কোরআনের বাণী
যে আমলে শত্রুও বন্ধুতে পরিণত হয়

প্রতীকী ছবি
মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক সব সময় মসৃণ থাকে না। কখনো ভুল বোঝাবুঝি, কখনো স্বার্থের সংঘাত, আবার কখনো বিদ্বেষ ও প্রতিহিংসা মানুষকে পরস্পরের শত্রুতে পরিণত করে। কিন্তু ইসলাম শত্রুতার জবাবে শত্রুতা বাড়িয়ে দেওয়ার পরিবর্তে এমন এক নৈতিক শক্তির শিক্ষা দিয়েছে, যার মাধ্যমে ঘৃণার আগুনও নিভে যেতে পারে, কঠিন হৃদয়ও কোমল হতে পারে। সেই অনন্য আমল হলো মন্দকে উত্তম আচরণ দিয়ে প্রতিহত করা।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন—
وَ لَا تَسۡتَوِی الۡحَسَنَۃُ وَ لَا السَّیِّئَۃُ ؕ اِدۡفَعۡ بِالَّتِیۡ هِیَ اَحۡسَنُ فَاِذَا الَّذِیۡ بَیۡنَكَ وَ بَیۡنَهٗ عَدَاوَۃٌ كَاَنَّهٗ وَلِیٌّ حَمِیۡمٌ
‘ভালো ও মন্দ সমান নয়। তুমি মন্দকে প্রতিহত করো এমন পন্থায়, যা উত্তম। তাহলে দেখবে, যার সঙ্গে তোমার শত্রুতা রয়েছে, সে যেন অন্তরঙ্গ বন্ধু।’ (সুরা ফুসসিলাত, আয়াত : ৩৪)
এই আয়াতে মানুষের সঙ্গে আচরণের এক অসাধারণ নীতি তুলে ধরা হয়েছে। মন্দ আচরণের জবাবে একই ধরনের মন্দ আচরণ করা সহজ; কিন্তু মন্দের জবাবে ভালো করা আত্মসংযম, বিবেক ও ঈমানের পরিচয়। পবিত্র কোরআন এখানে শুধু ক্ষমা করার কথা বলেনি, বরং ‘যা উত্তম’ তা দিয়ে মন্দকে প্রতিহত করার নির্দেশ দিয়েছে। কেউ রূঢ় হলে তার সঙ্গে নম্র হওয়া, কেউ অপমান করলে ধৈর্য ধারণ করা, কেউ অন্যায় করলে সুযোগমতো উত্তম আচরণের মাধ্যমে তার অন্যায়কে পরাস্ত করা এর অন্তর্ভুক্ত।
তবে এর অর্থ অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া নয়। ইসলাম ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অনুমতি দিয়েছে এবং জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিকার গ্রহণের অধিকারও স্বীকার করেছে। কিন্তু ব্যক্তিগত ক্রোধ, প্রতিহিংসা ও অহংকারকে প্রশ্রয় না দিয়ে ক্ষমা ও উত্তম আচরণকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন—
وَ جَزٰٓؤُا سَیِّئَۃٍ سَیِّئَۃٌ مِّثۡلُهَا ۚ فَمَنۡ عَفَا وَ اَصۡلَحَ فَاَجۡرُهٗ عَلَی اللّٰهِ
‘মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ; কিন্তু যে ক্ষমা করে এবং আপস করে, তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে।’ (সুরা শুরা, আয়াত : ৪০)
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন এ শিক্ষার বাস্তব দৃষ্টান্ত। মক্কার মানুষ তাঁকে ও তাঁর সাহাবিদের বছরের পর বছর নির্যাতন করেছে, সামাজিকভাবে বয়কট করেছে, দেশত্যাগে বাধ্য করেছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। কিন্তু মক্কা বিজয়ের দিন তিনি প্রতিশোধপরায়ণ না হয়ে ক্ষমা ও মহানুভবতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর এই আচরণ বহু মানুষের হৃদয় পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হয়ে ওঠে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ، إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الْغَضَبِ
‘শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং শক্তিশালী সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (বুখারি, হাদিস : ৬১১৪)
আধুনিক সমাজে এই আয়াতের শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারে দাম্পত্য কলহ, কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতবিরোধ কিংবা সামাজিক বিভাজন—সব ক্ষেত্রেই প্রতিশোধের ভাষা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে। একটি কঠিন কথার উত্তরে কোমল কথা, অপমানের জবাবে মর্যাদাপূর্ণ নীরবতা এবং বিদ্বেষের জবাবে কল্যাণকামিতা অনেক সময় এমন দরজা খুলে দেয়, যা তর্ক দিয়ে খোলা সম্ভব হয় না।
উপরের আয়াত ও হাদিস দ্বারা দৃঢ়ভাবে প্রমাণিত হয় যে, শত্রুকে বন্ধুতে পরিণত করার সবচেয়ে কার্যকর পথ প্রতিশোধ নয়, উত্তম চরিত্র। তবে এই চরিত্র দুর্বলতার নয়; এটি আত্মসংযমের শক্তি। যে মানুষ নিজের রাগকে জয় করতে পারে, অন্যায়ের মাঝেও ন্যায়পরায়ণ থাকতে পারে এবং বিদ্বেষের জবাবে কল্যাণের হাত বাড়াতে পারে, সে শুধু একটি বিরোধ মিটিয়ে দেয় না, একটি হৃদয় জয় করার সম্ভাবনাও তৈরি করে। আর কোরআনের ভাষায়, সেই শত্রুই একদিন وَلِيٌّ حَمِيمٌ তথা ‘অন্তরঙ্গ বন্ধু’ হয়ে যেতে পারে।
মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে প্রাত্যহিক জীভনাচারে ন্যায়পরায়ণ থাকার তাওফিক দাও করুন। আমীন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



