মহানবী (সা.)-কে দুধ পান করানো মহীয়সী নারীগণ

প্রতীকী ছবি
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শৈশবের সঙ্গে কয়েকজন মহীয়সী নারীর নাম গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। জন্মের পর তাঁর মা আমিনা বিনতে ওয়াহাব তাঁকে দুধ পান করিয়েছেন। এরপর মক্কার প্রচলিত রীতি অনুযায়ী তিনি দুধমায়ের কাছে লালিত-পালিত হন। তাঁর দুধমাতাদের মধ্যে নির্ভরযোগ্য সূত্রে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হলেন সাওবিয়া (ثُوَيْبَة) ও হালিমা সাদিয়া (حَلِيمَة السَّعْدِيَّة)।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মের পর তাঁর মা আমিনা (রা.) তাঁকে কত দিন দুধ পান করিয়েছেন, এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য সূত্রে সুনির্দিষ্ট সময় পাওয়া যায় না। তাই নির্দিষ্ট ‘তিন দিন’ বা ‘চার দিন’ বলা থেকে বিরত থাকাই সতর্কতার দাবি। এরপর মহানবী (সা.)-এর দুধপানের দায়িত্ব নেন সাওবিয়া (রা.)। তিনি ছিলেন আবু লাহাবের দাসী। সহিহ বুখারির বর্ণনায় রয়েছে, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে দুধ পান করিয়েছিলেন। একই সূত্রে জানা যায়, তিনি মহানবী (সা.)-এর চাচা হামজা ইবন আবদুল মুত্তালিব (রা.)-কেও দুধ পান করিয়েছিলেন। ফলে হামজা (রা.) ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মধ্যে দুধ-ভাইয়ের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। (বুখারি, হাদিস : ৫১০১)
সাওবিয়ার সঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দুধ-সম্পর্ক ছিল তাঁর
শৈশবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সীরাতের কিছু বর্ণনায় তাঁর ইসলাম গ্রহণ এবং
পরবর্তী সময়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পক্ষ থেকে তাঁর প্রতি সদাচরণের কথা উল্লেখ
হয়েছে। তবে এসব বর্ণনার সনদ সহিহ বুখারির বর্ণনার মতো শক্তিশালী নয়। তাই সে বিবরণ
না গিয়ে নিশ্চিতভাবে এতটুকু বলা যায় যে, সাওবিয়া মহানবী (সা.)-এর দুধমা ছিলেন
এবং তাঁর সঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দুধ-সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
(বুখারি, হাদিস : ৫১০১; ইবন
হিশাম,
আস-সীরাতুন নববিয়্যাহ, ১/১৬২-১৬৭)
এরপর মহানবী (সা.)-এর শৈশবের সবচেয়ে দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যুক্ত হয় হালিমা সাদিয়া (রা.)-এর সঙ্গে। তিনি বনু সাদ ইবন বকর গোত্রের নারী ছিলেন। সে সময় মক্কার সম্ভ্রান্ত পরিবারগুলো নবজাত শিশুদের মরু অঞ্চলের দুধমায়েদের কাছে লালন-পালনের জন্য পাঠাত। এর উদ্দেশ্য ছিল শিশুদের নির্মল পরিবেশে বেড়ে ওঠা এবং বিশুদ্ধ আরবি ভাষা শেখার সুযোগ করে দেওয়া। বনু সাদের নারীরাও এ উদ্দেশ্যে মক্কায় আসতেন।
সীরাতের বর্ণনা অনুযায়ী, হালিমা সাদিয়া (রা.) প্রথমে পিতৃহীন শিশু মুহাম্মদ (সা.)-কে নেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলেন না। কিন্তু অন্য কোনো শিশু না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত তিনি তাঁকে গ্রহণ করেন। মহানবী (সা.)-কে গ্রহণের পর তাঁর পরিবারে দুধের প্রাচুর্য ও অন্যান্য কল্যাণের ঘটনা ঘটতে থাকে বলে হালিমা (রা.)-এর বর্ণনায় এসেছে। তাঁর নিজের স্তনে দুধ বৃদ্ধি পায় এবং তাঁর দুধপুত্র মুহাম্মদ (সা.) ও নিজের সন্তান আবদুল্লাহ তৃপ্ত হয়ে দুধ পান করেন। পরিবারের পশুগুলোর দুধ বৃদ্ধির কথাও সেই বর্ণনায় রয়েছে। (ইবন হিশাম, আস-সীরাতুন নববিয়্যাহ, ১/১৬২-১৬৭; ইবন সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা, ১/১১০-১১৬)
হালিমা সাদিয়া (রা.)-এর কাছে মহানবী (সা.)-এর শৈশবের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিবাহিত হয়। সীরাতের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি তাঁকে দুধ পান করান এবং পরবর্তী সময়েও নিজের কাছে রাখেন। এ সময়ের নানা বরকতের ঘটনা ইসলামী সীরাতসাহিত্যে বিস্তৃতভাবে বর্ণিত হয়েছে। তবে এসব বর্ণনার সবগুলো একই মাত্রায় প্রামাণিক নয়। তাই নিশ্চিতভাবে বলা যায়, আমিনা (রা.) ছিলেন তাঁর জন্মদাত্রী মা, সাওবিয়া (রা.) ছিলেন তাঁর প্রাথমিক দুধমাতাদের একজন এবং হালিমা সাদিয়া (রা.) ছিলেন তাঁর প্রসিদ্ধ দুধমা, যাঁর কাছে তিনি শৈশবের একটি উল্লেখযোগ্য সময় লালিত-পালিত হন।
লেখক: শিক্ষিকা, এবিসি ইন্টারন্যাশনাল স্কুল নারায়ণগঞ্জ।







