যে আমলে প্রতিদিন মিলতে পারে হজের সওয়াব

প্রতীকী ছবি
মানুষের জীবনে এমন কিছু আমল আছে, যা দেখতে ছোট হলেও আল্লাহর কাছে তার মর্যাদা অনেক বড়। ইসলামের সৌন্দর্য্য এখানেই যে, শুধু ধনীদের জন্য নয়; বরং দরিদ্র, ব্যস্ত, দুর্বল কিংবা ঘরে অবস্থানকারী মানুষের জন্যও জান্নাত ও মহাপুরস্কারের বহু দরজা খোলা রাখা হয়েছে। হজ ইসলামের এক মহান ইবাদত। কিন্তু সবার পক্ষে প্রতিবছর হজ করা সম্ভব হয় না। কারও আর্থিক অক্ষমতা, কারও শারীরিক দুর্বলতা, কারও পারিবারিক দায়িত্ব তাকে এই সৌভাগ্য থেকে দূরে রাখে। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) উম্মতের জন্য এমন এক আমলের কথা জানিয়েছেন, যার মাধ্যমে একজন মানুষ প্রতিদিন হজের সওয়াব লাভ করতে পারে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ خَرَجَ مِنْ بَيْتِهِ مُتَطَهِّرًا إِلَى صَلَاةٍ مَكْتُوبَةٍ، فَأَجْرُهُ كَأَجْرِ الْحَاجِّ الْمُحْرِمِ
‘যে ব্যক্তি পবিত্রতা অর্জন করে ফরজ সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হয়, তার সওয়াব ইহরাম বাঁধা হাজির সওয়াবের মতো।’ (সহিহ তারগিব, হাদিস : ৬৭৫)
কত বড় সুসংবাদ! একজন মুসলিম প্রতিদিন পাঁচবার অজু করে অন্তরে ইখলাস নিয়ে মসজিদের পথে হাঁটবে আর আল্লাহ তাকে হাজির মতো প্রতিদান দেবেন। এটি আল্লাহর অসীম অনুগ্রহ ছাড়া আর কিছু নয়।
হজ শুধু একটি সফর নয়; এটি আত্মসমর্পণ, ত্যাগ ও আল্লাহর দিকে ধাবিত হওয়ার প্রতীক। একজন হাজি ইহরাম বেঁধে দুনিয়ার অহংকার, বিলাসিতা ও পরিচয় ভুলে আল্লাহর দরবারে হাজির হয়। ঠিক তেমনি একজন মুসল্লি যখন অজু করে সালাতের জন্য বের হয়, তখন সে-ও পার্থিব ব্যস্ততা পেছনে ফেলে রবের ডাকে সাড়া দেয়। তাই সালাতকে ‘মুমিনের মিরাজ’ বলা হয়।
এই হাদিস আমাদের শেখায়, ইসলামে আমলের মূল্য শুধু বাহ্যিক আকারে নয়; বরং নিয়ত, আন্তরিকতা ও আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার ওপর নির্ভরশীল। হয়তো কেউ লাখো টাকা খরচ করে হজে যেতে পারছে না, কিন্তু প্রতিদিন ফজরের অন্ধকারে কিংবা জোহরের তপ্ত দুপুরে মসজিদের দিকে তার কষ্টভরা পদক্ষেপ আল্লাহর কাছে অত্যন্ত মূল্যবান।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতাআলা বলেছেন— ‘তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা করো।’ (সুরা আল-বাকারা, আয়াত : ৪৩)
সালাত শুধু একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়; এটি মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে, হৃদয়কে জীবন্ত রাখে এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ককে দৃঢ় করে। তাই যে ব্যক্তি সালাতের জন্য ঘর থেকে বের হয়, সে মূলত আল্লাহর দরবারের দিকেই অগ্রসর হয়।
অন্য এক হাদিসে এসেছে—‘আবু হুরায়রাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি বাড়ি থেকে পাক-পবিত্র হয়ে তারপর কোনো ফরজ সালাত আদায় করার জন্য হেঁটে আল্লাহর কোনো ঘরে (মসজিদে) যায়, তার প্রতিটি পদক্ষেপে একটি পাপ ঝরে পড়ে এবং অপরটিতে মর্যাদা বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। (মুসলিম, হাদিস : ৬৬৬)
আজকের যুগে মানুষ দুনিয়ার প্রয়োজনে কত দূরত্ব অতিক্রম করে। চাকরি, ব্যবসা, বিনোদন কিংবা সামান্য স্বার্থের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় করে। অথচ মসজিদের পথে কয়েক কদম হাঁটাকে অনেক সময় ভারী মনে হয়। কিন্তু একজন মুমিন জানে, আখিরাতের পাল্লায় এই কদমগুলোই একদিন নাজাতের কারণ হবে।
বিশেষ করে ফজরের সালাতের জন্য ঘর থেকে বের হওয়া এক অনন্য ইবাদত। যখন অধিকাংশ মানুষ ঘুমে অচেতন, তখন যে ব্যক্তি অজু করে আল্লাহর ঘরের দিকে রওনা দেয়, সে প্রকৃতপক্ষে নিজের ইমানের সাক্ষ্য দেয়। হাদিসে এসেছে, কিয়ামতের দিন অন্ধকারে মসজিদের পথে চলাচলকারীদের জন্য পূর্ণ নূরের সুসংবাদ রয়েছে।
তবে মনে রাখতে হবে, হাদিসে উল্লিখিত ‘হজের সওয়াব’ বলতে মূল হজের ফরজ আদায় হয়ে যাবে এমন নয়। ইসলামি শরিয়তে সামর্থ্যবান ব্যক্তির ওপর জীবনে একবার হজ ফরজ। এই হাদিসের উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহ কিছু আমলের মাধ্যমে বান্দাকে বিপুল সওয়াব দান করেন, যা হজের সওয়াবের সঙ্গে তুলনীয়।
আজ আমাদের সমাজে সালাতকে অনেকেই শুধু অভ্যাস বা দায়সারা দায়িত্বে পরিণত করেছে। অথচ একজন মুসলমানের দিন শুরু হওয়া উচিত মসজিদের পথে পদচারণায়। যদি মানুষ এই হাদিসের মর্ম উপলব্ধি করত, তাহলে হয়তো প্রতিটি আজানের সঙ্গে অলিগলি মুমিনের পদধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠত।
প্রতিদিন হজের সওয়াব লাভের এই সুবর্ণ সুযোগ আমাদের হাতের কাছেই রয়েছে। প্রয়োজন শুধু আন্তরিকতা, পবিত্রতা ও সালাতের প্রতি ভালোবাসা। দুনিয়ার ব্যস্ততা একদিন শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু মসজিদের পথে হাঁটা সেই কদমগুলো আখিরাতে নূর হয়ে জ্বলতে থাকবে।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক






