মা-বাবার সেবা আল্লাহর নিকট প্রিয় আমলগুলোর একটি

প্রতীকী ছবি
মানুষের তার জীবনে সবচেয়ে গভীরভাবে ঋণী হয় নিজ নিজ মা-বাবার কাছে। কারণ সন্তান পৃথিবীতে আসার আগেই তাদের ত্যাগ শুরু হয়, আর সন্তান বড় হয়ে নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও তাদের মমতা ও দোয়া শেষ হয় না। তাই ইসলাম মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহারকে পারিবারিক দায়িত্বের পাশাপাশি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে।
আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা.) বলেন, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আল্লাহর কাছে কোন আমল সবচেয়ে প্রিয়?’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন—
الصَّلَاةُ عَلَى وَقْتِهَا
‘সময়মতো নামাজ আদায় করা।’
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘এরপর কোনটি?’ তিনি বললেন—
ثُمَّ بِرُّ الْوَالِدَيْنِ
‘এরপর মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহার।’
তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘এরপর কোনটি?’ তিনি বললেন—
الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ
‘আল্লাহর পথে জিহাদ।’ (বুখারি, হাদিস : ৫২৭)
হাদিসটি মা-বাবার মর্যাদাকে ইসলামের ইবাদত ও নৈতিকতার কাঠামোর মধ্যে অত্যন্ত উচ্চস্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আল্লাহর কাছে প্রিয় আমলগুলোর কথা বলতে গিয়ে সময়মতো নামাজের পরই মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের কথা এসেছে। আরবি ‘বিররুল ওয়ালিদাইন’ বলতে শুধু তাদের ভরণপোষণ করা বোঝায় না; বরং সম্মান, কোমল আচরণ, সেবা, প্রয়োজন পূরণ এবং তাদের কষ্ট হয় এমন আচরণ থেকে বিরত থাকাও এর অন্তর্ভুক্ত।
পবিত্র কোরআনেও আল্লাহ তাআলা নিজের ইবাদতের নির্দেশের সঙ্গে মা-বাবার প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ পাশাপাশি উল্লেখ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে—
وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا
‘তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন, তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদত না করতে এবং মা-বাবার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে।’ (সুরা আল-ইসরা, আয়াত : ২৩)
এরপর মা-বাবার বার্ধক্যের সময় সন্তানের আচরণ কেমন হওয়া উচিত, তা আরও স্পষ্ট করে দিয়ে বলা হয়েছে—
إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُل لَّهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا
‘তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদের ‘উফ’ বলো না, তাদের ধমক দিয়ো না এবং তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।’ (সুরা আল-ইসরা, আয়াত : ২৩)
মা-বাবা যখন কর্মক্ষম ও শক্তিশালী থাকেন, তখন তাদের প্রয়োজন পূরণ করা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে তাদের চলাফেরা ধীর হয়, নানা শারীরিক জটিলতা দেখা দেয় এবং অনেক ক্ষেত্রে তারা সন্তানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। ঠিক এই সময়েই সন্তানের ধৈর্য, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের পরীক্ষা হয়। তাই পবিত্র কোরআন তাদের প্রতি শুধু সেবা করার নির্দেশ দেয়নি; বিরক্তির সামান্যতম প্রকাশও নিষিদ্ধ করে দিয়েছে।
এরপর আল্লাহ তাআলা সন্তানকে একটি অসাধারণ দোয়া শিখিয়ে ঘোষণা দিয়েছেন—
وَقُل رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
‘আর বলো, হে আমার প্রতিপালক! তাঁদের প্রতি দয়া করুন, যেমন তাঁরা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন।’ (সুরা আল-ইসরা, আয়াত : ২৪)
এই দোয়ায় সন্তানের নিজের শৈশবের স্মৃতিও ফিরে আসে। যে মা-বাবা একসময় সন্তানের অসহায় অবস্থায় তাকে আগলে রেখেছেন, সন্তানের দায়িত্ব হলো তাদের অসহায় সময়ে পাশে দাঁড়ানো। শৈশবে সন্তান তাদের ওপর নির্ভরশীল ছিল; বার্ধক্যে মা-বাবা সন্তানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন। জীবনের এই স্বাভাবিক পরিবর্তনকে ভালোবাসা ও দায়িত্বের সঙ্গে গ্রহণ করাই ইসলামের শিক্ষা।
মা-বাবার সেবা শুধু অর্থ ব্যয় করার নাম নয়। তাদের সঙ্গে সময় কাটানো, মনোযোগ দিয়ে কথা শোনা, প্রয়োজনের কথা জিজ্ঞেস করা, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং মানসিকভাবে পাশে থাকাও সদ্ব্যবহারের অংশ।
বর্তমান ব্যস্ত জীবনে অনেক সন্তান মা-বাবার ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করলেও তাদের যথেষ্ট সময় দিতে পারেন না। একই বাড়িতে থেকেও অনেক প্রবীণ মানুষ একাকিত্বে ভোগেন। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো, মা-বাবার সঙ্গে সম্পর্ক কেবল দায়িত্ব পালনের হিসাব নয়; এটি ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি সুযোগ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন—
رَغِمَ أَنْفُهُ، ثُمَّ رَغِمَ أَنْفُهُ، ثُمَّ رَغِمَ أَنْفُهُ قِيلَ: مَنْ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: مَنْ أَدْرَكَ وَالِدَيْهِ عِنْدَ الْكِبَرِ أَحَدَهُمَا أَوْ كِلَيْهِمَا، ثُمَّ لَمْ يَدْخُلِ الْجَنَّةَ
‘তার নাক ধুলায় মলিন হোক, তার নাক ধুলায় মলিন হোক, তার নাক ধুলায় মলিন হোক।’ জিজ্ঞেস করা হলো, ‘হে আল্লাহর রাসুল, কে?’ তিনি বললেন, ‘যে তার মা-বাবার একজন অথবা উভয়কে বার্ধক্যে পেল, অথচ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৫৫১)
হাদিসটি দেখায়, মা-বাবার বার্ধক্য সন্তানের জন্য শুধু দায়িত্বের সময় নয়, বরং জান্নাত অর্জনের বিরাট সুযোগ। তাদের সেবা, সম্মান ও প্রয়োজন পূরণ করতে গিয়ে যে কষ্ট হয়, তা একজন মুমিনের জন্য আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম হতে পারে।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



