পারস্পরিক সম্মানেই টিকে দাম্পত্যের বন্ধন

প্রতীকী ছবি
পরিবার মানবসমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, আর সেই পরিবারের মূল ভিত্তি হলো স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক। এই সম্পর্ককে শুধুমাত্র একসঙ্গে বসবাসের চুক্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ এটি ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ, সহযোগিতা ও পারস্পরিক সম্মানের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি পবিত্র বন্ধন। দাম্পত্য জীবনে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা বা বাহ্যিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়েও বেশি প্রয়োজন একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা ও মর্যাদাবোধ। সম্মান যেখানে থাকে, সেখানে ভালোবাসা টিকে থাকে; আর সম্মান হারিয়ে গেলে সম্পর্ক ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে পারস্পরিক প্রশান্তি, ভালোবাসা ও দয়ার সম্পর্ক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন,
وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً
‘আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে একটি হলো, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো। আর তিনি তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন ভালোবাসা ও দয়া।’ (সুরা রূম, আয়াত : ২১)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, দাম্পত্য জীবনের মূল লক্ষ্য একে অপরকে ছোট করা নয়; বরং পরস্পরের জন্য প্রশান্তির উৎস হওয়া।
ইসলাম স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের মর্যাদাকে সমান গুরুত্ব দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوفِ
‘ন্যায়সংগতভাবে নারীদের যেমন কিছু অধিকার রয়েছে, তেমনি তাদের ওপরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২২৮)
অর্থাৎ দাম্পত্য সম্পর্ক একতরফা কর্তৃত্বের নয়; বরং অধিকার ও দায়িত্বের ভারসাম্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজ জীবনে স্ত্রীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি বলেছেন,
خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي
‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের সবার চেয়ে উত্তম।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৮৯৫; ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৯৭৭)
এই হাদিসে স্পষ্ট করা হয়েছে, একজন মানুষের প্রকৃত চরিত্রের পরিচয় পাওয়া যায় পরিবারের সঙ্গে তার আচরণে।
পারস্পরিক সম্মানের অন্যতম প্রকাশ হলো সুন্দর ভাষায় কথা বলা। রাগের মুহূর্তেও অপমানজনক শব্দ ব্যবহার, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা, অন্যের ব্যক্তিত্বকে আঘাত করা বা জনসমক্ষে সঙ্গীকে ছোট করা ইসলামী আদর্শের পরিপন্থী। মতভেদ হতেই পারে, কিন্তু তা যেন শালীনতা ও সংযমের সীমা অতিক্রম না করে।
দাম্পত্য জীবনে একে অপরের গোপনীয়তা রক্ষা করাও সম্মানের অংশ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট মর্যাদার ব্যক্তি হবে সেই ব্যক্তি, যে স্ত্রীর সঙ্গে নির্জনে মিলিত হওয়ার পর তার গোপন বিষয় অন্যদের কাছে প্রকাশ করে।’ (মুসলিম, হাদিস : ১৪৩৭)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত বিষয় অন্যের কাছে প্রকাশ করা শুধু অনুচিত নয়, বরং গুরুতর নৈতিক অপরাধ।
আজকের ব্যস্ত ও প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে দাম্পত্য সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝি, অবহেলা ও মানসিক দূরত্ব বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে একে অপরকে সময় দেওয়া, মনোযোগ দিয়ে কথা শোনা, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, ভুল হলে ক্ষমা চাওয়া এবং ক্ষমা করে দেওয়ার মানসিকতা সম্পর্ককে দৃঢ় করে।
একটি সুখী পরিবার কেবল ভালোবাসা দিয়ে গড়ে ওঠে না; বরং ভালোবাসাকে টিকিয়ে রাখে পারস্পরিক সম্মান, দয়া ও দায়িত্বশীল আচরণ। তাই একজন মুসলিম স্বামী ও স্ত্রীর উচিত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করে একে অপরের মর্যাদা রক্ষা করা, সুন্দর আচরণ করা এবং এমন একটি পরিবার গড়ে তোলা, যা দুনিয়ায় শান্তির আবাস এবং আখিরাতে সফলতার মাধ্যম হয়।
লেখক: আলেম ওসাংবাদিক
saifpas352@gmail.com




