে নিজেদের জীবনটাকেও একটু যাচাই করি। আমাদের উপার্জন কি হালাল? খাদ্য-পানীয় কি পবিত্র? অন্যের অধিকার কি আমরা আদায় করছি? কোনো গুনাহে অবিচল থেকে শুধু দোয়ার মাধ্যমে তার পরিণতি থেকে মুক্তি চাইছি কি না? দোয়ার পর দ্রুত ফল না পেয়ে আমরা কি হতাশ হয়ে যাচ্ছি? দোয়ার সময় আমাদের অন্তর কি সত্যিই আল্লাহর দিকে নিবিষ্ট থাকে?
মাহন আল্লাহ আমাদের সকল নবীজির শিক্ষার আলোকে নিজের জীবন গঠন করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



