কোরবানি
পশু জবাই থেকে প্রবৃত্তি জবাইয়ের শিক্ষা
- কোরবানির ছুরির নিচে মানুষের অহংকার
- কোরবানিতে পশু জবাইয়ের আড়ালের আত্মিক শিক্ষা

প্রতীকী ছবি
শহরের ব্যস্ত সড়কে তখন কোরবানির পশুর হাট বসতে শুরু করেছে। কোথাও গরুর গলায় রঙিন ফিতা, কোথাও শিশুরা আনন্দে পশুর গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে উঠছে পশুর ছবি আর দাম নিয়ে আলোচনায়। কিন্তু এই কোলাহলের মাঝেও একটি প্রশ্ন নিঃশব্দে থেকে যায়, কোরবানি কি শুধু পশু জবাইয়ের নাম? নাকি এর ভেতরে লুকিয়ে আছে মানুষের নিজের ভেতরের পশুত্বকে জবাই করার আহ্বান?
ইসলাম কোরবানিকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত হিসেবে উপস্থাপন করেনি। বরং এটি মানুষের আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ, আনুগত্য ও প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণের এক গভীর শিক্ষায় পরিণত করেছে। তাই কোরবানির ঈদ শুধু ছুরি চালানোর উৎসব নয়; এটি মানুষের হৃদয়ের ভেতর চলা এক নীরব বিপ্লবের সময়।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَٰكِن يَنَالُهُ التَّقْوَىٰ مِنكُمْ
‘আল্লাহর কাছে পৌঁছে না তাদের গোশত কিংবা রক্ত; বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা হজ, আয়াত : ৩৭)
এই আয়াত কোরবানির পুরো দর্শনকে এক বাক্যে স্পষ্ট করে দেয়। আল্লাহ পশুর রক্ত চান না; তিনি চান মানুষের হৃদয়ের পরিবর্তন। তিনি দেখতে চান, মানুষ তার ভেতরের অহংকার, লোভ, হিংসা, আত্মকেন্দ্রিকতা ও অবাধ প্রবৃত্তিকে কতটা আল্লাহর সামনে কোরবানি করতে পারে।
আজকের পৃথিবীতে মানুষ প্রযুক্তিতে উন্নত হলেও প্রবৃত্তির দাসত্ব থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি। ভোগবাদ, প্রতিযোগিতা, প্রদর্শন, ক্রোধ, অসততা ও আত্মঅহমিকার আগুন মানুষকে ভেতর থেকে পুড়িয়ে দিচ্ছে। কোরবানি এসে সেই মানুষকেই প্রশ্ন করে, তুমি কি শুধু পশু জবাই করেছ, নাকি নিজের ভেতরের পশুটিকেও আঘাত করতে পেরেছ?
ইবরাহিম (আ.)-এর জীবনের দিকে তাকালে আমরা কোরবানির প্রকৃত চেতনা বুঝতে পারি। তিনি শুধু একটি পশু কোরবানি করেননি; বরং আল্লাহর আদেশের সামনে নিজের আবেগ, ভালোবাসা ও ব্যক্তিগত চাওয়াকেও কোরবানি করেছিলেন। প্রিয় সন্তান ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করার পরীক্ষায় তিনি প্রমাণ করেছিলেন, আল্লাহর সন্তুষ্টির চেয়ে বড় কিছু নেই।
পবিত্র কোরআনে এসেছে,
فَلَمَّا أَسْلَمَا وَتَلَّهُ لِلْجَبِينِ
‘যখন তারা উভয়ে আল্লাহর নির্দেশের সামনে আত্মসমর্পণ করল…’ (সুরা সাফফাত, আয়াত : ১০৩)
এই ‘আত্মসমর্পণ’ই কোরবানির প্রাণ। কোরবানি মানুষকে শেখায়, আল্লাহর সামনে নিজের প্রবৃত্তিকে নত করতে না পারলে বাহ্যিক ইবাদত অনেক সময় প্রাণহীন হয়ে পড়ে।
ইমাম গাজ্জালি রহ. ‘ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন’-এ মানুষের নফস বা প্রবৃত্তিকে এমন এক শক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা নিয়ন্ত্রণহীন হলে মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। ইসলাম সেই নফসকে হত্যা করতে বলে না; বরং নিয়ন্ত্রণ করতে শেখায়। কোরবানি সেই নিয়ন্ত্রণের প্রতীক।
আজ কোরবানির ঈদ অনেক জায়গায় ভোগ ও প্রদর্শনের প্রতিযোগিতায় পরিণত হচ্ছে। কে বড় পশু কিনল, কার কোরবানি বেশি আলোচিত হলো, কার ছবি বেশি ভাইরাল হলো, এসব নিয়েই ব্যস্ততা দেখা যায়। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত সরলতা ও বিনয়ের সঙ্গে কোরবানি করতেন।
হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজ হাতে কোরবানি করেছেন এবং আল্লাহর নাম উচ্চারণ করেছেন।
আনাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সা.) দু’টি সাদা-কালো রং এর ভেড়া দ্বারা কোরবানী করেছেন। তখন আমি তাঁকে দেখতে পেলাম তিনি ভেড়া দু’টোর পার্শ্বে পা রেখে ’বিস্মিল্লাহ ও আল্লাহু আকবার’ পড়ে তাঁর নিজ হাতে সে দু’টোকে জবেহ করেন।
(বুখারি, হাদিস : ৫৫৫৮)
এখানে বাহ্যিক জাঁকজমকের চেয়ে ইখলাস ও তাকওয়ার গুরুত্বই বেশি ফুটে ওঠে।
কোরবানির আরেকটি বড় শিক্ষা হলো ত্যাগ ও সহমর্মিতা। ইসলামে কোরবানির গোশত নিজের ঘরে জমিয়ে রাখার জন্য নয়; বরং আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্র মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। এ যেন সমাজে সম্পদের প্রবাহ ও মানবিক সম্পর্ক পুনর্জাগরণের এক অনন্য ব্যবস্থা।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা খাও, অন্যকে খাওয়াও এবং সঞ্চয় করো।’ (মুসলিম, হাদিস: ১৯৭১)
এই ‘অন্যকে খাওয়ানো’র মধ্যেই কোরবানির সামাজিক সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে। একজন দরিদ্র মানুষ বছরের অনেকটা সময় হয়তো ভালো খাবারের সুযোগ পান না। কিন্তু কোরবানির ঈদ তাকে সমাজের আনন্দে শরিক হওয়ার সুযোগ দেয়।
তবে কোরবানির সবচেয়ে গভীর দিকটি হয়তো এখানেই যে, এটি মানুষকে নিজের ভেতরে তাকাতে শেখায়। আমার ভেতরে কি অহংকার আছে? আমি কি মানুষের হক নষ্ট করি? আমি কি অন্যের কষ্ট বুঝি? আমি কি নিজের লোভকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি? যদি না পারি, তাহলে শুধু পশু জবাই করলেই কোরবানির পূর্ণ শিক্ষা অর্জিত হয় না।
হাসান আল-বাসরি রহ. বলতেন, ‘তোমার নফস তোমার বাহন। তুমি যদি তাকে নিয়ন্ত্রণ না করো, সে-ই তোমাকে নিয়ন্ত্রণ করবে।’
আজ পৃথিবীতে মানুষ বাহ্যিক উন্নতির শিখরে উঠলেও আত্মিক সংকটে ভুগছে। পরিবারে অশান্তি, সমাজে সহিংসতা, মানুষের মাঝে অস্থিরতা বাড়ছে। কোরবানি সেই অস্থির মানুষকে আবার ত্যাগ, সংযম ও আল্লাহমুখিতার শিক্ষা দেয়।
যে মানুষ কোরবানির ছুরি হাতে নিয়ে নিজের ভেতরের হিংসা, লোভ, প্রতারণা ও আত্মঅহমিকাকেও কোরবানি করার সিদ্ধান্ত নেয়, প্রকৃতপক্ষে সেই মানুষই কোরবানির আসল শিক্ষা স্পর্শ করতে পারে।
ঈদের সকাল শেষে রক্ত ধুয়ে যায়, মাংস ভাগ হয়ে যায়, হাট ভেঙে যায়। কিন্তু কোরবানির আসল প্রশ্নটি থেকে যায় মানুষের হৃদয়ের ভেতর, আমি কি শুধু একটি পশু জবাই করেছি, নাকি নিজের প্রবৃত্তিকেও আল্লাহর সামনে নত করতে পেরেছি?
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক
saifpas352@gmail.com




