পিতা-মাতার হক আদায়ে ইসলামের কঠোর সতর্কবার্তা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মানুষ পৃথিবীতে আসার পর সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার করেন তার পিতা-মাতা। সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে তারা নিজেদের আরাম, ঘুম, স্বপ্ন এমনকি জীবনের বহু ইচ্ছাও বিসর্জন দেন। একটি শিশু যখন কিছুই বুঝতে পারে না, তখন মা তাকে বুকের উষ্ণতায় আগলে রাখেন, বাবা নিজের কষ্ট গোপন করে তার ভবিষ্যৎ গড়ার সংগ্রাম চালিয়ে যান। অথচ দুঃখজনক বাস্তবতা এই যে, সেই সন্তানদের কেউ কেউ বড় হওয়ার পর ধীরে ধীরে পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ববোধ হারিয়ে ফেলছে। কেউ তাদের অবহেলা করছে, কেউ মানসিক কষ্ট দিচ্ছে, আবার কেউ বৃদ্ধ বয়সে একেবারেই অসহায় অবস্থায় ফেলে রাখছে। ইসলাম এ ধরনের আচরণকে অনৈতিক ঘোষণা দিয়ে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছে।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতাআলা নিজের ইবাদতের নির্দেশের পরপরই পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণের আদেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে,
‘তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন, তোমরা কেবল তারই ইবাদত করো এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো। তাদের একজন বা উভয়েই যদি তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে ‘উফ’ পর্যন্ত বলো না, তাদের ধমক দিয়ো না এবং তাদের সঙ্গে সম্মানজনক কথা বলো।’ (সুরা আল-ইসরা, আয়াত :২৩)
কোরআনের এই ভাষা গভীরভাবে লক্ষ করলে বোঝা যায়, ইসলাম শুধু বড় ধরনের নির্যাতন নিষিদ্ধ করেনি; বরং বিরক্তির সামান্য প্রকাশকেও নিষিদ্ধ করেছে। ‘উফ’ শব্দটি আরবিতে বিরক্তি বা অস্বস্তির ক্ষুদ্রতম প্রকাশ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ পিতা-মাতার প্রতি কটু কথা, অবজ্ঞা বা আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
‘সে ধ্বংস হোক, সে ধ্বংস হোক, সে ধ্বংস হোক।’ জিজ্ঞেস করা হলো, কে ধ্বংস হোক? তিনি বললেন, ‘যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতা উভয়কে অথবা একজনকে বৃদ্ধ অবস্থায় পেল অথচ তাদের সেবা করে জান্নাতে যেতে পারল না।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৫৫১)
এই হাদিস আমাদের সামনে একটি গভীর সত্য তুলে ধরে। বৃদ্ধ পিতা-মাতা সন্তানের জন্য জান্নাত অর্জনের সুবর্ণ সুযোগ। কারণ এ সময় তারা সবচেয়ে বেশি অসহায় থাকেন এবং সন্তানের ভালোবাসা, সময় ও সেবার প্রয়োজন অনুভব করেন।
ইসলামে পিতা-মাতার হক শুধু আর্থিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাদের সঙ্গে নম্রভাবে কথা বলা, তাদের সামনে সম্মান বজায় রাখা, প্রয়োজনের খোঁজ নেওয়া, মানসিক সঙ্গ দেওয়া, তাদের কষ্ট না দেওয়া- সবই সন্তানের দায়িত্ব। অনেক সময় দেখা যায়, সন্তান অর্থ খরচ করছে ঠিকই, কিন্তু কথাবার্তায় এমন রূঢ়তা প্রকাশ করছে, যা পিতা-মাতার হৃদয় ভেঙে দেয়। ইসলাম এমন আচরণও কঠোরভাবে নিন্দা করেছে।
আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
‘কবিরা গুনাহের অন্যতম হলো, কোনো ব্যক্তি তার পিতা-মাতাকে গালি দেওয়া।’
সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, মানুষ কি নিজের পিতা-মাতাকে গালি দেয়? তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ। সে অন্যের পিতাকে গালি দেয়, ফলে অপর ব্যক্তি তার পিতাকে গালি দেয়; সে অন্যের মাকে গালি দেয়, ফলে অপর ব্যক্তি তার মাকে গালি দেয়।’ (বুখারি, হাদিস : ৫৯৭৩)
এই হাদিসে ইসলাম এমন কাজ থেকেও বিরত থাকতে বলেছে, যা পরোক্ষভাবে পিতা-মাতার অসম্মানের কারণ হয়।
বর্তমান সমাজে বৃদ্ধ পিতা-মাতার প্রতি অবহেলা বাড়ছে। বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বাড়ছে, পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হচ্ছে, আর আত্মকেন্দ্রিক জীবনব্যবস্থা মানুষকে পরিবার থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। অনেক সন্তান মনে করে, ক্যারিয়ার ও ব্যক্তিস্বাধীনতার জন্য পিতা-মাতাকে আলাদা করে রাখাই আধুনিকতা। অথচ ইসলাম এমন উন্নয়নকে সমর্থন করে না, যেখানে বৃদ্ধ পিতা-মাতার চোখ অশ্রুসিক্ত হয়।
বাংলাদেশে ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই আইনে সন্তানদের জন্য পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রও বুঝতে পেরেছে, পারিবারিক দায়িত্ববোধের সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। কিন্তু একজন মুসলিমের জন্য শুধু আইন নয়, আখিরাতের জবাবদিহিতার ভয়ই হওয়া উচিত সবচেয়ে বড় নিয়ন্ত্রক।
ইসলাম পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণকে দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। হাদিসে এসেছে, পিতা-মাতার দোয়া দ্রুত কবুল হয়। তাদের সন্তুষ্টি জীবনে বরকত আনে, আর তাদের কষ্ট মানুষের জীবন থেকে শান্তি ও কল্যাণ কমিয়ে দেয়। বাস্তবজীবনেও দেখা যায়, যে পরিবারে পিতা-মাতাকে সম্মান করা হয়, সেখানে পারিবারিক বন্ধন ও মানসিক প্রশান্তি তুলনামূলক বেশি থাকে।
পিতা-মাতার হক আদায় করা কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি সন্তানের দায়িত্ব। কারণ সন্তানের জীবনের পেছনে তাদের অগণিত ত্যাগ জড়িয়ে আছে। একজন মা সন্তানের জন্য রাত জেগেছেন, একজন বাবা নিজের চাহিদা কমিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়েছেন। সেই মানুষগুলো বৃদ্ধ বয়সে সন্তানের ভালোবাসা ও সম্মান পাবেন না, এটি কোনো সভ্য সমাজের চিত্র হতে পারে না।
আজ আমাদের সমাজে উন্নয়ন, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি বাড়ছে। কিন্তু যদি বৃদ্ধ পিতা-মাতা অবহেলিত হন, তবে সেই উন্নয়ন নৈতিকভাবে অপূর্ণ থেকে যায়। ইসলাম এমন সমাজ চায়, যেখানে বৃদ্ধরা বোঝা নন; তারা পরিবারের রহমত ও বরকতের উৎস। তাই সময় থাকতে আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজেদের আচরণ পর্যালোচনা করা। কারণ পিতা-মাতার সন্তুষ্টির মধ্যেই লুকিয়ে আছে আল্লাহর সন্তুষ্টি, আর তাদের কষ্টের মধ্যেই রয়েছে ভয়াবহ পরিণতির সতর্কবার্তা।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক




