হাস্য রসিকতায় নববী আদব

প্রতীকী ছবি
হাসি মানুষের স্বভাবের অংশ। জীবনের ক্লান্তি, দুশ্চিন্তা ও ব্যস্ততার মাঝে একটি আন্তরিক হাসি মনকে প্রশান্ত করে, সম্পর্ককে দৃঢ় করে এবং পারস্পরিক ভালোবাসা বাড়িয়ে দেয়। তাই ইসলাম হাসি-রসিকতাকে নিষিদ্ধ করেনি। বরং এমন হাস্যরসের শিক্ষা দিয়েছে, যা মানুষের হৃদয়ে আনন্দ সৃষ্টি করবে, কিন্তু কাউকে কষ্ট দেবে না। নবী করিম (সা.)-এর জীবন আমাদের সামনে এমনই একটি ভারসাম্যপূর্ণ আদর্শ তুলে ধরে।
নববী শিক্ষার আলোকে সুন্নাহসম্মত হাস্যরসের কয়েকটি মৌলিক আদব রয়েছে। (১) রসিকতার মধ্যেও কখনো মিথ্যা বলা যাবে না। (২) কারও চেহারা, গায়ের রং, দারিদ্র্য, অক্ষমতা বা ব্যক্তিগত দুর্বলতাকে হাসির উপকরণ বানানো যাবে না। (৩) এমন কোনো কথা বলা যাবে না, যাতে কেউ অপমানিত বা লজ্জিত হয়। (৪) অশ্লীলতা, গিবত, বিদ্রূপ কিংবা গুনাহকে হাসির মাধ্যম বানানো যাবে না। সর্বোপরি, রসিকতার উদ্দেশ্য হবে সম্পর্ককে কোমল করা। কিছুতেই এমন রসিকতা করা যাবে না যাতে মানুষের হৃদয় ভেঙে যায়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও সাহাবিদের সঙ্গে রসিকতা করতেন। তবে তার প্রতিটি রসিকতা ছিল সত্য, শালীন ও হৃদয়গ্রাহী। সাহাবিরা একবার বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আপনি তো আমাদের সঙ্গে রসিকতা করেন।” তিনি জবাব দিলেন,
إِنِّي لَا أَقُولُ إِلَّا حَقًّا
“আমি সত্য ছাড়া কিছুই বলি না।” (তিরমিযী, হাদিস : ১৯৯০)
এই হাদিস মুসলিমের হাস্যরসের মূলনীতি নির্ধারণ করে দেয়। মানুষকে হাসানো অবশ্যই ভালো কাজ হতে পারে, কিন্তু সেটি মিথ্যা, প্রতারণা কিংবা অন্যের সম্মানহানির মাধ্যমে হতে পারে না।
এ কারণেই মানুষকে হাসানোর জন্য মিথ্যা বলার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেন,
وَيْلٌ لِلَّذِي يُحَدِّثُ فَيَكْذِبُ لِيُضْحِكَ بِهِ الْقَوْمَ، وَيْلٌ لَهُ، وَيْلٌ لَهُ
‘ধ্বংস তার জন্য, যে মানুষকে হাসানোর উদ্দেশ্যে মিথ্যা কথা বলে। ধ্বংস তার জন্য, ধ্বংস তার জন্য।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৯০; তিরমিজি, হাদিস : ২৩১৫)
আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক কৌতুক, ভিডিও ও তথাকথিত বিনোদন মিথ্যা, অতিরঞ্জন কিংবা অপমানের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আমরা অনেক সময় বলি, ‘মজা করছিলাম।’ অথচ ইসলামে মজা কোনো গুনাহকে বৈধ করে দেয় না।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوا قَوْلًا سَدِيدًا
‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো।’ (সুরা আহযাব, আয়াত : ৭০)
এই নির্দেশ কেবল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নয়; আমাদের প্রতিদিনের আড্ডা, পারিবারিক আলাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য এবং রসিকতার ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।
একবার এক মা তাঁর সন্তানকে ডেকে বললেন, ‘এসো, তোমাকে কিছু দেব।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) জানতে চাইলেন, তিনি কী দিতে চান। তিনি বললেন, ‘খেজুর’। তখন নবী (সা.) বললেন, যদি তিনি কিছু না দিতেন, তাহলে তার নামে একটি মিথ্যা লেখা হতো। (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯৯১)
এ ঘটনা আমাদের শেখায়, শিশুদের সঙ্গেও মিথ্যা বলা ইসলামে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। তাহলে মানুষকে হাসানোর জন্য বানানো গল্প বা কল্পিত ঘটনা কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।
রসিকতার নামে অন্যকে অপমান করার বিষয়েও পবিত্র কোরআনে অত্যন্ত কঠোরতা দেখানো হয়েছে। মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِنْ قَوْمٍ عَسَى أَنْ يَكُونُوا خَيْرًا مِنْهُمْ
‘হে মুমিনগণ! কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য সম্প্রদায়কে উপহাস না করে। হতে পারে, তারা তাদের চেয়ে উত্তম।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ১১)
বর্তমান সময়ে মানুষের উচ্চারণ, পোশাক, গায়ের রং, আর্থিক অবস্থা কিংবা শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিদ্রূপ করা অনেকের কাছে বিনোদনের বিষয়। অথচ একজন মুমিন জানেন, মানুষের সম্মান আল্লাহর কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। যে হাসি অন্যের চোখে অশ্রু এনে দেয়, তা কখনো নববী আদর্শের হাস্যরস হতে পারে না।
আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজের জিহ্বার হিসাব নেওয়া। আমি কি মানুষকে হাসানোর জন্য মিথ্যা বলি? আমি কি জনপ্রিয় হওয়ার জন্য কাউকে অপমান করি? আমার কথায় কি কারও আত্মসম্মান আহত হয়? একজন মুমিনের জিহ্বা যেমন কোরআন তিলাওয়াতের সময় পবিত্র থাকে, তেমনি আড্ডা, রসিকতা, মন্তব্য কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার দায়বদ্ধতা রয়েছে।
সুন্দর হাস্যরস মানুষের হৃদয় জয় করে, সম্পর্ককে মজবুত করে এবং সমাজে সৌহার্দ্য সৃষ্টি করে। তাই আমাদের রসিকতা হোক সত্যভিত্তিক, শালীন ও মানবিক। নবী করিম (সা.)-এর শিক্ষা অনুসরণ করে আমরা যদি হাসি-মজাকেও উত্তম আখলাকের অংশে পরিণত করতে পারি, তবে তা যেমন মানুষের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে, তেমনি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনেরও মাধ্যম হবে।




