কিশোর অপরাধ ঠেকাতে ইসলামের শিক্ষা

প্রতীকী ছবি
কিশোর বয়স মানুষের জীবনের এমন এক সংবেদনশীল সময়, যখন শৈশব ধীরে ধীরে বিদায় নেয়, কিন্তু পরিণত জীবনের স্থিরতা পুরোপুরি তৈরি হয় না। এই সময়েই মানুষ নিজের পরিচয়, স্বাধীনতা, গ্রহণযোগ্যতা ও সামাজিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখে। ফলে পরিবার, বন্ধু, শিক্ষা, সামাজিক পরিবেশ এবং নৈতিক আদর্শ তার আচরণ ও ভবিষ্যৎ চরিত্র নির্মাণে গভীর প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন সমাজে কিশোরদের মধ্যে দলবদ্ধ মারামারি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক, যৌন হয়রানি, সাইবার অপরাধসহ নানা ধরনের অপরাধপ্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে কেবল আইন ও শাস্তির মাধ্যমে সমস্যার সমাধান না খুঁজে কিশোরের চরিত্র, বিবেক ও দায়িত্ববোধ গঠনের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। ইসলাম এখানে একটি সমন্বিত নৈতিক কাঠামোর কথা বলে।
ইসলাম মানুষের অন্তর ও নৈতিক বোধের সংশোধনের মাধ্যমে অপরাধ প্রতিরোধের শুরু করতে শিখায়। পবিত্র কোরআন মানুষকে শুধু বাহ্যিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে বলেনি, বরং তাকে জবাবদিহির চেতনায় গড়ে তুলেছে। বলা হয়েছে- ‘যে অণু পরিমাণ সৎকর্ম করবে, সে তা দেখতে পাবে; আর যে অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করবে, সে-ও তা দেখতে পাবে।’ (সুরা জিলজাল, আয়াত : ৭-৮)। একজন কিশোর যখন উপলব্ধি করতে শেখে যে তার কোনো কাজই অর্থহীন নয় এবং প্রতিটি কাজের জন্য তাকে আল্লাহর কাছে জবাব দিতে হবে, তখন অপরাধের বিরুদ্ধে তার ভেতরে একটি নৈতিক প্রহরী তৈরি হয়। এই আত্মজবাবদিহি তার মধ্যে আইনভীতির চেয়েও গভীর এবং দীর্ঘস্থায়ী নিয়ন্ত্রণ তৈরি করতে পারে।
কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে ইসলামের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো পরিবারকে দায়িত্বশীল করা। সন্তানকে শুধু খাবার, পোশাক ও শিক্ষার ব্যবস্থা করে দেওয়া যথেষ্ট নয়; তার চরিত্র, সঙ্গ, আচরণ ও মানসিক বিকাশের প্রতিও অভিভাবকের নজর থাকা প্রয়োজন। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো।’ (সুরা তাহরিম, আয়াত : ৬)। মুফাসসিরগণ এ আয়াতের ব্যাখ্যায় পরিবারের সদস্যদের আল্লাহর আনুগত্য ও নৈতিক শিক্ষায় গড়ে তোলার দায়িত্বের কথা উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ ইসলামী দৃষ্টিতে সন্তান প্রতিপালন কেবল ভরণপোষণের বিষয় নয়, এটি একটি আমানত।
নবীজি (সা.) পরিবারে দায়িত্বের বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (বুখারি, হাদিস : ৮৯৩)। এই হাদিসের আলোকে বাবা-মায়ের দায়িত্ব হলো সন্তানের সঙ্গে এমন সম্পর্ক তৈরি করা, যেখানে শাসনের পাশাপাশি বন্ধুত্বপূর্ণ যোগাযোগও থাকবে। সন্তান কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে, অনলাইনে কী দেখে, কী ধরনের ভাষা ও আচরণ অনুসরণ করছে, তার মধ্যে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে কি না, এসব বিষয়ে অভিভাবকের সচেতন থাকা জরুরি।
ইসলাম কিশোরদের সৎ সঙ্গ গ্রহণের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে। মানুষের আচরণে বন্ধুবান্ধবের প্রভাব গভীর। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘সেদিন জালিম ব্যক্তি নিজের হাত কামড়ে বলবে, হায়! আমি যদি রাসুলের সঙ্গে পথ অবলম্বন করতাম! হায় আমার দুর্ভাগ্য, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম।’ (সুরা ফুরকান,েআয়াত : ২৭-২৯)। এখানে ভুল বন্ধুত্বের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর উদাহরণ হলো সুগন্ধি বিক্রেতা ও কামারের হাপরের মতো।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৫৩৪; মুসলিম, হাদিস : ২৬২৮)। তাই কিশোরকে শুধু ‘খারাপ বন্ধু থেকে দূরে থাকো’ বললেই দায়িত্ব শেষ হয় না; তাকে ইতিবাচক, সৎ ও দায়িত্বশীল বন্ধুত্বের পরিবেশও দিতে হবে।
ইসলাম কিশোরের সময়কে মূল্যবান কাজে ব্যবহারের শিক্ষা দেয়। অবসর, উদ্দেশ্যহীন ঘোরাফেরা এবং দীর্ঘ সময় অনিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল ব্যবহারের সুযোগে অপরাধপ্রবণতা বাড়তে পারে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুটি নিয়ামতের ব্যাপারে বহু মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত: সুস্থতা ও অবসর।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৪১২)। এই শিক্ষা কিশোরদের সময় ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। খেলাধুলা, পড়াশোনা, সৃজনশীলতা, স্বেচ্ছাসেবা, ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা ও পারিবারিক দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তাদের সময়কে অর্থবহ করে তোলার দায়িত্ব পরিবারকেই নিতে হবে।
কিশোর অপরাধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো ক্রোধ ও আবেগের অনিয়ন্ত্রণ। দলবদ্ধ সংঘর্ষ, মারামারি কিংবা সহিংস আচরণের পেছনে অনেক সময় সামান্য উত্তেজনাই বড় ভূমিকা রাখে। ইসলাম ক্রোধ নিয়ন্ত্রণকে শক্তির লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং প্রকৃত শক্তিশালী সে, যে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ (বুখারি, হাদিস : ৬১১৪) কোরআনও মুত্তাকিদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছে, ‘যারা ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৩৪)। তাই কিশোরদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ, মতবিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং ক্ষমাশীলতার শিক্ষা অপরাধ প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ উপায় হতে পারে। যা একমাত্র পরিবারের পরিচর্যা ছাড়া অর্জন সম্ভব নয়।
ইসলাম মাদক ও নেশার বিরুদ্ধেও সুস্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। পবিত্র কোরআনে মদ ও জুয়াকে শয়তানের অপবিত্র কাজ হিসেবে উল্লেখ করে তা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আধুনিক সমাজে মাদক শুধু ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির কারণ নয়, এর সঙ্গে বিভিন্ন সামাজিক ও অপরাধমূলক আচরণের সম্পর্কও দেখা যায়। তাই কিশোরদের নেশামুক্ত রাখতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সমাজকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, ভুল করলে কিশোরকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া। ইসলাম অপরাধকে প্রশ্রয় দেয় না, কিন্তু সংশোধনের দরজাও বন্ধ করে না। মহান আল্লাহ তাআলঅ বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন।’ (সুরা জুমার,েআয়াত : ৫৩)। তওবার মাধ্যমে ফিরে আসার এই ধারণা একজন বিপথগামী কিশোরকে হতাশার বদলে পরিবর্তনের সুযোগ দেয়। কোনো কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়লে তাকে শুধু ‘অপরাধী’ পরিচয়ে আটকে না রেখে কেন সে অপরাধে জড়িয়েছে, তার পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ কেমন, সে কী ধরনের সঙ্গ পেয়েছে এবং কীভাবে তাকে পুনর্বাসিত করা যায়, সেদিকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
ইসলামে শিশু-কিশোরদের প্রতি কোমল আচরণের বিষয়টিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) শিশুদের সালাম দিতেন, তাদের সঙ্গে স্নেহপূর্ণ আচরণ করতেন এবং তাদের অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখাতেন। আনাস (রা.) বলেন, তিনি নবীজি (সা.)-এর সঙ্গে দীর্ঘদিন ছিলেন, কিন্তু তিনি কখনো তাকে ‘উফ’ পর্যন্ত বলেননি এবং কোনো কাজের জন্য কঠোরভাবে তিরস্কার করেননি। (বুখারি, হাদিস : ৬০৩৮)। এর অর্থ শৃঙ্খলা ও সীমারেখা থাকবে না এমন নয়; বরং সংশোধনের ক্ষেত্রে অপমান, অবজ্ঞা ও অমানবিক আচরণের পরিবর্তে প্রজ্ঞা ও মমতা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে ইসলাম কিশোরদের আত্মমর্যাদা ও দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে উৎসাহ দেয়। নবীজি (সা.) তরুণদের ওপর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। উসামা ইবন জায়েদ (রা.) অল্প বয়সেই মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্বের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। মুসআব ইবন উমাইর (রা.)-এর মতো তরুণ সাহাবিরাও ইসলামের দাওয়াত ও সামাজিক দায়িত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। এসব ঘটনা দেখায়, তরুণদের শুধু নিয়ন্ত্রণ করার বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না; তাদের যোগ্যতা, নেতৃত্ব ও দায়িত্বশীলতাকেও বিকশিত করতে হবে।
তাই কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে ইসলামের শিক্ষা মূলত একটি বহুমাত্রিক ব্যবস্থা। পরিবার দেবে ভালোবাসা ও নৈতিক ভিত্তি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দেবে জ্ঞান ও শৃঙ্খলা, সমাজ দেবে ইতিবাচক পরিবেশ, আর ধর্মীয় শিক্ষা গড়ে তুলবে আল্লাহভীতি ও জবাবদিহির চেতনা। একই সঙ্গে অপরাধ সংঘটিত হলে ন্যায়সংগত আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সংশোধন ও পুনর্বাসনের সুযোগও গুরুত্বপূর্ণ।
তাই কিশোর অপরাধের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ কেবল ভয় দেখানো নয়; বরং এমন মানুষ তৈরি করা, যার ভেতরে বিবেক জাগ্রত, দায়িত্ববোধ দৃঢ়, ক্রোধ নিয়ন্ত্রিত, সঙ্গ নির্বাচনে সচেতন এবং ভুল থেকে ফিরে আসার সাহস আছে। ইসলামের শিক্ষা সেই মানুষ তৈরির দিকেই দৃষ্টি দেয়। কিশোরকে অপরাধী হওয়ার পর শাস্তি দেওয়ার চেয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আগেই তার হৃদয়, পরিবার, বন্ধুত্ব, সময় ও সামাজিক পরিবেশকে সঠিক পথে গড়ে তোলাই হতে পারে অধিক কার্যকর প্রতিরোধের ভিত্তি।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



