যে ভুলে নষ্ট হতে পারে কোরবানি

সংগৃহীত ছবি
কোরবানি শুধু পশু জবাইয়ের নাম নয়; এটি তাকওয়া, আনুগত্য ও আল্লাহর আদেশের প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণের এক মহান ইবাদত। প্রতিবছর ঈদুল আজহায় লাখো মুসলমান অত্যন্ত আন্তরিকতা ও ভালোবাসার সঙ্গে কোরবানি আদায় করেন। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, অজ্ঞতা, তাড়াহুড়া কিংবা ভুল পদ্ধতির কারণে কখনো কখনো এই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। এমনকি কিছু ভুল কোরবানিকে নষ্টও করে দিতে পারে।
আমাদের সমাজে কোরবানির সময় একটি দৃশ্য প্রায়ই দেখা যায়। পশু জবাই করার পর দ্রুত তাকে নিস্তেজ করার জন্য গলার কাটাস্থানে বা মেরুদণ্ডের দিকে ধারালো ছুরি প্রবেশ করানো হয়। অনেকের ধারণা, এতে পশুর কষ্ট কমে এবং দ্রুত মৃত্যু ঘটে। কিন্তু শরিয়তের দৃষ্টিতে এ কাজ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং কিছু ক্ষেত্রে কোরবানির সহিহ হওয়াও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী পশু জবাই শুদ্ধ হওয়ার জন্য নির্ধারিত নিয়ম আছে। ফিকহবিদদের ভাষ্যমতে, জবাইয়ের সময় অন্তত প্রধান চারটি অঙ্গের মধ্যে অধিকাংশ কেটে যেতে হবে। এগুলো হলো শ্বাসনালি, খাদ্যনালি এবং গলার দুই পাশের প্রধান রক্তনালি। এগুলো কেটে গেলে স্বাভাবিকভাবেই দ্রুত রক্ত বের হয়ে পশু মৃত্যুবরণ করে। এটিই শরিয়তসম্মত পদ্ধতি।
কিন্তু অনেক সময় জবাইয়ের পরপরই পশুর মেরুদণ্ডে ছুরি ঢুকিয়ে ‘স্পাইনাল কর্ড’ বা স্নায়ুকেন্দ্র বিচ্ছিন্ন করা হয়। এতে পশুটি দ্রুত নিস্তেজ হয়ে যায়। সমস্যা হলো, যদি জবাইয়ের প্রয়োজনীয় অঙ্গসমূহ সম্পূর্ণভাবে কাটার আগেই বা রক্ত প্রবাহ স্বাভাবিক হওয়ার আগেই এভাবে পশুর মৃত্যু ঘটে, তাহলে সেটি শরিয়তসম্মত জবাই হিসেবে গণ্য নাও হতে পারে। কারণ ইসলামে কোরবানির পশুকে “যবেহ” করতে হবে, কষ্ট কমানোর অজুহাতে অন্য পদ্ধতিতে হত্যা করা যাবে না।
ফিকহের কিতাবগুলোতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, জবাই সম্পন্ন হওয়ার আগে ইচ্ছাকৃতভাবে পশুর মাথা আলাদা করা, মেরুদণ্ড ভেঙে ফেলা বা অতিরিক্ত আঘাত করা মাকরূহ এবং নিন্দনীয় কাজ। হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আল-হিদায়া, ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি ও রদ্দুল মুহতার-এ জবাইয়ের আদব সম্পর্কে সতর্কতা এসেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছুর ক্ষেত্রে উত্তম আচরণ ফরজ করেছেন। সুতরাং তোমরা যখন জবাই করবে, সুন্দরভাবে জবাই করবে। তোমাদের কেউ যেন তার ছুরি ধারালো করে এবং পশুকে স্বস্তি দেয়।’ (মুসলিম, হাদিস : ১৯৫৫)
এ হাদিসে পশুর প্রতি দয়া ও উত্তম পদ্ধতির নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দ্রুত শেষ করার নামে অনেক সময় এমন আচরণ করা হয়, যা শরিয়তের সৌন্দর্য ও মানবিকতার পরিপন্থী।
চিকিৎসাবিজ্ঞানীরাও বলেন, জবাইয়ের পরপরই মেরুদণ্ডের স্নায়ু কেটে দিলে পশুর শরীরে রক্ত সঞ্চালনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। এতে শরীরের বিভিন্ন অংশে রক্ত জমাট বেঁধে থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়। যদিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে অতিরঞ্জিত ও যাচাইহীন অনেক রোগের তথ্য ছড়িয়ে পড়ে, তাই এ বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে মূল বিষয় হলো, শরিয়তসম্মত ও পরিচ্ছন্ন পদ্ধতিতে জবাই নিশ্চিত করা।
কোরবানির সময় আরও কিছু ভুল প্রায়ই দেখা যায়। যেমন, পশুর সামনে অন্য পশু জবাই করা, ভোঁতা ছুরি ব্যবহার করা, জবাইয়ের আগে পশুকে অতিরিক্ত মারধর করা কিংবা সম্পূর্ণ মৃত্যু হওয়ার আগেই চামড়া ছাড়ানো শুরু করা। এসব কাজ ইসলামী আদবের পরিপন্থী।
মনে রাখতে হবে, কোরবানির মূল উদ্দেশ্য শুধু গোশত অর্জন নয়। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছে না এগুলোর গোশত ও রক্ত; বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা আল-হজ, আয়াত : ৩৭)
কাজেই কোরবানি যেন নিছক আনুষ্ঠানিকতা না হয়ে যায়। সামান্য অসতর্কতা, তাড়াহুড়া বা অজ্ঞতার কারণে মহান এ ইবাদতের সৌন্দর্য নষ্ট হওয়া উচিত নয়। কোরবানি আদায়ের আগে শরিয়তসম্মত নিয়ম জানা, দক্ষ কসাই নির্বাচন করা এবং ধৈর্যের সঙ্গে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা প্রতিটি মুসলমানের দায়িত্ব।
কোরবানি ত্যাগের ইবাদত। সেখানে শর্টকাট নয়, প্রয়োজন সচেতনতা, আদব ও আল্লাহভীতি।






