যেসব আমলে রিযিক বৃদ্ধি পায়

প্রতীকী ছবি
মানুষের জীবনের অন্যতম বড় চিন্তার নাম রিযিক। সংসারের প্রয়োজন, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা সম্মানজনক জীবনযাপন; সবকিছুর সঙ্গেই রিযিকের সম্পর্ক গভীরভাবে জড়িত। কিন্তু ইসলাম রিযিককে কেবল অর্থ বা সম্পদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। বরং সুস্থতা, শান্তি, সন্তুষ্টি, নেক সন্তান, উপকারী জ্ঞান, কল্যাণময় সময়; এসবও রিযিকের অন্তর্ভুক্ত। অনেক সময় মানুষ অল্প উপার্জনেও প্রশান্ত থাকে, আবার বিপুল সম্পদের মাঝেও অশান্তিতে ভোগে। এ কারণেই ইসলাম শুধু আয় বাড়ানোর কথা বলেনি; বরং বরকতময় রিযিকের শিক্ষা দিয়েছে।
পবিত্র কোরআন ও হাদিসে এমন কিছু আমলের কথা এসেছে, যেগুলো মানুষের রিযিকে প্রশস্ততা ও বরকতের কারণ হয়। এগুলো নিছক আধ্যাত্মিক বক্তব্য নয়; বরং মানবজীবনের বাস্তব ও পরীক্ষিত নীতিমালা। তন্মধ্যে রয়েছে-
তাকওয়া বা আল্লাহভীতি
কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘আর যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিযিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।’ (সুরা আত-তালাক, আয়াত : ২-৩)
এই আয়াতে রিযিক বৃদ্ধির সঙ্গে তাকওয়ার সম্পর্ক সরাসরি তুলে ধরা হয়েছে। মানুষ যখন হারাম থেকে বেঁচে থাকে, প্রতারণা ও অন্যায়ের পথ পরিহার করে, তখন আল্লাহ তার জন্য অপ্রত্যাশিত কল্যাণের দরজা খুলে দেন। বর্তমান সমাজে অনেকেই মনে করেন শুধু কৌশল, যোগাযোগ বা প্রতিযোগিতাই রিযিকের মূল চাবিকাঠি। অথচ কোরআন শেখায়, প্রকৃত চাবিকাঠি হলো তাকওয়া।
ইস্তিগফার
ইস্তিগফার বা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনাও রিযিক বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। নূহ আলাইহিস সালাম তার জাতিকে বলেছিলেন, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, নিশ্চয় তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বৃদ্ধি করবেন এবং তোমাদের জন্য বাগান ও নদ-নদী সৃষ্টি করবেন।’ (সুরা নূহ, আয়াত : ১০-১২)
এই আয়াতগুলোতে ইস্তিগফারের সঙ্গে বৃষ্টি, সম্পদ ও সন্তান বৃদ্ধির সম্পর্ক উল্লেখ করা হয়েছে। অনেক সালাফে সালেহিন জীবনের সংকটময় সময়ে অধিক ইস্তিগফারকে অবলম্বন করতেন। হাসান বসরি রহ. এর কাছে কেউ দারিদ্র্যের অভিযোগ করলে, কেউ বৃষ্টির অভাবের কথা বললে, আবার কেউ সন্তান না হওয়ার কষ্ট জানালে; তিনি সবার জন্য ইস্তিগফারের পরামর্শ দিতেন। পরে তিনি এ আয়াতই তিলাওয়াত করেন।
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করাও রিযিক বৃদ্ধির অন্যতম মাধ্যম। আজকের ব্যস্ত নগরজীবনে আত্মীয়তার বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ছে। অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি চায় তার রিযিক প্রশস্ত হোক এবং আয়ু বৃদ্ধি পাক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৯৮৬)
এখানে আয়ু বৃদ্ধির অর্থ অনেক আলেম বরকতময় জীবন বলে ব্যাখ্যা করেছেন। আত্মীয়তার সম্পর্ক মানুষের হৃদয়কে কোমল করে, সামাজিক সহযোগিতা বাড়ায় এবং পারিবারিক স্থিতি তৈরি করে। এগুলোও এক ধরনের রিযিক।
দান-সদকা
দান-সদকা মানুষের দৃষ্টিতে সম্পদ কমিয়ে দেয় বলে মনে হতে পারে, কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে এটি সম্পদ বৃদ্ধির মাধ্যম। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা যা কিছু ব্যয় করো, তিনি তার পরিবর্তে আরও দান করেন। আর তিনিই শ্রেষ্ঠ রিযিকদাতা।’ (সুরা সাবা, আয়াত : ৩৯)
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘সদকা সম্পদ কমায় না।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৫৮৮) সদকার মাধ্যমে মানুষের সম্পদে বরকত আসে, বিপদ দূর হয় এবং হৃদয়ে প্রশান্তি জন্ম নেয়। ইসলামের ইতিহাসে অসংখ্য ধনী নেককার মানুষের জীবনে দেখা যায়, যত বেশি তারা আল্লাহর পথে ব্যয় করেছেন, তত বেশি আল্লাহ তাদের জন্য কল্যাণের দ্বার খুলে দিয়েছেন।
ইবাদতের জন্য সময় বের করা
আল্লাহর ইবাদতের জন্য সময় বের করাও রিযিক বৃদ্ধির কারণ। একটি হাদিসে কুদসিতে এসেছে, ‘হে আদম সন্তান! তুমি আমার ইবাদতের জন্য নিজেকে অবসর দাও, আমি তোমার হৃদয়কে অভাবমুক্ত করে দেব এবং তোমার দারিদ্র্য দূর করে দেব।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৪৬৬; ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪১০৭)
আজকের দিনে মানুষ রিযিকের পেছনে এত ব্যস্ত হয়ে পড়েছে যে নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত ও দোয়ার জন্য সময়ই বের করতে পারে না। অথচ যে রব রিযিকের মালিক, তার সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল করে কখনো প্রকৃত স্বচ্ছলতা আসে না।
হজ ও উমরাহ করা
হজ ও উমরাহকেও দারিদ্র্য দূর হওয়ার মাধ্যম বলা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘হজ ও উমরাহ পরপর আদায় করো। কারণ এগুলো দারিদ্র্য ও গুনাহ দূর করে দেয়, যেমন কামারের হাপর লোহা, স্বর্ণ ও রৌপ্যের ময়লা দূর করে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৮১০; সুনানে নাসাঈ, হাদিস : ২৬৩১) এখানে দারিদ্র্য দূর হওয়ার অর্থ শুধু অর্থনৈতিক পরিবর্তন নয়; বরং আত্মিক ও সামাজিক কল্যাণের প্রসারও বোঝানো হয়েছে।
বিয়ে করা
বিয়েকেও ইসলাম রিযিক বৃদ্ধির একটি উপায় হিসেবে উল্লেখ করেছে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত, তাদের বিয়ে দাও… তারা অভাবগ্রস্ত হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের অভাবমুক্ত করে দেবেন।’ (সুরা আন-নূর, আয়াত : ৩২
বর্তমান সমাজে দরিদ্রতার ভয়ে অনেকেই বিয়ে বিলম্বিত করেন। অথচ পবিত্র কোরআন মানুষকে আশ্বস্ত করেছে যে, বৈধ ও পবিত্র জীবনের পথে এগোলে আল্লাহ সাহায্য করেন।
রিযিক বৃদ্ধি মানেই কেবল ধনসম্পদের পাহাড় নয়। বরং হালাল উপার্জনে তৃপ্তি, কম সম্পদেও শান্তি, পরিবারে ভালোবাসা, সুস্থতা ও ঈমানের দৃঢ়তাও রিযিক। তাই একজন মুমিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু অধিক সম্পদ নয়; বরং বরকতময় জীবন।
মানুষ যখন আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক করে, গুনাহ থেকে ফিরে আসে, দানশীল হয়, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে এবং হালাল পথে পরিশ্রম করে, তখন আল্লাহ তার জীবনে এমন প্রশান্তি দান করেন, যা কোনো পার্থিব হিসাব দিয়ে মাপা যায় না। প্রকৃত রিযিক সেটাই, যা মানুষকে আল্লাহর কাছাকাছি নিয়ে যায় এবং দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণের কারণ হয়।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক






