মহানবী (সা.)-এর জীবনে বিলাসিতা এড়িয়ে চলার দর্শন

প্রতীকী ছবি
মানুষের স্বভাবেই স্বাচ্ছন্দ্য ও সৌন্দর্যের আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। ইসলাম মানুষের এই স্বাভাবিক প্রবণতাকে অস্বীকার করেনি; বরং হালাল উপায়ে উপার্জন, পরিচ্ছন্নতা ও সৌন্দর্যচর্চাকে অনুমোদন করেছে। কিন্তু ভোগের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি, অপচয় এবং দুনিয়াকেন্দ্রিক জীবনকে নিরুৎসাহিত করেছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ছিল এই ভারসাম্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি দারিদ্র্যকে লক্ষ্য বানাননি, আবার প্রাচুর্যকেও জীবনের উদ্দেশ্য করেননি। তাঁর জীবনে ছিল প্রয়োজনের মধ্যে পরিতৃপ্তি এবং ভোগের মধ্যে সংযম।
পবিত্র কোরআন তাঁকে দুনিয়ার চাকচিক্য থেকে নিজেকে দূরে রাখার এক বিশেষ শিক্ষা দিয়েছে। মহান আল্লাহতাআলা বলেছেন,
وَلَا تَمُدَّنَّ عَيْنَيْكَ إِلَىٰ مَا مَتَّعْنَا بِهِۦٓ أَزْوَٲجًا مِّنْهُمْ زَهْرَةَ ٱلْحَيَوٲةِ ٱلدُّنْيَا
‘আর তুমি কখনো প্রসারিত করো না তোমার দু’চোখ সেসবের প্রতি, যা আমি তাদের বিভিন্ন শ্রেণিকে দুনিয়ার জীবনের জাঁকজমকস্বরূপ উপভোগের উপকরণ হিসেবে দিয়েছি।’ (সুরা ত্বহা, আয়াত : ১৩১)। আবার রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর স্ত্রীদের উদ্দেশে বলা হয়, তারা চাইলে দুনিয়ার জীবন ও তার চাকচিক্য গ্রহণ করতে পারেন, অথবা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে বেছে নিতে পারেন (সুরা আহযাব, আয়াত : ২৮-২৯)।
আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায়, তাঁর পরিবারকে বিলাসী জীবন নয়, বরং আখিরাতমুখী জীবন বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
মহানবী (সা.) নিজ জীবনে এই নীতির বাস্তব প্রয়োগ করেছেন। সহি বুখারির এক দীর্ঘ হাদিসে এসেছে- উমর (রা.) একবার তাঁর কক্ষে প্রবেশ করে দেখলেন, খেজুরপাতার তৈরি চাটাইয়ের ওপর শুয়ে থাকার কারণে তাঁর শরীরে দাগ পড়ে গেছে। দৃশ্যটি দেখে উমর (রা.) আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তখন নবী (সা.) বলেন,
أَمَا تَرْضَى أَنْ تَكُوْنَ لَهُمْ الدُّنْيَا وَلَنَا الآخِرَةُ
‘তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তাদের জন্য দুনিয়া আর আমাদের জন্য আখিরাত?’ (বুখারি, হাদিস ৪৯১৩)। এখানে তাঁর বক্তব্য দারিদ্র্যের প্রশংসা নয়; বরং দুনিয়ার আরামকে জীবনের চূড়ান্ত সাফল্য মনে না করার শিক্ষা।
তাঁর পারিবারিক জীবনেও ছিল গভীর সংযম। আয়েশা (রা.) বলেছেন,
مَا شَبِعَ آلُ مُحَمَّدٍ صلى الله عليه وسلم مُنْذُ قَدِمَ الْمَدِينَةَ مِنْ طَعَامِ الْبُرِّ ثَلاَثَ لَيَالٍ تِبَاعًا، حَتَّى قُبِضَ
‘নবী (সা.) মদিনায় আসার পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তাঁর পরিবারের লোকেরা একনাগাড়ে তিন রাত গমের রুটি পেট পুরে খাননি।’ (বুখারি, হাদিস ৫৪১৬)।
অন্য বর্ণনায় এসেছে,
عَنْ عَائِشَةَ أَنَّهَا قَالَتْ لِعُرْوَةَ ابْنَ أُخْتِي إِنْ كُنَّا لَنَنْظُرُ إِلَى الْهِلاَلِ ثَلاَثَةَ أَهِلَّةٍ فِي شَهْرَيْنِ وَمَا أُوقِدَتْ فِي أَبْيَاتِ رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم نَارٌ فَقُلْتُ مَا كَانَ يُعِيشُكُمْ قَالَتْ الأَسْوَدَانِ التَّمْرُ وَالْمَاءُ
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি একবার ‘উরওয়াহ (রা.)-কে বললেন, বোনপুত্র! আমরা দু’মাসে তিনটি নতুন চাঁদ দেখতাম। কিন্তু (এর মধ্যে) আল্লাহর রাসুলের ঘরগুলোতে আগুন জ্বলত না। আমি বললাম, আপনারা কীভাবে দিনাতিপাত করতেন? তিনি বললেন, কালো দু’টি বস্তু। খেজুর আর পানি। (বুখারি, হাদিস : ৬৪৫৯)।
হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, তাঁর ঘরে কখনো কখনো এক বা দুই মাস পর্যন্ত চুলায় আগুন জ্বলত না; খেজুর ও পানি দিয়েই দিন কেটে যেত। এসব ঘটনা তাঁর জীবনের বাস্তব সংযমের পরিচয় বহন করে।
তবে রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষের জন্য বৈধ সৌন্দর্য ও ভালো খাবার নিষিদ্ধ করেননি। তিনি বলেছেন, ‘আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্য ভালোবাসেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ৯১)। পবিত্র কোরআনেও প্রশ্ন আকারে বলা হয়েছে,
مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ ٱللَّهِ ٱلَّتِىٓ أَخْرَجَ لِعِبَادِهِۦ وَٱلطَّيِّبَـٰتِ مِنَ ٱلرِّزْقِۚ
‘আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যে সৌন্দর্যের সামগ্রী এবং পবিত্র জীবিকা বের করেছেন, তাকে হারাম করেছে?’ (সুরা আ‘রাফ, আয়াত : ৩২)। ফলে তাঁর অনাড়ম্বর জীবন হালাল নিয়ামতকে অস্বীকার করার দর্শন ছিল না; বরং তা ছিল নিয়ামতের প্রতি আসক্ত না হওয়ার শিক্ষা।
মহানবী (সা.)-এর বিলাসিতা বর্জনের মূল দর্শন ছিল মানুষের হৃদয়কে বস্তু থেকে মুক্ত করা। তিনি সম্পদকে লক্ষ্য নয়, দায়িত্ব হিসেবে দেখেছেন; ভোগকে অধিকার নয়, প্রয়োজনের সীমায় রেখেছেন। আর দুনিয়াকে চূড়ান্ত গন্তব্য নয়, আখিরাতের প্রস্তুতিক্ষেত্র হিসেবে দেখেছেন।
তাই তাঁর সরলতা নিছক জীবনযাপনের ধরন ছিল না, বরং তা ছিল আত্মশুদ্ধি, মানবিকতা ও আল্লাহমুখী জীবনের এক গভীর নৈতিক দর্শন। আজকের ভোগবাদী সমাজব্যবস্থায় মানুষকে নবীজির জীবনদর্শন মনে করিয়ে দেওয়া উচিত যে, জীবনের মর্যাদা কত বেশি অর্জন করেছি তার মধ্যে নয়, বরং কত কমে তৃপ্ত থেকে কত বেশি কল্যাণ করতে পেরেছি তার মধ্যে।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে নববী আদর্শের আলোকে জীবনাতিপাত করার তাওফিক দান করুন।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক






