পাঁচশতাধিক বছরের পুরনো মুন্সীগঞ্জের বাবা আদম মসজিদ

ছবি: আগামীর সময়
ঢাকা থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দক্ষিণে মুন্সীগঞ্জ জেলা। বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরীর সঙ্গমভূমির এই অঞ্চল একসময় পরিচিত ছিল বিক্রমপুর নামে। প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে বিক্রমপুর ছিল গুরুত্বপূর্ণ এক জনপদ। সেই প্রাচীন জনপদের মাটিতেই আজও দাঁড়িয়ে আছে সুলতানি আমলের স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন বাবা আদম শহীদ মসজিদ। যাতে বিগত পাঁচশতাধিক বছর যাবৎ নামাজ আর আযান চলমান রয়েছে।
মুন্সীগঞ্জ জেলা শহর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পশ্চিমে সদর উপজেলার কাজী কসবা গ্রামের দরগাহবাড়িতে মসজিদটির অবস্থান। বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থ ও প্রাচীন দলিল-দস্তাবেজে এটি ‘বাবা আদম শহীদ মসজিদ’ নামে পরিচিত। মসজিদের সঙ্গে বাবা আদম শহীদের স্মৃতিও জড়িয়ে আছে। মসজিদ চত্বরে তার মাজার রয়েছে।
প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, বাবা আদম ছিলেন একজন ধর্মপ্রচারক। তিনি এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচারে এসেছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে এখানেই তিনি ইসলামের জন্য শহীদ হন। তার স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত করেই পরবর্তীকালে মসজিদটি নির্মিত হয় বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। তবে শিলালিপি অনুযায়ী মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা বিক্রমপুরের শাসক মালিক কাফুর শাহঅ তিনিই মসজিদটি নির্মাণ করেন বলে সর্বমহলে অধিক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।
মসজিদটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৪৭৯ সালে এবং প্রায় চার বছর পর ১৪৮৩ সালে তা সম্পন্ন হয়। নির্মাণকাজ শুরু করেছিলেন মালিক কাফুর শাহ; সমাপ্তির সময় সুলতান ফতেহ শাহের শাসনকাল চলছিল বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে মসজিদটি বাংলার সুলতানি আমলের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়।
স্থাপত্যের দিক থেকেও বাবা আদম মসজিদ বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। উত্তর-দক্ষিণে এর দৈর্ঘ্য ৪৩ ফুট এবং পূর্ব-পশ্চিমে প্রস্থ ৩৬ ফুট। দেয়াল প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার ফুট পুরু। নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে বিভিন্ন মাপের লাল পোড়ামাটির ইট। ইটগুলোর মাপ প্রায় ১০, ৭, ৬ ও ৫ ইঞ্চি।
মসজিদের ছাদে রয়েছে ছয়টি গম্বুজ। ছাদের ভার বহনের জন্য ভেতরে দুটি স্তম্ভ ব্যবহার করা হয়েছে। ছাদে রয়েছে বক্রাকার কার্নিশ, যা শুধু নান্দনিক সৌন্দর্যই বাড়ায়নি, বরং বাংলার বৃষ্টিপ্রবণ আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পানি নিষ্কাশনেও সহায়তা করেছে। মসজিদের চার কোণে রয়েছে অষ্টাভুজাকৃতির চারটি টারেট। পূর্বদিকে রয়েছে পাকা উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ।
মসজিদের পশ্চিম দেয়ালে তিনটি অলংকৃত মেহরাব রয়েছে। মাঝের মেহরাবটি অন্য দুটির তুলনায় প্রশস্ত। পূর্ব দেয়ালে রয়েছে তিনটি খিলানাকৃতির প্রবেশপথ। মাঝের দরজাটির ঠিক ওপরে প্রোথিত আছে আরবি লিপিতে উৎকীর্ণ একটি শিলালিপি। ঐতিহাসিকভাবে মসজিদটির নির্মাণ ও প্রতিষ্ঠাতা সম্পর্কে তথ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস এই শিলালিপি।
পাঁচশতাধিক বছরের পুরনো এই স্থাপনা সংরক্ষণেও বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১৯০৯ সালে ভারতবর্ষ প্রত্নতত্ত্ব জরিপ বিভাগ মসজিদটি সংস্কার করে। পরে ১৯৪৮ সাল থেকে এটি প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণের আওতায় আসে। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মসজিদের চারপাশে লোহার সীমানা বেড়া নির্মাণ করে। বর্তমানে স্থাপনাটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।
ঐতিহাসিক গুরুত্বের স্বীকৃতিও পেয়েছে বাবা আদম মসজিদ। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ মসজিদটির ছবি সংবলিত ডাকটিকিট প্রকাশ করে। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে আজও এখানে নিয়মিত জামাতে নামাজ আদায় হয়।
ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও স্থাপত্যশৈলীর সমন্বয়ে বাবা আদম মসজিদ তাই কেবল একটি প্রাচীন উপাসনালয় নয়। এটি বাংলার সুলতানি আমলের স্থাপত্যকীর্তির একটি জীবন্ত স্মারক। এর পুরু ইটের দেয়াল, ছয়টি গম্বুজ, অলংকৃত মেহরাব ও প্রাচীন শিলালিপি যেন কয়েক শতাব্দীর ইতিহাসকে আজও ধারণ করে আছে। মুন্সীগঞ্জের মাটিতে দাঁড়িয়ে থাকা এই পুরনো মসজিদ তাই অতীতের সঙ্গে বর্তমানের এক অনন্য সেতুবন্ধন।



