আজকের হজের খুৎবার মূল সারবক্তব্য

সংগৃহীত ছবি
পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আগত লাখো মুসলমান যখন আরাফাতের ময়দানে একত্রিত হয়ে ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক” ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত করছিলেন, তখন হজের খুৎবায় উচ্চারিত হচ্ছিল ঈমান, তাকওয়া, আখিরাত, তাওহিদ ও মানবিক ভ্রাতৃত্বের চিরন্তন আহ্বান। এবারের হজের খুৎবায় মসজিদে নববীর ইমাম ও খতিব শায়খ আলী বিন আবদুর রহমান আল-হুজাইফি এমন কিছু মৌলিক ইসলামী শিক্ষা তুলে ধরেছেন, যা শুধু হাজিদের জন্য নয়; বরং সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য গভীর তাৎপর্যপূর্ণ এক দিকনির্দেশনা।
খুৎবার অন্যতম প্রধান প্রতিপাদ্য ছিল আল্লাহর চিরন্তন বিধানের ওপর ঈমান রাখা এবং ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা। খতিব স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, পৃথিবীতে আল্লাহর নির্ধারিত কিছু অবিচল নিয়ম রয়েছে। ব্যক্তি, সমাজ কিংবা রাষ্ট্র যখন জুলুম, অবাধ্যতা ও সীমালঙ্ঘনে লিপ্ত হয়, তখন শেষপর্যন্ত তাদের পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে। এ সময় পবিত্র কোরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেছেন, আল্লাহ বহু জালিম জনপদকে অবকাশ দিয়েছেন, কিন্তু অবশেষে তাদেরকে শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়েছে। এই বক্তব্য কেবল অতীত ইতিহাসের বর্ণনা নয়; বরং বর্তমান বিশ্বের জন্যও এক গভীর সতর্কবার্তা। ফেরাউন, আদ, সামুদ কিংবা কোরআনে বর্ণিত জালিম জাতিগুলোর ধ্বংসের ইতিহাস মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ক্ষমতা কখনো স্থায়ী নয়, স্থায়ী কেবল আল্লাহর বিধান।
খুৎবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাওহিদের আহ্বান। হাজিদের সমাবেশকে তিনি একত্ববাদের জীবন্ত প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন। ভাষা, বর্ণ, দেশ ও সংস্কৃতির ভিন্নতা সত্ত্বেও মুসলমানরা এক কিবলার সামনে, এক পোশাকে, এক প্রভুর ডাকে সাড়া দিয়ে সমবেত হন। হজ যেন ঘোষণা করে, মানুষের প্রকৃত পরিচয় জাতি বা ভূখণ্ড নয়; বরং তার ঈমান ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্য।
খুৎবায় খতিব সাহেব বিশেষভাবে তাকওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, আখিরাতে মুক্তির একমাত্র পথ হলো তাকওয়া। পাপ বর্জন, নেক আমল, আল্লাহভীতি এবং কেয়ামতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণই একজন মুমিনের প্রকৃত জীবনদর্শন। বর্তমান ভোগবাদী ও আত্মকেন্দ্রিক সভ্যতায় এই আহ্বান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষ আজ দুনিয়ার সাফল্যের পেছনে ছুটতে গিয়ে আখিরাতের প্রস্তুতি ভুলে যাচ্ছে। অথচ পবিত্র কোরআন স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, কেয়ামত অবশ্যম্ভাবী এবং একদিন সব মানুষকে পুনরুত্থিত করা হবে।
খুৎবায় তাকদিরের ওপর ঈমান ও সবরের শিক্ষা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। জীবনের সুখ-দুঃখ, সংকট ও পরীক্ষাকে আল্লাহর ফয়সালা হিসেবে গ্রহণ করা মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মুসলিম উম্মাহ আজ যুদ্ধ, বিভক্তি, দারিদ্র্য ও নানা সংকটে আক্রান্ত। এমন পরিস্থিতিতে হতাশ না হয়ে আল্লাহর সাহায্যের প্রতি আস্থা রাখা এবং ধৈর্য ধারণ করার শিক্ষা এই খুৎবায় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
খুৎবার অন্যতম আরেকটি আলোচিত বিষয় ছিল দোয়ার গুরুত্ব। খুৎবায় আরাফাতের ময়দানকে দোয়া কবুলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থান হিসেবে উল্লেখ করে মুসলমানদের বেশি বেশি আল্লাহর কাছে ফিরে আসার আহ্বান জানানো হয়। মানুষ যখন পৃথিবীর সব শক্তি ও উপকরণের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করে, তখন সে প্রকৃত অর্থেই তার রবের দিকে ফিরে আসে। তিনি আরও বলেন ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব’ কোরআনের এই ঘোষণা মুসলমানের হৃদয়ে নতুন আশা ও আস্থার সঞ্চার করে।
মুসলিম ভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতার শিক্ষাও খুৎবার আরেকটি অনন্য দিক ছিল। তিনি বলেন, হজ কেবল ব্যক্তিগত ইবাদত নয়; এটি মুসলিম উম্মাহর বৈশ্বিক ঐক্যেরও প্রতীক। ধনী-গরিব, সাদা-কালো, আরব-অনারব সবাই একই ময়দানে দাঁড়িয়ে আল্লাহর সামনে নিজেদের সমানত্ব ও দাসত্ব ঘোষণা করে। আজ যখন মুসলিম বিশ্ব বিভক্তি, জাতীয়তাবাদ ও পারস্পরিক সংঘাতে ক্ষতবিক্ষত, তখন হজের এই শিক্ষা নতুন করে মুসলিম ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করিয়ে দেয়।
খুৎবায় পবিত্র স্থানসমূহের মর্যাদা ও সেখানে জুলুমের ভয়াবহ পরিণতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। মসজিদুল হারামে অন্যায় ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে কোরআনের কঠোর সতর্কবাণী তুলে ধরে খতিব বুঝিয়ে দেন, ইসলামে পবিত্রতা শুধু স্থানগত নয়; বরং আচরণগতও। মানুষের অন্তর, ভাষা ও কর্মও পবিত্র হতে হবে।
সবশেষে এবারের হজের খুৎবা মুসলমানদের জন্য এক আত্মসমালোচনার আহ্বান হয়ে এসেছে। এই খুৎবা যেন স্মরণ করিয়ে দেয়, ইসলামের শক্তি কেবল বাহ্যিক জৌলুশে নয়; বরং ঈমান, তাকওয়া, ন্যায়বিচার, তাওহিদ, ধৈর্য ও ভ্রাতৃত্ববোধে নিহিত। জালিমদের পরিণতি, আখিরাতের ভয়াবহতা এবং আল্লাহর সাহায্যের প্রতিশ্রুতি মানুষের হৃদয়ে নতুন উপলব্ধির জন্ম দেয়।
আরাফাতের ময়দান থেকে উচ্চারিত এই বার্তা সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে ডাকছে যে, আল্লাহর দিকে ফিরে আসো, সত্যের ওপর ঐক্যবদ্ধ হও, জুলুম থেকে দূরে থাকো এবং আখিরাতের মুক্তির জন্য নিজেদের প্রস্তুত করো।






