তথ্যের বন্যায় সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের ইসলামী নীতি

প্রতীকী ছবি
ডিজিটাল যুগে তথ্যের প্রবাহ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় দ্রুত। একটি খবর, ছবি বা ভিডিও মুহূর্তেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। কিন্তু এই সহজলভ্যতার সঙ্গে বেড়েছে ভুয়া খবর, গুজব, বিকৃত তথ্য এবং অপপ্রচারের ঝুঁকিও। অনেক সময় মানুষ সত্যতা যাচাই না করেই একটি তথ্য শেয়ার করে, যার ফলে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এমনকি রাষ্ট্রও ক্ষতির মুখে পড়ে। ইসলাম এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতি দিয়েছে। কোরআন ও সুন্নাহর শিক্ষা হলো, কোনো তথ্য গ্রহণ বা প্রচারের আগে তা যাচাই করা ঈমানদারের দায়িত্ব।
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ! যদি কোনো ফাসিক ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা ভালোভাবে যাচাই করে নাও। অন্যথায় অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে ফেলবে, পরে তোমাদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হবে।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ৬)
এই আয়াত ইসলামে তথ্য যাচাইয়ের মৌলিক নীতি প্রতিষ্ঠা করেছে। ইবন কাসির (রহ.) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, কোনো সংবাদ শুনেই তা গ্রহণ করা উচিত নয়; বরং সত্যতা যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যাতে অন্যায় ও অনুতাপের কারণ সৃষ্টি না হয়। (তাফসিরে ইবনে কাসির, সুরা আল-হুজুরাত, আয়াত ৬)
ইসলাম শুধু সংবাদ যাচাইয়ের নির্দেশই দেয়নি, প্রমাণ ছাড়া কোনো বিষয়ে মন্তব্য করতেও নিষেধ করেছে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয় কান, চোখ ও হৃদয়, প্রত্যেকটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সুরা আল-ইসরা, আয়াত : ৩৬)
আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই শিরোনাম না পড়েই সংবাদ শেয়ার করেন, সম্পাদিত ভিডিওকে বাস্তব ঘটনা মনে করেন কিংবা অজ্ঞাত সূত্রের তথ্য প্রচার করেন। অথচ একজন মুসলিম জানেন, প্রতিটি শব্দ ও প্রতিটি কাজের জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে, সবই বলে বেড়ায়।’ (মুসলিম, হাদিস : ৫)
এই হাদিস আমাদের শেখায়, অনিচ্ছাকৃতভাবে হলেও যাচাই ছাড়া তথ্য প্রচার মানুষকে মিথ্যার অংশীদার করে দিতে পারে। তাই কোনো খবর শেয়ার করার আগে তার উৎস, প্রেক্ষাপট ও সত্যতা নিশ্চিত করা ইসলামী দায়িত্ব।
পবিত্র কোরআনে ‘ইফক’-এর ঘটনা (হজরত আয়িশা রা.-এর বিরুদ্ধে অপবাদ) মুসলিম সমাজের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা যখন তা শুনেছিলে, তখন কেন মুমিন নর-নারীরা নিজেদের সম্পর্কে ভালো ধারণা পোষণ করেনি এবং বলেনি, ‘এ তো সুস্পষ্ট মিথ্যা’? (সুরা নূর, আয়াত : ১২)
এরপর মহান আল্লাহ আরও বলেছেন, ‘তোমরা যখন তা মুখে মুখে প্রচার করছিলে এবং যে বিষয়ে তোমাদের কোনো জ্ঞান ছিল না, তা বলছিলে, তখন তোমরা একে সামান্য মনে করেছিলে; অথচ আল্লাহর কাছে তা ছিল অত্যন্ত গুরুতর।’ (সুরা নূর, আয়াত : ১৫)
এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে, গুজব ছড়ানো শুধু সামাজিক অপরাধ নয়, এটি নৈতিক ও ধর্মীয় বিচ্যুতিও।
আধুনিক যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ডিপফেক প্রযুক্তি এবং সম্পাদিত ছবি-ভিডিও তথ্য বিভ্রান্তির নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তাই আজ ইসলামের ‘তাবাইয়্যুন’-এর শিক্ষা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। সমসাময়িক ইসলামি চিন্তাবিদ ড. ইয়াসির কাদি বিভিন্ন আলোচনায় উল্লেখ করেছেন, ডিজিটাল যুগে একজন মুসলিমের দায়িত্ব শুধু সত্য বলা নয়, বরং সত্য যাচাই করেও কথা বলা। কারণ একটি ভুল তথ্য অসংখ্য মানুষের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে একজন মুসলিমের কয়েকটি নীতি অনুসরণ করা প্রয়োজন।
এক. তথ্যের উৎস নির্ভরযোগ্য কি না তা দেখা।
দুই. একটি নয়, একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র মিলিয়ে দেখা।
তিন. আবেগের বশে বা তাড়াহুড়ো করে কিছু শেয়ার না করা।
চার. কোনো তথ্য অন্যের সম্মানহানি বা সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে কি না, তা বিবেচনা করা।
সর্বোপরি মনে রাখা, তথ্য প্রচারও একটি আমানত এবং এর জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
তথ্যের এই বন্যায় একজন মুসলিমের পরিচয় হবে তার সতর্কতা, ন্যায়পরায়ণতা ও দায়িত্বশীলতায়। মানুষের আগে পৌঁছানো নয়, সত্যের কাছে পৌঁছানোই তার লক্ষ্য। পবিত্র কোরআনের ভাষায়, ‘হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ১১৯)
কাজেই কোনো সংবাদ বা তথ্য শেয়ার করার আগে যদি আমরা কোরআনের নির্দেশ অনুযায়ী যাচাই করি, তবে শুধু ব্যক্তিগত পাপ থেকে নয়, সামাজিক বিভ্রান্তি ও অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষতি থেকেও নিজেদের এবং সমাজকে রক্ষা করতে পারব। ডিজিটাল যুগে তথ্য যাচাই কেবল নাগরিক দায়িত্ব নয়, একজন মুমিনের ঈমানি দায়িত্বও।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক
saifpas352@gmail.com




